ভালবাসিবে বলে ভালবাসি নে,
আমার এই রীতি, তোমা বই জানি নে।
বিধুমুখে মধুর হাসি, দেখিলে সুখেতে ভাসি।
তাই তোমারে দেখতে আসি,
দেখা দিতে আসি নে।
ছোট বোনের গালে আস্তে টোকা দিয়ে সুনীতি বলল, শুনছিস, শুনছিস–
সুনীতির দিকে মুখ না ফিরিয়ে ঈষৎ ঝাঁঝাল গলায় সুধা বলল, শুনছি। তুই আর বকবক করিস না।
সুনীতির ঠোঁটে মুখে, চোখের কালো তারায় দুষ্টুমি নাচছিল। এমনিতে সে বেশ গম্ভীর। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রগলভতা যেন তার ওপর ভর করে বসেছে। সুধার কানের কাছে মুখটা নিবিড় করে সে বলল, এই সব গান খুঁজে খুঁজে কার জন্যে এনেছে জানিস?
কার জনে?
তোর জন্যে।
চাপা গলায় সুধা ঝঙ্কার দিল, তোকে বলেছে?
সুনীতি হেসে হেসে বলল, মুখে ফুটে ঠিক বলে নি। তবে—
কী?
তোকে ছাড়া আর কাকেই বা এসব গান শোনাতে পারে বল?
সুধার মাথায় এবার দুষ্টুমি ভর করল, কেন, তোকেও তো পারে।
মাথাটা ধীরে ধীরে দুলিয়ে সুনীতি বলল, উঁহু–
সুধা এবার আর কিছু বলল না, স্থির দৃষ্টিতে বড় বোনের দিকে তাকাল।
সুনীতি বলল, কাল থেকে তোর আর হিরণকুমারের ভেতর যা চলছে তাতে এই গানগুলো না শোনালে আমি ওর প্রাণদন্ড দিতাম।
সুধা চকিত হল। তার বিব্রত মুখে, চোখের তারায় ভয়ের মতো কিছু যেন ফুটল। কাঁপা গলায় সুধা শুধলো, কী চলছে আমাদের ভেতর?
কাল ফিটনে করে আসবার সময় দু’জনে মুখোমুখি বসে শুধু গল্প আর গল্প। বাড়ি ফিরেও সে গল্প থামে না। আজও বাগানের ভেতর দিয়ে আসতে আসতে দু’জনে কথার ফোয়ারা ছোটাচ্ছিলি। আর–
আর কী!
একজন আরেক জনের দিকে কেমন করে তাকিয়েছিলি জানিস?
কেমন করে?
একেবারে মুগ্ধ, মুগ্ধ, মুগ্ধ হয়ে—
সুধা ঠোঁট টিপল। চোখের তারা নাচিয়ে বলল, যেমন তুই আনন্দবাবুর দিকে তাকিয়েছিলি, না?
চোখ পাকিয়ে সুনীতি কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় গ্রামোফোনে কড় কড় করে খানিক কর্কশ আওয়াজ তুলে গান বন্ধ হয়ে গেল। সুধা সুনীতি চমকে সেদিকে তাকাল। বিনুও মাথা তুলতে চেষ্টা করল, পারল না। চোখ দুটোয় ঘন আঠা লাগিয়ে কেউ যেন আরও বেশি করে জুড়ে দিচ্ছে।
উদ্বেগের সুরে স্নেহলতা বললেন, কী হল রে হিরু?
খানিকক্ষণ গ্রামোফোনটা নাড়াচাড়া করে হিরণ বলল, স্প্রিং আর একটা ছোট কল কেটে গেছে।
তা হলে?
না সারালে রেকর্ড বাজবে না। কালই নারাণগঞ্জ থেকে এটা সারিয়ে আনব।
লারমোর ওধার থেকে আক্ষেপের সুরে বললেন, জমজমাট আসরটা একেবারে মাটি হয়ে গেল।
হেমনাথ বললেন, মাটি বলে মাটি–
স্নেহলতা সুরমা শিবানী–সবাই মগ্ন হয়ে শুনছিলেন। এমন চমৎকার গানের আসর মাঝপথে ভেঙে যাওয়াতে তাঁরাও দুঃখিত হলেন।
হঠাৎ সুধা বলে উঠল, গান কিন্তু এখনও চলতে পারে।
হিরণ উৎসুক হল, কিভাবে?
