যুগল হাত কচলাতে কচলাতে বলতে লাগল, ভাইগনা-ভাগনীগো মাছ খাওয়াইতে বুঝিন সাধ যায় না আমার?
চোখের তারা নাচিয়ে, ঠোঁট উলটে দিয়ে বিচিত্র ভঙ্গি করল মেয়েমানুষটি, আহা লো সুনা (সোনা) লো, ভাইগনা-ভাগনীগো লেইগা বুকের ভিতরে এক্কেরে ফাত ফাত করে। আসলে কারে মাছ খাওয়াইতে আসো, হে কি বুঝি না?
যুগলের মুখচোখের চেহারা এই মুহূর্তে অবর্ণনীয়। ঘাড় ভেঙে মাথাটা নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে। জড়সড় হয়ে সে বলতে লাগল, কারে আবার খাওয়াইতে আনি?
কমু?
মাথা আরও নুয়ে পড়েছে। আধফোঁটা গলায় যুগল কী বলল, বোঝা গেল না।
মেয়েমানুষটি এ ব্যাপারে আবার কী উত্তর দিতে গিয়ে, হঠাৎ চোখমুখ কুঁচকে তীক্ষ্ণ গলায় পেঁচিয়ে উঠল, খাইল, রাইক্ষইসা গুষ্টি আমারে চাইটা চাইটা শ্যাষ করল। যা মড়ারা, যা–বলে যে ছেলেদুটো ঝুলে ঝুলে স্তন চুষছিল, তাদের ঝেড়ে ফেলার মতো করে ঠেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে তারা গিয়ে পড়ল উঠোনের জলে।
বিনু নৌকোর মাঝখানে বসে ছিল। ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। বুকটা খুব জোরে ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। উঠোনে জল তো কম না, প্রায় এক মানুষের মতো। ছেলেদুটো যদি ডুবে যায়!
একটু পর ভয়ে ভয়ে চোখের পাতা অল্প ফাঁক করতেই বিনু অবাক। সেই ছেলেদু’টো সাঁতরে ওপরে উঠে পড়েছে। সাঁকো বেয়ে তারা মায়ের কাছে চলে এল এবং আগের মতো স্তনে মুখ দিয়ে ঝুলতে লাগল।
ওইটুকু ছেলে সাঁতার কাটতে পারে, নিজের চোখে দেখেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না বিনু। এমন বিস্ময়কর দৃশ্য আগে কখনও দেখে নি, চোখ বড় বড় করে সে তাকিয়ে থাকল। ওদের দেখতে দেখতে মনে পড়ল, এখনও সাঁতারটা শিখে উঠতে পারে নি। তাড়াতাড়ি শিখিয়ে দেবার জন্য কালই যুগলকে ধরতে হবে।
মেয়েমানুষটি এবার আর ছেলেদের জলে ছুঁড়ে দিল না। বিরক্ত, কটু গলায় গজ গজ করতে লাগল। খা খা, আমারে খাইয়া ঠান্ডা হ নিঃবইংশরা। প্যাটে যে কী কাল ধরছিলাম!
ছেলেদু’টোর ভ্রূক্ষেপ নেই। কুকুরছানার মতো চো চো করে তার দুধ খেতে লাগল।
ছেলেদের ছেড়ে আবার যুগলকে নিয়ে পড়ল মেয়েমানুষটি, পোড়াকপাইলা যুগইলা, আমারে চৌখে তুই ধূল-পড়া দিবি? কই তা হইলে, নামখান কই? পাখিরে মাছ খাওয়াইতে আনস।
যুগল বলতে লাগল, কী যে ক’স টুনি বইন, কী যে ক’স–
মেয়েমানুষটির নাম জানা গেল–টুনি। এ-ই তবে যুগলের পিসতুতো বোন। বিনু অবশ্য আগেই তা আন্দাজ করেছিল।
টুনি বলল, অবিয়াত (অবিবাহিত) মাইয়ারে রোজ রোজ মাছ খাওয়ান ক্যান? আ রে ড্যাকরা, আ রে যুগইলা, তর মনে কী আছে রে– শরীর বাঁকিয়ে চুরিয়ে হাসতে লাগল টুনি।
যুগলের মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। ঘামতে ঘামতে সে বলল, অ্যামন কথা যদি কস, আমি আর আসুম না তগো বাড়িত্।
আবি আবি (আসবি আসবি), ঠিকই আবি। না আইসা কি পারবি সুনা?
