ছাউনিহীন নৌকোটায় এক লাফে উঠে পড়ল যুগল, তারপর চোখের ইশারায় বিনুকে উঠতে বলল।
এদিকে লারমোর, হেমনাথ আর অবনীমোহন দ্বিতীয় নৌকোটায় উঠে পড়েছেন। হেমনাথ বিনুকে ডাকলেন, আয় দাদা
বিনু বলল, আমি যুগলের নৌকোয় যাব।
না না, ও বাঁদরের সঙ্গে যেতে হবে না। চারদিকে অথৈ জল, শেষে বিপদ আপদ ঘটে যাবে। ওটার আবার হুঁশটুশ কম।
বিনু কিন্তু শুনল না। কেঁদে টেদে জেদ ধরে ফুগলের নৌকোতেই উঠল। অগত্যা হেমনাথ যুগলকে সতর্ক করে দিলেন, সাবধানমতো দাদভাইকে নিয়ে যাবি।
আইচ্ছা– যুগল ঘাড় কাত করে বলল, আপনে ভাইবেন না।
একসময় বাঁধন খুলে নৌকো চলতে শুরু করল। হেমনাথদের নৌকোটা আগে আগে চলেছে, বিনুদেরটা পেছনে।
দু’জন মাঝি হেমনাথদের নৌকো বাইছে। চোখের পলকে পুকুর পেরিয়ে সেটা ধানখেতের ভেতর ঢুকে গেল। বিনুদের নৌকোটা এখনও মাঝপুকুরেই রয়েছে। হঠাৎ ঝুমঝুম ঘুন্টির আওয়াজে যুগল এবং বিনু পেছন ফিরে তাকাল। দেখা গেল, বাগানের গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে ঝিনুকদের সেই চমৎকার ঝকঝকে ফিটনটা বাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছে। গাড়ির জানালায় ভবতোষ আর ঝিনুকের মুখও দেখতে পাওয়া গেল।
যুগল বলল, বড়কত্তায় তো বাইর হইল, উইদিকে ঝিনুক দিদিরা আইছে।
সেই কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, রুপোর কাজললতার মতো চোখ, গোলগাল জাপানি পুতুলের মতো মেয়েটা আবার এসেছে। বিনু কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
১.১৩ খুব বেশিক্ষণ ঝিনুকের কথা
খুব বেশিক্ষণ ঝিনুকের কথা বিনুর মনে থাকল না।
জীবনে এই তার প্রথম নৌকোয় ওঠা। ব্যাপারটা খুবই লোভনীয়, এর জন্য কাল সমস্ত রাত উত্তেজনায় ঘুমোত পারে নি। কিন্তু নৌকোয় উঠবার পর দেখা গেল, জলের ওপর সেটা ভীষণ দুলছে। ফলে মজার বদলে ভয় করতে লাগল বিনুর। মনে হল এই বুঝি পড়ে যায়, এই বুঝি পড়ে যায়। প্রাণপণে দু’হাতে পাটাতনের কাঠ চেপে ধরল সে।
লগি বাইতে বাইতে যুগল লক্ষ করেছিল। বলল, ডর নি লাগে ছুটোবাবু?
