যুগল লগি ছেড়ে এখন বৈঠা বাইছে। নৌকোর তলায় ছপ ছপ করে একটানা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
বিনুর বড় লোভ হল দুটো শাপলা তুলে নেয়। হাত বাড়াতে গিয়ে এবারও বাধা পড়ল। যুগল চেঁচিয়ে উঠল, বুইকেন না ছুটোবাবু, বুইকেন না। শাপলার লতা টানতে গেলে পইড়া যাইবেন, এহানে কিলাম (কিন্তু) আথাই (অথৈ) জল। আপনে তো আবার সাতর জানেন না। একটু থেমে আবার বলল, আমিই তুইলা দিতে আছি।
নৌকো বাইতে বাইতে টপাটপ অনেকগুলো শাপলা তুলে বিনুর দিকে ছুঁড়ে দিল যুগল।
কিন্তু নিজে তুলতে না পারলে সুখ কোথায়? বিরস মুখে চুপচাপ বসে থাকল বিনু।
যুগল বলল, পদ্মফুল নিবেন ছুটোবাবু?
ভারী গলায় বিনু বলল, না।
শালুক?
না।
কচুরি ফুল?
না।
ক্ষুব্ধ কণ্ঠস্বর আর ক্রমাগত ‘না’ ‘না’ শুনে বিনুর মনোভাব খানিক যেন আন্দাজ করতে পারল যুগল। চিন্তিত মুখে বলল, গুসা নি করছেন ছুটোবাবু?
বিনু চুপ।
এবার একেবারে উদার হয়ে গেল যুগল। বরদানের ভঙ্গিতে বলল, আইচ্ছা তোলেন দুই চাইরটা। তয় (তবে) বেশি ঝুইকেন না।
বলমাত্র পদ্ম শাপলা এবং কচুরি ফুলে নৌকো বোঝাই করে ফেলল বিনু।
যুগল বলল, এইবার খুশি তো?
বিনুর মুখে হাসি ফুটল। কিছু বলল না সে।
জলজ ফুলের বনে আরও কিছুক্ষণ চলার পর হঠাৎ এক জায়গায় এসে নৌকো থামিয়ে দিল যুগল।
অবাক হয়ে বিনু শুধলো, কী হল?
সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে চাপা গলায় যুগল বলল, উই দ্যাখেন ছুটোবাবু– তার স্নায়ুগুলো ধনুকের ছিলার মতো টান টান হয়ে গেছে। দৃষ্টি পলকহীন, প্রখর। সর্বাঙ্গ ঘিরে বিচিত্র এক সংকেত ফুটে বেরিয়েছে যেন।
যুগলের আঙুল যেদিকে, সেদিকে তাকিয়ে বিনু দেখতে পেল, বড় একটা পদ্মপাতার কাছে তামাটে রঙের অসংখ্য মাছের ছানা কিলবিল করছে। বিনু শুধলো, কী ওগুলো?
চিনতে পারলেন না?
না।
যুগল বলল, হেই তো, আপনে চিনবেন ক্যামনে? আপনে কইলকাতার মানুষ। উইগুলান শৈলের (শোলমাছের) পোনা।
বিনু বলল, শোলের পোনা তো বুঝলাম। নৌকো থামালে কেন?
দ্যাখেন না, কী বাহারের মজা হয়– রহস্যময় হেসে পাটাতনের তলা থেকে দশ বার হাত লম্বা একটা সরু বাঁশের টুকরো বার করল যুগল, সেটার মাথায় অনেকগুলো ধারাল লোহার ফলা আটকানো।
বিনু জিজ্ঞেস করল, এটা কী?
ট্যাটা।
কী হবে এটা দিয়ে?
