দরজার ফ্রেমের ভেতর প্রথমটা মনে হল ছবি। কত বয়স হবে পাখির, যোল সতেরর বেশি নয়।
গায়ের রংখানি মাজা মাজা। চামড়া এত টান টান, মসৃণ এবং চকচকে যে মনে হয়, মেয়েটির সারা গায়ে প্রতিমার মতো ঘামতেল মাখানো। হাত-পায়ের শক্ত শক্ত গড়নের মধ্যে লাবণ্য যত, তার চাইতে ঢের বেশি বলশালিতা। ঘন পালকে-ঘেরা বড় বড় চোখ, তার মাঝখানে কুচকুচে কালো মণি দুটো যেন ছায়াচ্ছন্ন সরোবর। চোখ দুটি সর্বক্ষণ যেন জগতের সব কিছুর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে আছে। মোটা ঠোঁট, সরু চিবুক, ছোট্ট কপালের ওপর থেকে ঘন চুলের ঘের শুরু হয়ে পিঠের ওপর নিবিড় মেঘের মতো সেই চুল ছড়িয়ে আছে। ছোট হলেও নাকটিতে ধারাল টান আছে, তার বাঁধারের পাটায় সবুজ পাথর বসানো নাকছাবি। হতে লাল বালা আর একগোছা রুপোর চুড়ি, কানে কুমারী মাকড়ি।
কাছাকাছি বসে সবই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল বিনু। আলাদা আলাদা করে দেখলে নাকে-মুখে হাতে পায়ে হাজারটা খুঁত বার করা যাবে। কিন্তু সব মিলিয়ে তাকে ঘিরে কোথায় যেন অলৌকিকের একটুখানি ছোঁয়া আছে যা চোখ এবং মন একসঙ্গে জুড়িয়ে দেয়।
নীল ডোরা-দেওয়া হলুদ শাড়ি আর খাটো লাল জামা আঁটোসাঁটো করে পরা। মেয়েটির চোখেমুখে বেশবাসে আশ্বিনের টলমলে সোনালি রোদ এসে পড়েছে। ফলে তাকে এ জগতের মানবী মনে হয় না।
মেয়েটা যেখানে দাঁড়িয়ে, তার ঠিক তলাতেই জল। নীলচে কাঁচের মতো স্বচ্ছ টলমলে জলের আরশিতে তার ছায়া কাঁপছে।
সমানে হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে যুগল, আর মেয়েটাও তার একখানি হাত বুক পর্যন্ত তুলে নেড়ে নেড়ে ইশারায় না না করে চলেছে। তার ঠোঁটে, চোখের তারায় সরল মধুর হাসির ছটা ঝিকমিক। করছে।
যুগল হাত নেড়ে নেড়ে ডাকল, আসো মেয়েটি বলল, না। নাও নিয়া তোমার কাছে যামু?
চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে বাড়ির ভেতরটা দেখে নিল মেয়েটা। মুখচোখের চেহারা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। বিব্রভাবে বলল, না–না-না, কেউ দেইখা ফেলব।
যুগল বলল, দেখুক–
তার কথা শেষ হতে না হতেই সেই উঁচু দরজার ভেতর থেকে জলে ঝাঁপ দিল মেয়েটা। ঝপাং করে একটা শব্দ হল, জল ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। বিনু দেখতে পেল, কখনও পানকৌড়ির মতো, কখনও লাল-হলুদ অলৌকিক একটা মাছের মতো পাখনা মেলে সাঁতার কাটতে কাটতে নিমেষে নৌকোর কাছে চলে এসেছে মেয়েটা।
যুগলের চোখে যে আলো খেলছিল সেটা চকমক করতে লাগল। মেয়েটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, আসো–
যুগলের হাত ধরে মেয়েটা নৌকোর ওপরে উঠে এল। যুগল বলল, ইস, এক্কেরে ভিজা গেলা। নাও লইয়া কাছে গ্যালে আর ভিজতে হইত না।
মেয়েটি বলল, ভিজছি, বেশ করছি। আমরা মন হইছে, তাই ভিজছি। নাও লইয়া গ্যালে কেও দেইখা ফেলাইলে আমি গলায় দড়ি দিতাম।
মেয়েটার শাড়ি থেকে, জামা থেকে, চুল থেকে জল ঝরে ঝরে নৌকোর পাটাতন ভেসে গেল। সে ব্যস্তভাবে বলতে লাগল, নাওটা এটু দূরে লইয়া যাও মাঝি।
যুগলকে তা হলে মাঝি’ বলে মেয়েটা। যুগল বলল, দূরে যামু ক্যান?
