পথে আমার এক কুটুমবাড়ি পড়ব। আমার পিসাতো (পিসতুতো) বইনের হউর (শ্বশুর বাড়ি। ভাবতে আছি, মাছটা হেইখানে দিয়া যামু। শুদাশুদি পচাইয়া লাভ কী?
কিন্তু—
কী?
হাটে যেতে অনেক দেরি হয়ে যাবে না? বলতে বলতে হঠাৎ কী মনে পড়তে সামনের দিকে তাকাল বিনু।
খানিক আগেও হেমনাথদের নৌকোটা তাদের সামনে শ’খানেক গজের ভেতর ছিল। এখন অনেক দূর চলে গেছে। এখান থেকে ধুধু বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে সেটা। বিনু চঞ্চল হল, দাদুদের নৌকো কোথায় চলে গেছে দেখ–
চোখের কাছে হাত এনে যুগল একবার দেখে নিল। তারপর হেসে বলল, যাউক না। হাটের পথ কি আমি চিনি না? কুটুমবাড়ি থিকা (থেকে) বাইর হইয়া একখান বাদাম খাটাইয়া দিমু, বড় কত্তাগো আগে হাটে পৌঁছাইয়া যামু।
বিনু চুপ করে রইল। তার মুখচোখ দেখে মনে হল না, যুগলের কথায় খুব একটা ভরসা পেয়েছে।
আশ্বিনের সূর্য পুব আকাশের খাড়া পাড় বেয়ে বেয়ে অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে। রোদে আর কোমল সোনালি আভা নেই। স্নিগ্ধতা মুছে গিয়ে তাতে ঝকঝকে রং লেগেছে। যতদূর তাকানো যায়, ছোট ছোট ঢেউ-এর মাথায় তপ্ত রোদ নেচে বেড়াচ্ছে। সেদিকে বেশিক্ষণ কেউ চোখ পেতে রাখবে, সাধ্য কী।
বৈঠা টানতে টানতে যুগল বলল, ছুটোবাবু আমার মনে একখান সাধ হইছে।
কী? বিনু জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
আপনেরে একখান গীত শুনামু।
গান শোনাতে চাইছ?
হ।
সেদিন গানের কথা বলেছিল বটে যুগল। সারি-জারি-রয়ানি-ভাটিয়ালি, হেন গান নাকি নেই যা সে জানে না। বিনু বলল, বেশ তো, গাও না–
বৈঠাটা নৌকোর ওপর তুলে বাঁ হাতে বাঁ কানখানা চেপে ডান হাত আকাশের দিকে বাড়িয়ে গান ধরল যুগল :
ও ভাইটাল গাঙ্গের নাইয়া,
ময়ূরপঙ্খী নাও রে বাইয়া
কুন বা দ্যাশে যাও।
এই ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা,
আমার একখান কথা লও।
এই তো নদীর উজান বাকে
সোনার বালুর।
হেইখানেতে আছে আমার
পরাণ বন্দুর ঘর।
কইও খবর বন্দুর কাছে,
জলছাড়া মীন কয়দিন বাচে,
বাচে রে এ-এ-এ–
এই কথাটি না যদি কও,
আমার মাথা খাও।
ও ভাইটাল গাঙ্গের নাইয়া,
নাইয়া রে-এ-এ-এ—
বেশ সুরেলা, ভরাট গলা যুগলের। চারদিকের পদ্ম আর শাপলা বন, কচুরি ফুলের বেগুনি শোভা, ঝকঝকে নীলাকাশ, তার গায়ে থোকা থোকা মেঘ, দিগদিগন্তে ছুটে-যাওয়া আশ্বিনের অথৈ জলরাশি, উড়ন্ত পাখির ছায়া–পূর্ব বাংলার এই সজল ভুবনটির সঙ্গে যুগলের গানের আশ্চর্য মিল রয়েছে। শুনতে শুনতে মুগ্ধ হয়ে গেল বিনু।
গান শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার রেশ এখনও জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে কাঁপছে। যুগল সাগ্রহে শুধলো, গান ক্যামন শুনলেন ছুটোবাবু?
