গান শেষ হবার পরও অনেকক্ষণ দূরবিসারী পদ্মবনের ওপর তার রেশ দুলতে লাগল।
একসময় পাখি বলল, এইবার যাই গা মাঝি।
যুগল বলল, আরেষ্টু বস।
না। কতক্ষণ আইছি খেয়াল আছে? তোমরা হাটে যাইবা না?
হ হ– যুগল ব্যস্ত হয়ে উঠল, চল, তোমারে বাড়ি দিয়া আসি।
না মাঝি, তোমারে আর দিয়া আইতে হইব না। নিজেই যাইতে পারুম। বলেই জলে ঝাঁপ দিল পাখি।
তারপর নৌকো থেকে বিনু আর যুগল দেখল, পানকৌড়িও না, নীল-হলুদ অলৌকিক মাছও নয়, স্বপ্নলোকের জলপরীর মতো পদ্মবনের ভেতর দিয়ে সাঁতার কেটে দূরে, আরও–আরও দূরে চলে যাচ্ছে পাখি। যতক্ষণ তাকে দেখা গেল, একদৃষ্টে বিনুরা তাকিয়ে থাকল।
১.১৫ পদ্ম আর শাপলার বনে
পদ্ম আর শাপলার বনে যতক্ষণ দেখা যায়, বিনুরা তাকিয়ে থাকল। একসময় অনেক, অনেক দূরে, টুনিদের বাড়িটা যেদিকে দ্বীপের মতো ভেসে আছে, হলুদ বিন্দু হয়ে পাখি মিলিয়ে গেল।
পাখি নেই, এই জলপূর্ণ চরাচরের কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবু যেন সে আছে, বিনুর চোখের ভেতর হলুদ জলপরীটি হয়ে অবিরাম সাঁতার কেটে চলেছে।
ওধার থেকে যুগল ডাকল, ছুটোবাবু—
ঘোরটা কেটে গেল। চমকে মুখ ফেরাল বিনু।
যুগল বলল, পাখি কে বুঝতে নি পারলেন?
আস্তে মাথা পাড়ল বিনু, না।
আমার পিসাত বইন টুনিরে দেখলেন তো?
হ্যাঁ—
পাখি টুনি বইনের ননদ। আপন ননদ না, অর মাসি হাউরির মাইয়া।
ও।
যুগল একটু ভেবে নিয়ে বলল, পাখি এইখানে থাকে না, ওগো বাড়ি ভাটির দ্যাশে।
বিনু শুধলো, ভাটির দেশটা কোথায়?
উই দক্ষিণে– দূর দিগন্তের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল যুগল, উইখানে খালি জল আর মাছ। ভাটির দ্যাশেরে জল আর মাছের দ্যাশও কইতে পারেন। কত কিসিমের যে মাছ! যদিন একবার যান ছুটোবাবু, ফিরতে আর মন চাইব না। বলতে বলতে উৎসাহিত হয়ে উঠল যুগল। তার চোখ চকচক করতে লাগল। গাঢ় গভীর এক স্বপ্নের ভেতর ডুবে গেল যেন সে।
একটুক্ষণ নীরবতা।
তারপর যুগলই আবার বলল, ভাটির দ্যাশের কথা অহন থাউক। পাখির কথাই কই।
বিনু উৎসুক চোখে তাকাল।
যুগল বলল, কয় দিনের লেইগা টুনি বইনের বাড়ি বেড়াইতে আইছে পাখি।
তাই বুঝি—
হ– বলেই শুধরে নেয় যুগল, ঠিক বেড়াইতে না–
বিনু জিজ্ঞেস করল, তবে?
টুনি বইনের তো বচ্ছর বচ্ছর পোলামাইয়া হয়। এইবারও শাবন মাসে এউক্কা মাইয়া হইছে। বইনের একলার সোংসার। হে (সে) গ্যাল আশুচ ঘরে (আঁতুড় ঘরে)। অর হাউরিরও শরীল ভালা না। এইদিকে সোংসার দেখে কে? রান্ধনবাড়ি করে কে? হের লেইগা ভগ্নিপতি ভাটির দ্যাশে গিয়া পাখিরে নিয়া আইছে।
ও।
হেই আষাঢ় মাসে পাখি আইছে, অহন আশ্বিন। তিন চাইর মাস এইখানে থাইকা গেল। এইবার যাইব গা, অর বাপে আইসা নিয়া যাইব।
বিনু আর কী বলবে, চুপ করে রইল।
যুগল থামে নি, বইনে খালাস হইয়া গ্যাছে, দরকার মিটা গ্যাছে। পরের বাড়িত্ মাইনষে আর কয়দিন থাকে? বলতে বলতে হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে চকিত হল, ইস, বেইল (বেলা) তো দেখি মেলা চইড়া গ্যাছে!