বাড়িত্ থনে এই জাগাখান (জায়গাটা) দেখা যায়।
দ্যাখনের ডর?
হ।
আমাগো কথা হগলে জানে।
জানুক। তুমি নাওখান দূরে লইয়া যাও। নাইলে–
নাইলে কী?
আমি কিলাম ফির বাড়িত যামু গা।
আইচ্ছা আইচ্ছা—
চারধারে পদ্মবন, শাপলা আর শালুকের অরণ্য। নৌকো বেয়ে অনেকটা দূরে চলে এল যুগল। তারপর বলল, টুনি বইনে তখন অত কইরা ডাকল, আইলা না ক্যান?
মেয়েটা বলল, আমার বুঝিন শরম লাগে না?
থুইয়া দ্যাও তোমার শরম। আমি খুব গুসা করছি।
শুদাশুদি গুসা কইরো না মাঝি। আমি নি মাইয়ামানুষ, তোমাগো যা সাজে মাইয়া মাইনষের নি তা মানায়!
যুগল কী উত্তর দিতে গিয়ে হঠাৎ বিনুর সম্বন্ধে সচেতন হল। এতক্ষণ বিনুর কথা বুঝি তার খেয়াল ছিল না। তাড়াতাড়ি মেয়েটাকে দেখিয়ে সে বলে উঠল, ছুটোবাবু, এই হইল পাখি।
মেয়েটা যে পাখি, আগেই তা আন্দাজ করেছিল বিনু। সে একদৃষ্টে পাখির দিকে তাকিয়ে থাকল। যুগল এবার বিনুকে দেখিয়ে পাখিকে শুধলো, এনি কে, জানো?
জানি– পাখি ঘাড় হেলিয়ে দিল।
কে?
তুমি যে বাড়িত্ থাকো হেই বাড়ির বাবুর নাতি। কইলকাতা থনে আইছে।
তুমি জানলা ক্যামনে?
উত্তরের ঘরের দরজার ফাঁক দিয়া দেখছি।
একটুক্ষণ নীরবতা। তারপর গাঢ় গলায় পাখি ডাকল, মাঝি—
কও– যুগল মুখ তুলল।
পূজার সোময় বাপে আমারে নিতে আইব।
যুগল চমকে উঠল, যাইবা গিয়া?
চোখ নামিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে পাখি বলল, নিতে আইলে থাকুম ক্যামনে? তয়–
তয় কী?
কেও যদি জোর কইরা ধইরা রাখত, থাইকা যাইতাম।
বিনুর অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে পাখির কানের কাছে মুখ নামাল যুগল। ফিসফিস গলায় বলল, রাখুম, জোর কইরাই ধইরা রাখুম।
আবার কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর পাখিই প্রথম কথা বলল, মাঝি–
কী?
হেই, হেইদিন তুমার টুনি বইনের যেদিন পোলা হইল, রয়ানি গীত শুনাইছিলা, মনে আছে?
আছে।
কতকাল তোমার গীত শুনি না, আইজ একখান শুনতে সাধ লয়।
শুনবা?
হ।
মনে মনে সুর ভেঁজে যুগল শুরু করে দিল :
চাঁদনী তুই লো আমার
জীয়ন মরণ কাঠি,
তোরে না দেখিলে পরে
মরি লো বুক ফাটি।
তালুক মুলুক তুই লো আমার,
তুই লো ট্যাহার তোড়া,
নামাবলী তুই লো আমার
তুই লো ভাঙ্গা বেড়া।
তুই যে আমার রসগুল্লা
মোন্ডা মিঠাই ছানা,
শীতের কথা তুই যে আমার
রইদের মিছরি পানা।
বষ্যাকালে তুই লো আমার
তালপাতার ছাতি,
তরে পাইলে ফস্যা হয় লো
ঘোর আন্দার রাতি।
চাঁদনী তুই লো আমার—
