নৌকোর মাঝখানটায় ক্ষিপ্র হাতে লগি খাড়া করে বাঁধল যুগল, তারপর কাপড় দিয়ে বাদাম খাঁটিয়ে হালের কাছে বৈঠা নিয়ে বসল। সঙ্গে সঙ্গে তীরের মতো জল কেটে নৌকো ছুটল।
পদ্মবনের ওপর দিয়ে যাচ্ছে বিনুরা। নৌকোর তলায় সর সর শব্দ হচ্ছে।
যুগল বলল, আরেক খান গীত কই ছুটোবাবু।
যত গান জানা আছে, সব এক দিনেই শুনিয়ে দিতে চায় নাকি যুগল! বিনু কিছু বলবার আগেই
সে শুরু করে দিল :
যহন বন্দু জ্বলব পরাণ, আমারি
নাম লইও,
আমার দেওয়া মালার সনে দুঃখের কথা কইও
বন্দু আমারি নাম লইও।
আমি রইব তোমার লেইগা,
তুমি রইবা আমার লেইগা—
হঠাৎ গানটা থামিয়ে দিয়ে যুগল বলল, গীত থাউক ছুটোবাবু—
বিনু বলল, থাকবে কেন? গাও না–
না। একদিনে এত গান নিয্যস আপনের ভাল লাগতে আছে না।
লাগছে লাগছে। তুমি গাও।
না। গীতে আর মন লাগে না ছুটোবাবু। তার থিকা—
কী?
অন্য কথা কই।
বিনু চুপ করে রইল।
একটু ভেবে নিয়ে যুগল অবার বলল, বুঝলেন নি ছুটোবাবু—
বল– বিনু তাকাল।
তক্ষুনি কিছু বলল না যুগল। কিছুক্ষণ পর লাজুক সুরে আরম্ভ করল, উই পাখির লগে, বুঝলেন নি ছুটোবাবু– এই পর্যন্ত বলে চুপ করে গেল।
পাখির সঙ্গে কী?
এইখানে-উই টুনি বইনের বাড়ি আমার দেখাশুনা—
তাই নাকি?
হ। এইর আগে পাখিরে আর দেখি নাই।
বিনু উত্তর দিল না।
যুগল বলতে লাগল, পাখিরে দেখার পর থিকা পেরায়ই টুনি বইনের বাড়ি যাই। না গিয়া থাকতে পারি না ছুটোবাবু। এই নিয়া টুনি বইনে ঠাট্টা করে, ঠিসারা করে, আলঠায় (পেছনে লাগে)।
বিনু বলল, তা তো দেখলামই।
হ, বড় শরম লাগে–টোবাবু। তভু না গিয়া পারি না।
একটু নীরবতা।
তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিসিয়ে যুগল বলল, আইচ্ছা ছুটোবাবু–
তার কণ্ঠস্বরে এমন কিছু আছে যাতে বিনু অবাক হয়ে গেল। বলল, কী বলছ?
চকিত দৃষ্টিতে একবার বিনুর দিকে তাকিয়ে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল যুগল। নৌকোর পাটাতনের সঙ্গে যেন মিশে যেতে যেতে বলল, পাখিরে ক্যামন দেখলেন?
খুব ভাল। কি সুন্দর সাঁতার কাটতে পারে।
নিচের দিকে চোখ রেখেই যুগল শুধলো, আপনের তাইলে পছন্দ হইছে?
