অহন তরে কিছু দিতে হইব না।
টুনির মুখচোখের অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে ভারি মায়া হতে লাগল বিনুর। একবার ইচ্ছে হল নাড় চেয়ে খায়, কিন্তু লজ্জায় বলতে পারল না।
ওদিকে টুনি আবার বলল, হ্যামকত্তার নাতি পেরথম দিন আইল, কিছুই হাতে দিতে পারলাম না।
রসগুল্লা পানিতুয়া আইনা রাখিস। আরেক দিন যহন নিয়া আসুম তহন দুটোবাবুরে দিস।
আননের আগে আমারে খবর দিবি কিলাম।
দিমু।
টুনির সব কথারই উত্তর দিচ্ছে যুগল, তবে কেমন যেন অন্যমনস্কের মতো। তার চোখদুটো খাঁচার পাখির মতো অনবরত দিগ্বিদিকে ছোটাছুটি করছে। বেশ বোঝা যায়, পিসতুতো বোন কিংবা তার মাগুর মাছের মত কালো কালো ছেলেমেয়েগুলোর জন্য বিশেষ উগ্রীব নয় যুগল। আসলে যার জন্য তার এ বাড়িতে আসা, তাকে এখনও খুব সম্ভব দেখতে পায় নি। ফলে ভেতরে ভেতরে খুব অস্থির এবং চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
একটু ফাঁক পেয়ে যুগল বলল, অই লো টুনি বইন—
কী?
জামাইরে যে দেখি না–
হাটে গ্যাছে।
সুজনগুঞ্জের?
হ।
তগো বাড়িটা বড় নিঝ্ঝাম টুনি বইন–
ঠোঁটে ঠোঁট টিপে দুষ্টুমির সুরে টুনি বলল, হ। বড় নিঝ্ঝাম।
যুগল টুনির মুখভঙ্গি বা বলার ধরন লক্ষ করে নি। আপন মনে বলল, তর হউরে কই (তোর শ্বশুর কোথায়)?
উত্তরের ভিটির ঘরে বইসা তামুক খাইতে আছে।
হাউরিরেও (শাশুড়িকেও) তো দেখি না।
হে (সে) রইছে পুবের ভিটির ঘরে।
করে কী?
কাইল রাইতে জ্বর আইছিল, কাথা মুড়ি দিয়া শুইয়া শুইয়া কোকাইতে আছে (ককাচ্ছে)।
ইস–
কী হইল?
হাউরিরে ডাক্তর দেখাইছস?
ঘাড় বাঁকিয়ে গালে একখানা হাত রাখল টুনি, অই রে কালামুইখা যুগইলা, ক’স কী তুই?
যুগল চকিত হল, কী কই?
একদিনের জ্বরে ডাক্তর দেখামু, আমরা নি ত্যামন বড় মানুষ! আমাগো নি ত্যামন সুখের শরীল! জ্বর আইছে, আবার যাইব গা। হের (তার) লেইগা ডাক্তার কিয়ের (কিসের? ওষুধ কিয়ের? শুনালি একখান কথা যুগইলা! বাপের জম্মে একখান কথা শুনলাম।
যুগল বলল, কী এমুন কইলাম যা বাপের জন্মে শোনস নাই?
তুই চুপ যা তো ছ্যামরা। মায়ের পোড়ে না, বাপের পোড়ে না, মাসির বুক জ্বইলা যায়। আপন কেউ না, পিসাতো বইনের হাউরির লেইগা আমাগো যুগইলার পরাণ ফাত ফাত করে। অই রে যুগইলা, অই রে ড্যাকরা–
কী?
হউর-হাউরি থুইয়া আসল কথাখান ক। তর পরানে যা আছে ক। যার বিহনে এই পুরী নিঝাম লাগে হের কথা ক।
কার বিহনে আবার এই পুরী নিঝ্ঝাম?
