সবাই বলল, ক্যান, বিশ্বাস করুম না ক্যান?
শত্তুরে শত্তুরতা কইরা এই কথা রটাইছে। আপনেরা শুইনা রাখেন, সগলে জাইনা রাখেন, নাজিরপুরের জমিন্দার বাবু ভুবনমোহন দত্তচধরি মাউগা (স্ত্রৈণ) না–মাউগা না–
লোকটা থামতে না থামতেই চারধারে হাসির রোল পড়ে গেল। রসিক কেউ একজন হরিধ্বনি দিয়ে উঠল, বল হরি —
ঢ়েঁড়া দেওয়া হয়ে গেছে। চারপাশের ভিড়টা জলোচ্ছ্বাসের ঢলের মতো এবার হাটে দোকানপাটের দিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
লোকগুলো যাচ্ছে আর হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে, বড় বাহারের সম্বাদ, বড় বাহারের সম্বাদ–
একজন বলল, শালায় বাপের জম্মে অ্যামন কথা শুনি নাই।
আরেকজন বলল, মাউগা না, হেই কথা হাটে হাটে ঢেরা পিটাইয়া নি কইতে হয়!
দেখতে দেখতে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেল। দামড়া মোষের মতো সেই জোড়া বাবরিওলাকে নিয়ে ঢ্যাঙা লোকটাও কখন যেন উধাও হয়েছে।
পাশে দাঁড়িয়ে যুগলও হাসছিল। হাসতে হাসতে তার হিলহিলে বেতের মতো শরীর বেঁকেচুরে যাচ্ছে।
এতগুলো লোক কেন হাসছিল, ঢেঁড়াদারের ঘোষণায় কৌতুককর ব্যাপারটা কী ছিল, কিছুই বুঝতে পারেনি বিনু। সে শুধু বিমূঢ়ের মতো একবার এর মুখের দিকে, একবার ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিল।
সবাই চলে গেলে বিনু যুগলকে বলল, এই, অমন হাসছ কেন?
হাসুম না, কন কী ছুটোবাবু? হাসির বড় একটা ঢেউ যুগলের স্বর বুজিয়ে দিল।
বিনু হাঁ করে তাকিয়ে থাকল।
হাসিটা খানিক সামলে নিয়ে যুগল বলল, অ্যামন হাসনের কথা তিরভুবনে কেউ কুনোদিন শোনে নাই ছটোবাবু। কয় কিনা জমিন্দারবাবু মাউগা না’ বলে হাসতে হাসতে ফের শুয়ে পড়ে আর কি।
হঠাৎ যেন কথাটা মনে পড়ে গেল বিনুর। তাড়াতাড়ি সে বলে উঠল, আচ্ছা, মাউগা মানে কী? লোকটা বলছিল–
বোঝেন নাই?
না।
হাসি থামিয়ে যুগল সোজা হয়ে দাঁড়াল। একটু চিন্তা করে বলল, আপনের না বুঝানেরই কথা ছুটোবাবু।
কলকাতার ছেলে বিনু ক্লাস সেভেনে পড়ে। যে কথা যুগল বুঝতে পারে, জল-বাংলার এই অশিক্ষিত পেঁয়ো হাটুরে লোকগুলো বুঝতে পারে, সেই কথাটা সে বুঝতে পারবে না? অব্যয়ীভাব আর কর্মধারয় সমাস বোঝে সে, পাটিগণিতের বাঘা বাঘা অঙ্ক বোঝে, নেসফিল্ডের গ্রামার থেকে জিরান্ড, অ্যাপ্রোপিয়েট প্রিপজিশন বুঝে বসে আছে, আর তুচ্ছ মাউগা শব্দটা অবোধ্য থেকে যাবে? নাক মুখ কুঁচকে বিরক্ত গলায় বিনু বলল, কেন, বুঝতে পারব না কেন?
