ভেতরে বেশ খানিকটা জায়গা গোলাকার এবং ফাঁকা। মানুষের ভিড় সেটা ঘিরে, বৃত্তের আকারে দাঁড়িয়ে। ফাঁকা জায়গায় তিনটে মোটে লোক। দু’জনের মাথায় কোঁচকানো বাবরি, একেবারে কাঁধ পর্যন্ত নেমে গেছে। বড় মোটা জুলপি তাদের, পাকানো গোঁফ। গায়ে জামাটামা নেই, পরনে মালকোঁচা দেওয়া খাটো ধুতি। দু’জনেরই হাতে রুপোর চৌকো তাবিজ, গলায় সোনা-বাঁধানো বাঘনখ। গায়ের রং এত কালো আর চকচকে, মনে হয়, গর্জন তেল মেখে আছে।
বাবরিওলারা বেশ জোয়ান, লম্বা-চওড়া বলিষ্ঠ চেহারা। তাদের গলায় মস্ত ঢাক বাঁধা। এই মুহূর্তে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আর নেচে নেচে প্রচন্ডভাবে পিটিয়ে চলেছে। দুজনে ঢাকদুটো না ফাসানো পর্যন্ত থামবে না বোধ হয়।
দেখতে দেখতে বিনুর মনে হল, ওরা যেন যমজ। কুমোরের দোকানের মানিকজোড় পুতুলের মতো একই ছাঁচে গড়া।
ওরা ঢাক বাজাচ্ছে আর তৃতীয় মানুষটি একটা উঁচু প্যাকিং বাক্সের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার শরীরে রসকষ কিছু নেই। ঢ্যাঙা তালগাছের মতো চেহারা। আখমাড়াই কলে ফেলে সবটুকু সার যেন বার করে নেওয়া হয়েছে, ফলে ছিবড়েটুকু পড়ে আছে। লোকটার গাল ভাঙাচোরা, চুল পাঁশুটে রঙের। সেই চুলই তেলে জবজবে করে পরিপাটি টেরি কেটেছে। কত বয়স, কে জানে। হাড় এমন পাকা, মনে হয়, টোকা দিলেই টং করে বেজে উঠবে। পরনে চিটচিটে ভোলা পাজামা আর রংবেরং এর হাজারটা তালি দেওয়া আল্লাখাল্লা, খালি পা। সার্কাস দলের ক্লাউনের কথা মনে পড়িয়ে দেয়। তার হাতে লম্বা একটা চোঙা।
এমন যার চেহারা তার চোখের দিকে তাকালে অবাক হতে হয়। সে দুটো যেমন রসালো তেমনি চুলাচুল। লোকটা প্যাকিং বাক্সের ওপর দাঁড়িয়ে ঘাড় হেলিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখছিল। যখন দেখল, হাটের প্রায় সব লোক চারপাশে জড়ো হয়েছে, হাতের ইশারায় বাবরিওলা দুটোকে থামিয়ে দিল। তারপর মুখের কাছে চোঙাটা ধরে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, হিন্দু ভাইরা, মিঞাভাইরা, অনেক দিন পর আপনেগো সুজনগুঞ্জে ঢেরা দিতে আইলাম।
ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ বলল, হ, অনেক দিন পর আইলা। হেই গেল বচ্ছরের আগের বচ্ছর চৈত মাসে নীল পূজার সময় আইছিলা। হেইর পর এই আইলা।
আরেক জন বলল, অ্যাত দিন আছিলা কই?
ঢ্যাঙা লোকটা মুখ থেকে চোঙা নামিয়ে বলল, এই দ্যাড় বচ্ছরে কত কত মুল্লুক ঘুরলাম। হেই নুয়াখালি জিলা, ফরিদপুর জিলা, তিপুরা জিলা, কুমিল্লা, চানপুর, বরিশাল, আর হেইদিকে উজানে ভাটির দ্যাশ–না গ্যাছি কুনখানে?
ঢেরা দিতে গ্যাছ?