পরের মুখে নামখান শুনতে বুঝিন মিঠা লাগে? তা হইলে কই–পাখি, পাখি, পাখি—
যুগল বলল, আমার পিছনে যদি অ্যামন কইরা লাগস তয় কিলাম যামু গা।
কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে টুনি বলল, পাখি নাই, থাইকা আর কী করবি সুনা? আইজ বিহান বেলায় অর বাপের লগে গ্যাছে গা।
যুগলের মুখ আরও কালো হয়ে গেল। আবছা গলায় সে বলল, বার বার উই কথা কইলে সত্যসত্যই যামু গা, আর কুনোদিন আসুম না।
বলছে বটে, যাবার কোনও লক্ষণই কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। এমনকি সাঁকোর বাঁশে নৌকোটা যে বেঁধে রেখেছিল যুগল, সেটা বাধাই আছে। দড়িটা পর্যন্ত খোলে নি।
এই সময় একটা ছেলে বলে উঠল, না গো যুগলামামা, পাখি পিসি যায় নাই। মায় তোমারে ভাটকি দিছে (মিথ্যে বলে ঠাট্টা করেছে)।
খুব নির্লিপ্ত মুখে যুগল বলল, থাউক যাউক, হেয়াতে আমার কী?
টুনি বলল, আ লো আমার সুনা লো, কিচ্ছু বুঝি হয় না তর? পাখি গ্যাছে গা শুইনা তো বুকখানে ঢেকির পাড় পড়তে আছিল। বলেই গলা চড়িয়ে ডাকতে লাগল, পাখি-পাখি—পাখি–
সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
টুনি আবার ডাকল, আ লো ছেমরি আয়, লাজ শরম বষ্যার জলে ভাসাইয়া আইসা পড়। পরানের বান্ধব তরে না দেইখা কিলাম এইবার মূচ্ছা যাইব।
টুনি তার এক ছেলেকে বলল, যা রে বেঙ্গা, পাখি পিসিরে ধইরা নিয়া আয়।
সব চাইতে বড় ছেলেটা ছিপ টিপ একধারে গুটিয়ে উত্তর দিকের উঁচু ঘরখানায় চলে গেল। একটু পর ফিরে এসে বলল, পিসি আইব না।
টুনি শুধলো, ক্যান, আইব না ক্যান?
বেঙ্গা বলল, চাউলের মটকিগুলার (জালাগুলোর) পিছে পলাইয়া রইছে।
টুনি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, আ লো ছেমরি, আয় আয়। লাজে তো তুই গেলি!
হাজার ডাকাডাকিতেও পাখি এল না।
অগত্যা হতাশ, বিমর্ষ যুগল অনেকখানি গলা তুলে বলল, যাই গা টুনি বইন, যাই গা– এবার সত্যি সত্যি নৌকোর বাঁধন খুলে ফেলল সে।
টুনি হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বলল, আরেটু জোরে চিল্লা যুগইলা, যারে শুনাইতে চাস হে (সে) শোনে নাই।
কইলাম তো তরে, আর কাউরে শুনাইতে চাই না।
টুনি হাসি থামিয়ে এবার অন্য কথা পাড়ল, অখন যাবি কই?
হাটে।
সুজনগুঞ্জে?
হ। হ্যামকায়, লালমোহন সাহেব আর এই ছুটোবাবুর বাবায় আরেক নায়ে আগেই গ্যাছে গা। আমরা গিয়া তাগো ধরুম।
হাটে গ্যালে তোগো জামাইর লগে দেখা হইব।
হ।
পাটাতনের তলা থেকে বৈঠাখানা বার করে বাইতে শুরু করল যুগল।
সাঁকোর ওপর থেকে টুনি আরেক বার বলল, বাবুগো পোলারে একদিন নিয়া আবি, নিয্যস আনবি।
আনুম।
টুনিদের উঠোন থেকে বেরিয়ে নৌকোটা বাইরের অথৈ, অসীম, জলপূর্ণ প্রান্তরে এসে পড়ল।
আস্তে আস্তে নৌকো বাইছে আর পেছন ফিরে ব্যাকুলভাবে বার বার কী দেখছে যুগল। টুনিদের বাড়ি ছাড়িয়ে খুব বেশি দূর এখনও যায় নি, হঠাৎ যুগলের হাতের বৈঠা থেমে গেল। তার চোখের তারায় আলো নাচতে লাগল।
দ্রুত ঘুরে বসে টুনিদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাতছানি দিতে লাগল যুগল। তার হাতের দিকে লক্ষ করতেই বিনু দেখতে পেল, টুনিদের উত্তরের ভিটের ঘরখানার পেছনের দরজায় কোমরখানি ঈষৎ বাঁকিয়ে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে–নিশ্চয়ই পাখি।