আপনে পোলাপান যে।
পোলাপান অর্থে ছেলেমানুষ। আষাঢ় মাসে বারো পেরিয়ে তেরায় পা দিয়েছে বিনু, মাথায় ছোটদিকে ছাপিয়ে গেছে, তবু কিনা তাকে ছেলেমানুষ ভাবে যুগল! মনে মনে খুব রেগে গিয়ে। সে বলল, ছেলেমানুষ ছেলেমানুষ করবে না।
তার গলায় এমন কিছু ছিল যাতে যুগল চমকে উঠল। বলল, আইচ্ছা, আর কমু না। এইবারটার লাখান মাপ কইরা দ্যান।
বিনু খুশি হল। সহজ, সদয় গলায় বলল, ঠিক আছে। এখন মাউগা’র মানে বল।
যুগল বলল, ছুটোবাবু মাউগা তারেই কয় যে তমস্ত দিন বউয়ের আচলের তলে থাকে, তার পিছে পিছে বিলাইছাওয়ের লাখান (বেড়াল-বাচ্চার মতো) ঘোরে। বউ যা কয় তাই করে। মোট কথা বউ-অন্ত পরাণ। একদণ্ড বউরে না দেখলে মূচ্ছা যায়।
তবু ব্যাপারটা বিশেষ বোধগম্য হল না। মাউগা’ শব্দটা শুনবার সঙ্গে সঙ্গে হাটুরে লোকগুলোর মধ্যে হাসির ধুম পড়ে গিয়েছিল। সেই কথাটা মনে হতেই বিজ্ঞের মতো একবার হেসে নিল বিনু। ভাবখানা, আমিও সব বুঝি। ছেলেমানুষ যা ভেবেছ, আমি তা আদপেই নই।
যাই হোক, ঢেঁড়ার পর্বটা শেষ হয়েছে। হঠাৎ হেমনাথদের কথা মনে পড়ে গেল বিনুর। তাড়াতাড়ি ব্যস্তভাবে সে বলে উঠল, দাদু বাবা আর লালমোহনদাদুকে খুঁজে বার করবে না?
যুগল বলল, হ। চলেন।
চল—
দু’পা এগিয়েছে, এমন সময় উঁচু গলার ডাক ভেসে এল, যুগল, এই যুগল–
ডান দিকে তাকাতেই বিনুরা দেখতে পেল, খানিক দূরে অবনীমোহন লারমোর আর লারমারের নৌকোর সেই মাঝি দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। মাঝিদের মাথায় দুটো বড় বড় টিনের বাক্স। চোখাচোখি হতেই লারমোর হাতছানি দিলেন।
বিনুরা বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে গেল।
লারমোর যুগলের উদ্দেশে বললেন, কোথায় গিয়েছিলি রে হতভাগা, এত দেরি হল?
নিচের দিকে তাকিয়ে ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে যুগল বলল, পথে এক কুটুমের লগে দেখা, হে (সে) আমারে তার বাড়িত ধইরা নিয়া গেল। তাই ইট্টু দেরি হইছে।
কুটুমবাড়ি যাবার কথাটা সত্যি। তবে তার সঙ্গে দেখা হওয়া এবং ধরে নিয়ে যাওয়াটা ডাহা মিথ্যে। বিনু একবার ভাবল, যুগলের মিথ্যেটা ধরিয়ে দেয়। কিন্তু ধরিয়ে দিলে তার ফলাফল কী হবে ভেবে চুপ করে থাকল।
লারমোর আবার বললেন, নৌকোয় উঠলে, জল পেলে, তুই আর মানুষ থাকিস না। তোর তো কিছু হবে না, পদ্মা-মেঘনা-ধলেশ্বরী আর সারা বর্ষার জলের সাধ্যি নেই তোর কিছু করতে পারে। ভয় ওই দাদাভাইটাকে নিয়ে আঙুল দিয়ে বিনুকে দেখিয়ে বলতে লাগলেন, আমরা এসেছি আর সারাক্ষণ ওর কথা চিন্তা করছি।
যুগল ফিসফিসিয়ে বলল, চিন্তার কিছু আছিল না। ছুটোবাবুরে আমার নায়ে তুলছি, আমার এট্টা দায়িত্ব নাই?
লারমোর সকৌতুকে হাসলেন, আছে নাকি! জেনে আশ্বস্ত হওয়া গেল। বলতে বলতে বিনুর দিকে ফিরলেন, তারপর দাদাভাই–
বিনু তাকাল।
লারমোর বললেন, ঢেঁড়া শুনেছ?
বিনু ঘাড় কাত করল, হ্যাঁ।