ক্যান, পারুম না ক্যান?
পাখি যে তরে গুণ করছে।
হ, তরে কইছে!
টুনি আগের মতো হাসতে লাগল, কিছু বলল না।
পাখি কার নাম, কেমন করে সে যুগলকে গুণ করেছে, বুঝতে পারছিল না বিনু।
এদিকে আরেকটা ব্যাপার চলছিল। যুগল ঘামছিল, তার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল–সবই ঠিক। তারই ভেতর চোরা চোখে এদিক সেদিক তাকিয়ে ব্যাকুলভাবে কাকে যেন খুঁজছিল।
তার এই আড়ে আড়ে তাকানোটা লক্ষ করেছিল টুনি। রঙ্গ করে বলল, টালুমালু কইরা চাইর দিকে দ্যাখস কী?
যুগল চমকে উঠল, কী আবার দেখি? কই, কিছু না—
কিছু না!
না-ই তো।
যারে বিচরাইতে আছস (খুঁজছিস), হে নাই। পাখি উড়াল দিছে।
নিমেষে মুখখানা অন্ধকার হয়ে গেল যুগলের। আবছা গলায় সে বলল, তার লেইগাই য্যান আইছি!
টুনি আবার কী বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার চোখ এসে পড়ল বিনুর ওপর। খানিক অবাক হয়ে সে বলল, পোলাটা কে রে যুগইলা? ক্যামন ফুটফুইটা!
কালো কালো যে ছেলেগুলো সাঁকোর ওপর বসে পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে বড়শি বাইছিল তাদের ভেতর থেকে একজন বলল, কী ধলা (ফর্সা), এক্কেরে সাহেবগো লাখান।
আরেকটা ছেলে বললে, পিরানটা (জামাটা) দেখছস বেঙ্গা, দুইখান জেব (পকেট) আছে।
টুনি তাকে ফুটফুটে বলেছে, তার ছেলেরা বলেছে সাহেবের মতো। নিজের চেহারার এমন খোলাখুলি প্রশংসায় বিনু লজ্জা পেয়ে গেল। মুখ নামিয়ে সে নখ খুঁটতে লাগল।
যুগল বলল, উনি বাবুগো পোলা।
টুনি শুধলো, কুন বাবুগো?
কইলকাতার বাবুগো। হ্যামকত্তার নাতি।
হ্যামকত্তার তো পোলামাইয়া নাই, তেনার আবার নাতি হইল কই থনে?
উনি হ্যামকত্তার ভাগনীর পোলা।
কইলকাতায় থাকে বুঝিন?
হ, কইলাম তো।
আইছে কবে?
তিন চাইর দিন হইল।
একলাই আইছে?
না। উইটুক মাইনষে একলা আইতে পারে?
তয়?
ওনার বাপ-মায়ের লগে আইছে।
টুনির কৌতূহল অসীম। বলতে লাগল, বাপ-মাই খালি আইছে নিকি?
যুগল মাথা নাড়ল, না। দু’গা বইনও আইছে।
থাকব কদ্দিন?
হে আমি কি জানি—
শোনস নাই?
না।
একটু কী ভেবে টুনি বলল, উই রে যুগইলা—
যুগল তক্ষুনি সাড়া দিল, কী?
বাবুগো পোলা নি আমাগো ঘরে আইসা বইব?
অহন না।
তয়?
আরেক দিন নিয়া আসুম।
আনিস কিলাম (কিন্তু), মাথা খাস।
বিরক্ত সুরে যুগল বলল, আনুম তো কইলাম।
টুনি বলল, ঘরে নাইকলের লাড় আছে, বাবুগো পোলারে নি দুইটা দিমু?
না।
আহত সুরে টুনি বলল, ক্যান রে?
যুগল বলল, কইলকাতার বাবুরা লাড় খায় না।
টুনির মুখখানা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। বিষঃ গলায় সে বলল, তাইলে কী খাইতে দেই ক’ দেখি–