প্রশ্নটার ভেতর গভীর কোনও ইঙ্গিত আছে কিনা, বিনু বুঝতে পারল না। বুঝবার বয়সও তার নয়। তবে খানিক আগে দরজার ফ্রেমে পাখিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল। সেই ছবিটা এখনও চোখ জুড়ে আছে। যে মেয়ে গাছকোমর বেঁধে হলুদ শাড়ি পরে, লাল জামা গায়ে দেয়, নাকে যার সবুজ পাথর-বসানো নাকছাবি, চোখ যার ছায়াচ্ছন্ন অতল সরোবর, যে মেয়ে হলুদ জলপরী হয়ে পদ্মবনে সাঁতার কাটে তাকে যেন পৃথিবীর মানুষ মনে হয় না। স্বপ্নের অলৌকিক মানবী হয়ে নিমেষে মুগ্ধ বিনুকে সে জয় করে নিয়েছে।
ঘাড় অনেকখানি হেলিয়ে বিনু জানায়, পাখিকে তার খুব পছন্দ হয়েছে।
এবার মুখ তুলল যুগল। তার চোখমুখে আলোর ছটা খেলে যাচ্ছে। উৎসাহের সুরে সে বলল, নিশ্চিন্ত করলেন ছুটোবাবু, নিচ্চিন্ত করলেন–
কিভাবে যুগলকে ভাবনাশূন্য করেছে, বিনু বুঝতে পারল না। খানিক অবাক হয়ে সে তাকিয়ে থাকল।
যুগল বলতে লাগল, আপনেরা কইলকাতার মানুষ, আপনাগো চৌখই আরেক রকম। আপনেগো চৌখে যহন পাখিরে ভাল লাগছে তহন আর চিন্তা নাই আমার।
বিনু কিছু বলল না।
খানিক ইতস্তত করে যুগল আবার বলল টুনি বইনে কী কয় জানেন?
জিজ্ঞাসু সুরে বিনু বলল, কী?
অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে লাজুক হাসল যুগল। বলল, পাখির লগে আমারে নিকি খুব মানায়। দুইজনের নিকি খুব মিল হইব।
কথাটা বুঝতে পারল না বিনু।
যুগল আরও বলল, টুনি বইনের কী ইচ্ছা জানেন ছুটোবাবু?
কী?
কইতে শরম লাগে।
লজ্জা কিসের? বল না—
টুনি বইনের ইচ্ছা, পাখির লগে আমার বিয়া হউক।
তাই নাকি?
হ–আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল যুগল, পাখির বাপের নাম তো আপনে জানেন না।
বিনু বলল, কেমন করে জানব?
হে তো ঠিকই। পাখিরেই এই পেরথম দেখলেন। তার বাপের সম্বাদ তো দূরের কথা। পাখির বাপের নাম গোপাল দাস। টুনি বইনে কইছে গোপাল দাস যহন ভাটির দ্যাশ থিকা মাইয়ারে নিতে আইব তহন আমারেও দেইখা যাইব।
তোমাকে দেখে যাবে কেন? বিনুর চোখেমুখে এবং কণ্ঠস্বরে আবার বিস্ময় ফুটল।
নাক কুঁচকে বিচিত্র ভঙ্গি করল যুগল। ফিসফিস গলায় বলল, ছুটোবাবু কিছু বোঝেন না, এক্কেরে পোলাপান।
পোলাপান অর্থাৎ ছেলেমানুষ বলতে রেগে উঠতে যাচ্ছিল বিনু। তার আগেই যুগল আবার বলল, আমার হাতে মাইয়া দিব। আমি পোলাখান ক্যামন, রোজগারপাতি ক্যামন করি, খাওয়াইতে টাওয়াইতে পারুম কিনা–এই সগল দেইখা-শুইনা-বাজাইয়া নিতে হইব না? বাপ হইয়া মাইয়ারে তো আর জলে ফেলাইয়া দিতে পারে না।
এবার অনেকখানি বুঝল বিনু। যুগলের ওপর তার আর রাগ থাকল না।
প্রকান্ড মাছের মতো জল কেটে কেটে নৌকোটা ছুটে চলেছে। পালে সোঁ সোঁ বাতাস বেজে যাচ্ছে একটানা, যতিহীন। শুনতে শুনতে বিনুর মনে হতে লাগল, নিরবধি কাল বাতাস ওভাবে বেজে যাচ্ছে আর আদিগন্ত জলের মাঝখানে বসে সেও তার বাজনা শুনে চলেছে।
পদ্মবন শালুকবন আর শাপলাবনই শুধু নয়, মাঝে মাঝে নলখাগড়ার ঝোঁপ, চাপ বাঁধা কচুরিপানা এবং ধানখেতও পড়ছে। আর পড়ছে মুত্রাবন। মুত্রার কালো কালো নিটোল ডাটাগুলো দৃপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। তাদের মাথায় থোকা থোকা সাদা ফুলের সমারোহ। এসবের ওপর দিয়ে নৌকোটা যেন পাখা মেলে উড়ে যাচ্ছে।