সুধা বলল, দিদি খুব ভাল গাইতে পারে। যদি একটা হারমোনিয়াম—
তার কথা শেষ হবার আগেই চাপা গলায় সুনীতি বলতে লাগল, এই সুধা, এই–
হিরণ হাসিমুখে বলল, ওঁকে এই এই করছেন কেন? আমাদের বাড়ি হারমোনিয়াম আছে। এক্ষুণি নিয়ে আসছি।
না–না, কিছুতেই না– সুনীতি দু’হাত সমানে নাড়তে লাগল।
না কি হ্যাঁ, পরে বোঝা যাবে’খন। আগে তো হারমোনিয়ামটা নিয়ে আসি। হিরণ উঠে দাঁড়াল। আমি গাইব না, কিছুতেই না। সুনীতি প্রায় চেঁচাতেই লাগল, শুনুন, আমার চাইতে সুধা ঢের, ঢের ভাল গাইতে পারে, অভিনয়ও করতে পারে। কলেজের ফাংশনে গান গেয়ে অভিনয় করে কত কাপ মেডেল পেয়েছে।
হিরণের চোখের তারা এবার সুধার দিকে ঘুরল। মুখ দেখে মনে হল, এতখানি বিস্মিত আগে আর কখনও হয় নি সে। আস্তে করে বলল, অভিনয় করতে পারেন? তাহলে পুজোয় একটা ভাল নাটক করতেই হয়।
হঠাৎ এই সময় হেমনাথ বললেন, আমাদের সুধাদিদি আর হিরণের মধ্যে দেখছি অনেক মিল। দু’জনেই কথাসরিৎসাগর, আবার দুজনেই অভিনয় করতে পারে।
সুরমা অবাক হয়ে বললেন, হিরণ অভিনয় করতে পারে!
পারে আবার না! হেমনাথ বলতে লাগলেন, প্লে বলতে তো ও একেবারে অজ্ঞান, নাওয়া খাওয়ার কথা পর্যন্ত ভুলে যায়। পুজোর ছুটিতে রাজদিয়ার সবাই ফিরে আসুক, তখন দেখবে হিরণচন্দর নাটক বগলে করে এ বাড়ি ও বাড়ি কেমন ছোটাছুটি করছে। তখন চলা-ফেরা-চাউনি দেখলে মনে হবে স্বয়ং শিশির ভাদুড়ি।
ঈষৎ অসহিষ্ণু সুরে হিরণ বলল, নাটক এখন থাক। আমি ছুটে গিয়ে হারমোনিয়ামটা নিয়ে আসছি।
সুধা হাসল, নীহারবালা, কনক দাসের রেকর্ড শোনার পর আমার গান কারও ভাল লাগবে না। না না, হারমোনিয়াম আনবেন না। কিছুতেই না।
এরপর হিরণ কী বলল, বিনু শুনতে পেল না। গাঢ় ঘুম চারদিক থেকে তখন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
১.১১ কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল, মনে নেই। একসময় আবছাভাবে পর পর ক’টা ডাক বিনুর কানে এল, এই বিনুবিনু, দাদাভাই–দাদাভাই–তারপরেই হাত ধরে টেনে কে যেন তাকে বসিয়ে দিলেন।
চোখভর্তি ঘুম। বসে বসেই ঢুলতে লাগল বিনু। সেই গলাটা আবার শোনা গেল, চোখে জল দে দাদাভাই। এই যে জল–
নিজে থেকে জল দেবার মতো অবস্থা নয়। যিনি কথা বলছিলেন তিনিই তার চোখেমুখে খানিকটা জল ছিটিয়ে দিলেন।
এবার ঘুম অনেকখানি ছুটে গেল। চোখ মেলে বিনু দেখতে পেল- হেমনাথ।
হেমনাথ বললেন, খাবি না? চল চল, সবাই খেতে বসে গেছে।
দু’হাতে বিনুকে কোলে তুলে হেমনাথ রান্নাঘরের বারান্দায় চলে এলেন। এখানে সারি সারি নকশা কাটা আসন পাতা। অবনীমোহন সুধা সুনীতি হিরণ লারমোর–সবাই একেকটা আসন দখল করে বসে আছেন। সামনের দিকে স্নেহলতা সুরমা এবং এ বাড়ির দু’টি আশ্রিতা বিধবা ভাতটাত নিয়ে প্রস্তুত। এখন হেমনাথ আর বিনু বসে গেলেই হয়।