অন্য সময় হাজার ভয় পেলেও মুখ ফুটে বলত না বিনু। আর যার কাছেই হোক, যুগলের কাছে ভয়ের কথা বলতে মাথা কাটা যেত। কিন্তু জীবনে এই প্রথম টলমলে নৌকোয় উঠে বীরত্বের একটি কণাও নিজের ভেতর খুঁজে পেল না সে। কাঁপা গলায় বলল, হ্যাঁ। নৌকোটা বড্ড দুলছে। ডর নাই। পেরথম পেরথম উইরকম মনে হইব। দুই চাইর দিন নায়ে চড়েন, ঠিক হইয়া যাইব।
যুগল আশ্বাস দিল বটে, কিন্তু খুব একটা ভরসা বিনু পেয়েছে বলে মনে হয় না। বরং পাটাতন আরও জোরে আঁকড়ে ধরল।
কিন্তু ভয়ের ভাবটাও বিনুকে বেশিক্ষণ আছন্ন করে রাখতে পারল না। কেননা, যেদিকে যতদূর চোখ যায়, শরৎকাল তার সবটুকু মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে। মাথার ওপর সাদা সাদা ভবঘুরে মেঘ, তাদের ফাঁকে ফাঁকে নীল নয়নের চকিত চাহনির মতো আশ্বিনের আকাশ। মেঘ ছাড়া ওখানে পাখিও আছে–চেনা-অচেনা কত যে পাখি! আকাশের নীল ছুঁয়ে ছুঁয়ে পাখি আর মেঘেরা বাতাসে গা ভাসিয়ে রেখেছে।
নিচে শুধু জল আর ধানের খেত। মাঝে মাঝে নলখাগড়া জলঘাসের বন, ঝাড়ওলা ধঞ্চে আর কালো মুত্রার ঝোঁপ। আর আছে বউন্যা গাছ, কাউফলের গাছ, লাল ফুলে-ভরা মান্দার গাছ। আকাশ যেখানে ধনুরেখায় দিগন্তে নেমেছে, সারি সারি তালগাছ সেখানে এক পায়ে দাঁড়িয়ে। জলঘাসের মাথায়, মুত্রাঝোপে এই সকালবেলায় রাশি রাশি ফড়িং উড়ছে–নানা রঙের চিত্রবিচিত্র ফড়িং। তাদের ধরবার জন্য এসেছে ছোট ছোট বগাই পাখি।
ইতিমধ্যে রোদ উঠে গিয়েছিল। তরল সোনার মতো আলোয় চারদিক ভরে গেছে। এই আশ্বিনে জল যেন ঝকমকে আরশি। তাতে বউনাগাছের ছায়া, কাউফল গাছের ছায়া, নলখাগড়ার ছায়া কাঁপছে।
কলকাতা থেকে এতদূরে এই জল-বাংলায় শরৎকালটা বুঝিবা এক আশ্চর্য যাদুকর। ঝাপির ভেতর থেকে একের পর এক বিস্ময় বার করে খুব দ্রুত বিনুকে জয় করে নিতে লাগল সে।
কখন মস্ত পুকুরটা পেরিয়ে এসেছিল, বিনুর মনে নেই। নৌকোর তলায় এবং দু’ধারে সর সর আওয়াজে একসময় চমকে উঠল সে। দেখল তারা ধানখেতের ভেতর এসে পড়েছে।
সমানে লগি ঠেলছিল যুগল। নিবিড় ধানবন দু’ধারে সরে সরে নৌকোটাকে পথ করে দিচ্ছে। ধানগাছ কি আর দেখে নি বিনু? অনেক বার দেখেছে। বাসে করে বাবার সঙ্গে কলকাতা থেকে ডায়মন্ডহারবার যাবার সময় রাস্তার দু’পাশে অবারিত ধানের খেত চোখে পড়েছে। কিন্তু সে তো দূরে থেকে দেখা। এত কাছে বসে দেখার কথা আগে কখনও কল্পনাই করে নি সে।
বিনুর ইচ্ছে হল, ঘন সবুজ ধানপাতাগুলোকে একবারে ছুঁয়ে দেখে। হাতও বাড়িয়েছিল সে, কিন্তু ধরবার আগেই যুগল চেঁচিয়ে উঠল, ধইরেন না ছুটোবাবু, ধইরেন না–
চকিত বিনু তক্ষুণি হাতটা সরিয়ে আনল। বলল, কেন?
ধরলেই হাত কাইটা যাইব, ধানের পাতায় জবর ধার।
বিনু আর কিছু না বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকল।
বাড়ি থেকে মনে হয়েছিল, ধানের খেত একটানা দিগন্ত পর্যন্ত বুঝি ছুটে গেছে। কিন্তু তা নয়, খানিক দূর যাবার পর দেখা গেল ধানবন শেষ। তারপর শুধু জল আর জল। কাঁচের মতো স্বচ্ছ টলটলে জল পারাপারহীন সমুদ্র হয়ে দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে আছে। আশ্বিনের এলোমেলো অস্থির বাতাস তার ওপর অবিরাম ছোট ছোট ঢেউ তুলে যাচ্ছে। ঢেউ ছাড়া এখানে যা আছে তা রাশি রাশি শাপলা ফুল, আর আছে বড় বড় পদ্মপাতা, ফাঁকে ফাঁকে থোকা থোকা কচুরিপানা। কচুরিপানার মাথায় মুকুটের মতো সজীব নীলাভ ফুল। ফুলে ফুলে এই দূরবিস্তৃত জলরাশি ছেয়ে আছে।