এতক্ষণ মনোহর এক স্বপ্নের ভেতর যেন ডুবে ছিল বিনু। চমকে মুখ তুলে সেও ওপর দিকে তাকাল। পুব আকাশের খাড়া পাড় বেয়ে সূর্যটা অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে। আর দু’পা এগুলেই মধ্যাকাশ। দুপুর হতে খুব বেশি বাকি নেই।
যদিও আশ্বিন মাস, অকূল জলের মাঝখানে বিনুরা বসে আছে, তবু ভরদুপুরের আগের এই সময়টায় রোদে বেশ ধার এসে গেছে, গায়ে তার তাত লাগছে। জলো হাওয়া দাহ জুড়িয়ে দিতে পারছে না। তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে সামনের দিকে তাকাল বিনু। যতদূর দৃষ্টি যায়, একেবারে দিগন্ত পর্যন্ত, অবনীমোহনদের নৌকোটার চিহ্ন নেই। দিগন্তপ্রসারী অথৈ চরাচরে কোথায় সেটা হারিয়ে গেছে, কে বলবে।
সন্ত্রস্তভাবে বিনু বলল, দাদুদের নৌকোটা তো দেখতে পাচ্ছি না।
যুগল বলল, হাটের দিকে গ্যাছে গা।
আমরা এখন কী করব?
কী আর করুম, হাটে যামু।
পৌঁছতে পৌঁছতে তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।
ইট্টুও না। যুগল বলল, বাতাসের গতিক দেখছেন ছুটোবাবু?
একটু খেয়াল করতেই বিনু বুঝতে পারল। খানিক আগেও বাতাসটা ছিল ঝিরঝিরে, এই দুপুরবেলা তাকে যেন নিশিতে পেয়েছে। শাপলাবন শালুকবন ছুঁয়ে অগাধ জলের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই ঘোড়া ছুটিয়ে চলেছে সেটা।
যুগল আবার বলল, ক্যামন জবর বাতাস দিছে। বাদাম খাটাইয়া দেই, দেইখেন বড়কত্তাগো আগেই হাটে পৌঁছাইয়া যামু।
হঠাৎ কী মনে পড়তে ব্যস্তভাবে বিনু বলে উঠল, তুমি চিনে যেতে পারবে তো?
এমন মজার কথা বুঝিবা আগে আর কখনও শোনে নি যুগল। একটুক্ষণ অবাক হয়ে বিনুর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকল সে। তারপর বলল, কথা শোন ছুটোবাবুর! কয় চিনা নি সুজনগুঞ্জের হাটে যাইতে পারুম! বলে হেসে হেসে নৌকোর ওপর গড়িয়ে পড়ে আর কি।
বিনুর অস্বস্তি হতে লাগল, হাসছ যে!
যুগল বোধহয় শুনতে পেল না। আপন মনে বলে যেতে লাগল, আমি যুগল–জলের পোক একখান। তমস্ত দিন এই জলের দ্যাশ মইয়াইয়া বেড়াইতে আছি। ছুটোবাবুর সন্দ, সুজনগুঞ্জের হাট চিনা যাইতা পারুম না। আপনে এক কাম করেন বরম্ (বরং)—
কী?
কাপড় দিয়া আমার চৌখ বাইন্ধা দ্যান, দেখবেন ঠিক গ্যাছি গা–
এই পারাপারহীন অশেষ জলরাশির কোন দিকে পাড়ি দিলে সুজনগঞ্জের হাট, কে জানে। সবিস্ময়ে বিনু বলল, বল কী!
ঠিকই কই ছুটোবাবু–বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল যুগল। একটানে পরনের কাপড়খানা খুলে ফেলল। তলায় ছোট্ট একফালি নেংটি।