বিনু বিভোর হয়েই ছিল। বলল, খুব ভাল।
দেখলেন তো, আপনেগো যুগইলা হেই দিন মিছা কয় নাই। অ্যামন গান আমার মেলা জানা আছে। আপনেরে শিখাইয়া দিমু ছুটোবাবু। যা যা জানি বেবাক শিখাইয়া দিমু। বলে আবার বৈঠা জলে নামাল যুগল।
সীমাহীন এই শাপলা-পদ্মের বনে বসে যেদিকেই তাকানো যায়, শুধু জল আর জল। দূরে ধানের খেত, আর দূরে নীলাভ বনরেখা। এর ভেতর কোথাও লোকালয় থাকতে পারে, তা যেন ভাবাই যায় না। কিন্তু আছে, মাঝে মাঝে দু’চারখানা কৃষাণ গ্রাম দ্বীপের মতো মাথা তুলে রয়েছে।
কোনাকুনি দক্ষিণে পাড়ি দিয়ে একটা গ্রামে এসে পড়ল যুগলরা। গ্রাম আর কি, বিশ পঁচিশখানা টিনের বাড়ি এলোমেলো ছড়িয়ে আছে।
যুগল যে বাড়িতে এনে নৌকো থামাল সেটা অদ্ভুত ধরনের। এমন বাড়ি আগে আর কখনও দেখে নি বিনু। উঁচু ভিতের ওপর মোট খানচারেক ঘর। উঠোন বলতে কিছু নেই–ঘর ছাড়া বাদ বাকি সব দু’তিন হাত জলের তলায় ডুবে আছে। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাবার জন্য উঠোনের ওপর দিয়ে সাঁকো পাতা।
এই সকালবেলা দু’তিনটে কালো কালো আধ-ন্যাংটো ছেলেমেয়ে সাঁকোর ওপর বসে বড়শি বাইছিল। উঠোনের জলে পুঁটি আর বাঁশপাতা মাছের ঝাঁক ঘুরে বেড়াচ্ছে। বড়শিতে ভাত গেঁথে ফেলার শুধু অপেক্ষা। সঙ্গে সঙ্গে মাছ এক হ্যাঁচকা টানে জলতল থেকে উঠে আসছে।
যুগল নৌকো ভেড়ানোমাত্র ছেলেমেয়েগুলো চেঁচামেচি জুড়ে দিল, যুগলামামায় আইছে, যুগলামামায় আইছে–
নৌকোটাকে সাঁকোর বাঁশে বাঁধতে বাঁধতে যুগল বলল, তগো বাপে কই?
সবাই সমস্বরে উত্তর দিল, বাড়ি নাই।
মা?
ছেলেমেয়েগুলো চিৎকার করে ডাকতে লাগল, মা মা, দেইখা যাও ক্যাঠা আইছে—
১.১৪ সামনের একখানা ঘর
একটু পর সামনের একখানা ঘর থেকে মাঝবয়সী একটি মেয়েমানুষ বেরিয়ে এল। তেলহীন রুক্ষ চুল তার। এই আশ্বিনেও গা-ভর্তি ঘামাচি, ফলে চামড়া খসখসে, খই-ওড়া। গাল ভাঙা, চোখের কোল বসে গেছে, রংটি এক সময় মাজা মাজাই হয়তো ছিল। পরনে ময়লা ডুরে শাড়ি ছাড়া কিছুই নেই। এসব সত্ত্বেও তাকে ঘিরে নিবু নিবু একটু লাবণ্য এখনও টিকে আছে।
মেয়েমানুষটার দু’ধারে লম্বা লাউয়ের মতো স্তন চুষতে চুষতে দু’টো তিন চার বছরের ন্যাংটো বাচ্চা ঝুলছিল। দেখে মনে হল, সবসময় ওরা ওই ভাবেই ঝোলে। সাঁকোর ওপর উঠে এসে মেয়েমানুষটি বলল, আ রে যুগইলা পোড়াকপাইলা, রোজই নি আমাগো বাড়িত আসস! বলে একমুখ হাসল।
বিব্রত যুগল তাড়াতাড়ি পাটাতনের তলা থেকে শালমাছ বার করে বলল, আইতে আইতে এই মাছটা মারলাম, ভাবলাম তগো দিয়া যাই।
হাত বাড়িয়ে মাছ নিতে নিতে মেয়েমানুষটি বলল, রোজই দেখি মাছ মাইরা দিয়া যাইতে আছস।