এ ছাড়া আর কুন কামে যামু কন? এই থিকাই তো আমর রুজিরুজগার, ভাত-কাপড়। ভিড়ের মধ্যেকার প্রশ্নকর্তা লোকটা মাথা নাড়ল, হ—
বোঝা যায়, দেশে দেশে ঢেঁড়া দিয়ে বেড়ানোই ঢ্যাঙা লোকটার কাজ এবং জীবিকা। ভিড়ের অন্য সবাই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল। তারা চেঁচামেচি জুড়ে দিল, গপ থুইয়া অখন আসল সম্বাদখান কও। শুইনা যাইগা। উই দিকে আবার হাটের বেইল (বেলা) যায়।
‘হ’ হ হঠাৎ অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে ঢ্যাঙা লোকটা হাতের লম্বা চোঙাখানা মুখের কাছে আনল, তারপর কণ্ঠস্বর একেবারে চুড়োয় তুলে চিৎকার করে বলতে লাগল, মিঞাভাইরা, হিন্দুভাইরা, আপনেরা নাজিরপুরের নাম শুনছেন?
কুন নাজিরপুর?
নবীগুঞ্জ থানার ভিতরে পড়ে। পেল্লয় গেরাম।
ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ জানায়, নাজিরপুরের নাম তারা শুনেছে। তবে বেশির ভাগই শোনে নি।
ঢ্যাঙা লোকটা বলল, বাবু ভুবনমোহন দত্তচরি (দত্তচৌধুরী) নাজিরপুরের জমিন্দার। বয়েস হইব ষাইট। তেনির জবর দাপট। অ্যামন যে বাঘে গোরুতে একঘাটে জল খায়। কিন্তুক–
ভিড়টা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, কিন্তুক কী?
গ্যাল বচ্ছর জমিন্দারবাবু তেজপক্ষের (তৃতীয় পক্ষের) বিয়া সারছেন। এই পক্ষের বউ একেবারে লক্ষ্মী পতিমার লাহান দেখতে। বয়সখানও কম, মোটে আঠার। এই নিয়া একখান কথা রটছে—
চারদিক থেকে চড়বড়িয়ে খই ফোঁটার মতো অসংখ্য কণ্ঠস্বর ফুটতে লাগল, কী কথা? কী কথা?
ঢ্যাঙা লোকটা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে সেই ঢাকী দু’টোকে চোখের ইশারা করল। কথাবার্তার ফাঁকে বসে বসে তারা জিরিয়ে নিচ্ছিল। ইঙ্গিত পাওয়ামাত্র দামড়া মোষের মতো তড়াক করে লাফিয়ে উঠল এবং উদ্দামভাবে বাবরি ঝাঁকিয়ে ঢাক পেটাতে লাগল।
উৎসাহ দেবার জন্য বোধ হয় ঢ্যাঙা লোকটা প্যাকিং বাক্স থেকে নেমে পড়ল। হাতে হাতে তালি বাজাতে বাজাতে বলতে লাগল, জোরে ব্যাটারা, আরও জোরে–
ঢাকী দু’টো উৎসাহিত হয়ে এমন বাজাতে লাগল যে হাত দেখা যায় না।
ঢ্যাঙা লোকটা আগের মতোই তালি দিতে দিতে বলতে লাগল, ঘুইরা ফিরা শালারা, নাইচা নাইচা–
ঘুরে ফিরে ঢাকীদের নাচ শুরু হল।
বেশ খানিকক্ষণ বাজনার পর বাবরিওলা দুটোকে থামিয়ে আবার প্যাকিং বাক্সের মাথায় উঠল ঢেঁড়াদার। ততক্ষণে সবার কৌতূহল চূড়ান্তে পৌঁছেছে। চারধার থেকে ভিড়টা চেঁচাতে লাগল, কও, এইবার কও
ধীরেসুস্থে চোঙাটা মুখের কাছে এনে ঢ্যাঙা লোকটা বলতে লাগল, নাজিরপুরের বাবু ভুবনমোহন দত্তচধরির নামে যে কথাখান রটছে, তা হইল এই পর্যন্ত বলে হঠাৎ থেমে গেল।
কী? কী?
তেজপক্ষের বিয়ার পর তেনি নিকি মাউগা হইয়া গ্যাছেন। (তৃতীয় পক্ষের বিয়ের পর তিনি নাকি স্ত্রৈণ হয়ে গেছেন)। কথাখান নারায়ণগুঞ্জ-মুন্সিগুঞ্জ-মানিকগুঞ্জ–স্বগ-মত্ত হগলখানে রইটা গ্যাছে। বলতে বলতে কণ্ঠস্বর শীর্ষবিন্দুতে তুলল ঢেঁড়াদার, কিন্তুক কথাখান সত্য না। হিন্দুভাইরা, মিঞাভাইরা, কেউ যদি অ্যামন কথা আপনেগো কয়, বিশ্বাস করবেন না।