ইন্টু সবুর করেন ছুটোবাবু, নিজের চৌখেই দেখতে পাইবেন। বলতে বলতে পাটাতনের ওপর উঠে দাঁড়াল যুগল, হাতে সেই তীক্ষ্ণমুখ অস্ত্রটা।
নৌকোটা থেমে গিয়েছিল ঠিকই, তবে স্থির হয়ে নেই। হাওয়ার টানে জলের ওপর সেটা দুলছিল। ট্যাটাটা বাগিয়ে ধরে নিষ্পলক, স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তামারঙের শোলের ছানাগুলোর দিকে তাকিয়ে কী দেখল যুগল, তারপর শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে অস্ত্রটা ছুঁড়ে দিল।
জলের তলায় কী ঘটল, বিনু বুঝতে পারল না। তবে চারদিক তোলপাড় করে প্রকান্ড দানবের মতো কী যেন একটা সমানে আছাড় খেতে লাগল। তার ফল হল এই, অনেকখানি জায়গা জুড়ে পদ্ম আর শাপলার বন ভেঙেচুরে ছিঁড়েখুঁড়ে একেবারে তছনছ। আর যুগলের সেই ট্যাটার বাঁশটা একবার জলের তলায় ডুবতে লাগল, আবার ওপরে ভেসে উঠতে লাগল। ডোবা আর ভাসা চলল অনেকক্ষণ ধরে।
এদিকে খুশিতে দু’হাত ওপরে তুলে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে যুগল, পড়ছে, পড়ছে। শালার শৈল (শোল) যাইবা কই?
কিছুক্ষণ পর পদ্মবন শান্ত হয়ে এল। ট্যাটার বাঁশটা এখন জলের ওপর অল্প অল্প কাঁপছে। শোলের সেই পোনাগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
বৈঠা বেয়ে নৌকোটাকে টাটার কাছে নিয়ে এল যুগল। জল থেকে অস্ত্রটা যখন ওপরে টেনে তুলল, দেখা গেল, সেটার ধারাল ফলায় আড়াই হাতের মতো লম্বা একটা শোল মাছ বিধে আছে।
ক্ষিপ্র হাতে টাটার মুখ থেকে মাছটা খুলে নিয়ে পাটাতনের তলায় ঢুকিয়ে দিল যুগল। তারপর ফলাগুলো ধুয়ে ট্যাটাটা মাছের পাশে রাখতে রাখতে বলল, বুঝলেন নি ছুটোবাবু
কী বলছ? তক্ষুনি সাড়া দিল বিনু। বষ্যাকালে শৈলমাছে পোনা ছাড়ে। যতদিন না পোনাগুলা ডাঙ্গর (বড়) হয়, নিজে নিজে ঘুইরা ফিরা খাইতে শিখে ততদিন মা-মাছটা তাগো লগে লগে থাইকা পরি (পাহারা) দ্যায়।
তাই নাকি?
হ। যুগল মাথা নাড়ল, ইট্টু আগে যে পোনাগুলা দেখছেন, এই মাছটা তাগো মা।
বিনু হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেল, বিষণ্ণও। বলল, মাছটাকে তো মেরে ফেললে, ওর বাচ্চাগুলোর এখন কী হবে?
কী আবার হইব? অন্য মাছে ওগো খাইয়া ফেলাইব।
ইস! বিনুর চোখেমুখে কষ্টের রেখা ফুটল।
ছুটোবাবুর শরীলে বড় দয়ামায়া– যুগল হেসে ফেলল, বাচ্চার কথা ভাইবা যদিন মাছ না মারি, আমরাই বা খামু কী? এই লইয়া মন খারাপ কইরা থাইকেন না ছুটোবাবু। পিথীমিতে একজনেরে না মারলে আরেকজন বাঁচে না।
তবু বিনুর মন ভারাক্রান্ত হয়ে রইল।
ইতিমধ্যে যুগল আবার নৌকো বাইতে শুরু করেছে। অনেকখানি যাবার পর সে ডাকল, ছুটোবাবু–
বিনু তাকাল।
যুগল বলল, এই মাছটা লাইয়া অহন কী করি ক’ন দেখি। অহন তো হপায় (সবে) সকাল, হাট সাইরা ফিরতে ফিরতে রাইত দুফার হইয়া যাইব। ততক্ষণে মাছ যাইব পইচা। তাকে বেশ চিন্তিত দেখাল।
সত্যিই তো, মাছটা নিয়ে এখন কী করা উচিত বিনুও ভেবে পেল না।
হঠাৎ সমস্যাটার যেন কিনারা করে ফেলেছে এমনভাবে যুগল বলে উঠল, হইছে ছুটোবাবু, হইছে–
কী হয়েছে? বিনু জিজ্ঞেস করল।
