কী শুনলে বল তো।
নাজিরপুরের জমিদার মাউগা না।
সবাই মুখ টিপে হাসতে লাগল। হেসে হেসে লারমোর শুধোলেন, মানে বুঝেছ?
হুঁ।
হাসিটা হঠাৎ থমকে গেল লারমোরের। ঈষৎ সন্দিগ্ধভাবে শুধালেন, কী?
‘মাউগা’ শব্দের ব্যাখ্যা যুগলের কাছে যা শুনেছিল, গড়গড় করে বলে গেল বিনু। শুনে কিছুক্ষণ হাঁ হয়ে রইলেন লারমোর। অবনীমোহনেরও সেই একই অবস্থা। কিছুক্ষণ পর লারমোর বললেন, এত সব কথা তুমি কেমন করে জানলে দাদাভাই? কে শিখিয়েছে?
শেখানোর কৃতিত্বটা আর যুগলকে দিতে মন চাইল না। বিজ্ঞের মতো মুখ করে গম্ভীর চালে বিনু বলল, কেউ শেখায় নি, আমি নিজেই জানি।
লারমোর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, অনেকগুলো হাটুরে তোক পুরনো ভাঙা মন্দিরটার দিক থেকে ডাকাডাকি করতে লাগল, লালমোহন সাহেব লালমোহন সাহেব, তরাতরি আসেন। বেলা যে যায়–
লারমোর চঞ্চল হলেন। ব্যস্তভাবে বললেন, চল, চল সব– বলে সামনের দিকে পা বাড়িয়ে দিলেন।
ওই লোকগুলো কেন লারমোরকে ডাকছে, বিনু বুঝতে পারল না। যাই হোক, লারমোর আর অবনীমোহন আগে আগে চলেছেন। তাদের পেছনে বাক্স মাথায় সেই মাঝি দু’টো। সবার শেষে বিনু এবং যুগল।
যেতে যেতে অবনীমোহনের গলা শুনতে পেল বিনু। চাপা স্বরে তিনি লারমোরকে বলছেন, এমন ঢেঁড়াও লোকে দেয়!
লারমোর বললেন, মজার ব্যাপারটা সবাই জানল। অথচ তোমার মামাশ্বশুরই শুধু জানতে পারল না। হেমটা একেবারে পাগল। নৌকো থেকে নেমে ঘাড় বেঁকা করে কোন দিকে যে ছুটল!
মামাবাবু তো বললেন, নিত্য দাস না কার দোকানে যাবেন।
তুমিও যেমন অবনীমোহন, মামাবাবুটিকে তো এখনও চেন নি। নিত্য দাসের দোকান পর্যন্ত সোজা ও পৌঁছতে পারবে? তার আগেই হয়তো তারক ভূঁইমালী ধরে নিয়ে নিজের দোকানে বসাবে। সেখানে এক দুপুর কাটিয়ে দেবে হেম।
হেমনাথ সম্বন্ধে ঠিক এইরকম অনুযোগই করেছিলেন স্নেহলতা। অবনীমোহন হাসলেন।
লারমোর বলতে লাগলেন, চল্লিশ বছর ধরে দেখছি হেমকে। ওই এক রকমই থেকে গেল। কোনও পরিবর্তন নেই।
হঠাৎ কী ভেবে অবনীমোহন বললে, তা হলে তো ভারি মুশকিল হবে লালমোহন মামা–
কিসের মুশকিল? জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন লারমোর।
এক জায়গায় যেতে গিয়ে আরেক জায়গায় যদি আটকে যান, ওঁকে খুঁজে বার করব কী করে?
কিছু করতে হবে না। হেমই আমাদের খুঁজে বার করবে।
আমরা কোথায় আছি, উনি কেমন করে জানবেন?
লারমোর বললেন, ও জানে। সুজনগঞ্জের হাটে এলে মন্দিরের পাশের বটগাছতলায় আমি বসি। দেখো, ঠিক এসে পড়বে।
এদিকে যুগল বিনুকে বলছিল, জানেন ছুটোবাবু, কয়দিনে আপনে বেশ চালাক-চতুর হইয়া উঠছেন।
বিনু রেগে গেল, আমি আগেও চালাক ছিলাম।
যুগল বলল, হে (সে) তো জানি। তয় এই কয়দিনে আরও চালাক হইছেন।
ঈষৎ নরম হয়ে বিনু বলল, কী করে বুঝলে?
উই যে লালমোহন সাহেবরে যহন মিছা কইরা কইলাম, পথ থিকা আমার কুটুমে আমাগো ধইরা নিয়া গেছিল তহন আপনে চুপ কইরা থাকলেন। সত্য কথাখান কইলে লালমোহন সাহেব খুব চেইতা (রেগে) যাইত।
বিনু উত্তর দিল না।
যুগল আবার বলল, যহন যহন দরকার হইব, এইরকম বুদ্ধি খেলাইবেন ছুটোবাবু।
একসময় তারা মন্দিরের কাছাকাছি সেই ঝুপসি বটগাছটার তলায় এসে পড়ল।
খানিক আগে বিনু এই জায়গাটার ওপর দিয়ে ছুটে গেছে। তখন চোখে পড়েনি, এখন দেখা গেল, একটা শস্তা ছোট টেবিলের মুখোমুখি দুখানা হাতল ভাঙা চেয়ার সাজানো। সামনের দিকে জনাকয়েক লোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের সবাই গরিব পেঁয়ো চাষী শ্রেণীর। সিকিভাগের মতো হিন্দু, বাদবাকি মুসলমান। চেহারা তাদের রুণ, দুর্বল। চোখেমুখে অসুস্থতার ছাপ মাখানো। লারমোরকে দেখে সবার চোখ, উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
এক পলক চেয়ার টেবিলের দিকে তাকিয়ে থেকে লারমোর বললেন, এতে তো হবে না, আরও দু’খানা চেয়ার লাগবে।
যে মাঝিদু’টো মাথায় করে বাক্স নিয়ে এসেছিল তার চঞ্চল হল। তাড়াতাড়ি বাক্স নামিয়ে হাটের দিকে ছুটল।
সামনের চেয়ারখানা দেখিয়ে লারমোর অবনীমোহনকে বললেন, বসো অবনী—
অবনীমোহন বসলেন। তার মুখোমুখি বসতে বসতে লারমোর এবার বিনুকে বললেন,যতক্ষণ চেয়ার আসে ততক্ষণ আমার কোলে বসো দাদাভাই। এস– বলে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
কারোর কোলে বসতে ঘোরতর আপত্তি বিনুর। কিছুতেই লারমোরের কাছে গেল না সে। নিচের ঘাসের ওপর যুগল বসে পড়েছিল। সে তার গা ঘেঁষে গিয়ে বসল।
বিনুর দিকে তাকিয়ে মধুর হাসলেন লারমোর, দাদাভাই মস্ত বড় হয়ে গেছে। কোলে বসতে তার খুব লজ্জা।
বিনু চোখ নামিয়ে চুপ করে থাকল।
ওদিকে সেই গ্রাম্য অসুস্থ লোকগুলো অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। তারা গুঞ্জনের মতো শব্দ করে বলতে শুরু করল, এইবার আমাগো দ্যাখেন লালমোহন সাহেব।
স্নেহময় সুরে লারমোর বললেন, এতক্ষণ বসে আছিস, আরেকটু সবুর কর বাবারা। চেয়ারটা আসুক। না এলে কোথায় বসিয়ে তোদের দেখব?
লোকগুলো শান্ত হল।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর একটু কী ভেবে গভীর স্বরে লারমোর ডাকলেন, অবনীমোহন—
আজ্ঞে– অবনীমোহন তক্ষুণি সাড়া দিলেন।
এটা কত সাল?
উনিশ শ’ চল্লিশ।
ঠিক চল্লিশ বছর আগে উনিশ শ’ সালে, তার মানে টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি সবে শুরু হয়েছে সেই সময় আমি রাজদিয়ায় এসেছিলাম। তখন আমার বয়েস পঁচিশ। রাজদিয়ায় আসার পরের দিন থেকেই আমি সুজনগঞ্জের হাটে আসছি। এই যে বটগাছটা দেখছ, এর তলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই যুবক বয়েসে আমি খ্রিস্টধর্ম প্ৰিচ করতাম।
