আপন মনেই এবার বুঝি লারমোর বললেন, আমি যদি এ দেশের মানুষ হতে পেরে থাকি তা ওই হেমের জন্যে। আমার সব কাজ সব ভাবনার পেছনে ঈশ্বরের দূত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আছে।
হেমনাথ চোখ পাকিয়ে তেড়ে উঠলেন, আবার—
কিছুক্ষণ নীরবতা।
এর ভেতর সুধা আর বিনু তক্তপোশে উঠে সুনীতির গা ঘেঁষে বসে পড়েছে।
একসময় হিরণের চোখে চোখ রেখে হেমনাথ ডাকলেন, অ্যাই শিম্পাজি—
মাথাটা সামনের দিকে ঈষৎ ঝুঁকিয়ে হেসে হেসে হিরণ বলল, চমৎকার খেতাব। এই মাথা পেতে নিলাম।
হিরণ এমনভাবে এমন সুরে বলল যে সবাই হেসে উঠল।
হাসাহাসির ভেতর লারমোর বললেন, তুমি দেখছি হিরুটাকে মানুষের ভেতরেই রাখতে চাও, হেম। নাম কেটে একেবারে শিম্পাঞ্জির দলে নামিয়ে দিলে!
দেব না? হেমনাথ বলতে লাগলেন, কাল রাত্তিরে সেই যে গেল বাঁদরটা, তারপর আজ এই এতক্ষণে আসার সময় হল। অথচ বলে গিয়েছিল, সকালবেলা আসবে, আমাদের সঙ্গে রাজদিয়া বেড়াতে যাবে। হেন তেন কত কী। একটা কথার যদি ঠিক থাকে! বলতে বলতে হিরণের দিকে ফিরে চোখ পাকালেন, সারাদিন কোন রাজিতে থাকা হয়েছিল শুনি? মিথ্যে কথা বললে কিন্তু মাথা ভেঙে দেব।
হিরণ চোখ তুলে একবার সুধাকে দেখে নিল। সুধার টেপা ঠোঁটে এবং চোখের তারায় শব্দহীন হাসি খেলে যাচ্ছিল। তার লাঞ্ছনায় মেয়েটা বুঝিবা খুব খুশি। তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে কপট ভয়ে হিরণ বলল, ভোর রাত্তিরে উঠে গয়নার নৌকো করে সিরাজদীঘায় আহাদ কাকার বাড়ি গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ফিরতি নৌকোয় সকাল সকাল চলে আসতে পারব। আহাদ কাকা দুপুরে না খাইয়ে ছাড়ল না। তাই তো ফিরতে দেরি হয়ে গেল।
হেমনাথ বললেন, আহাদের ওখানে কোন রাজকাৰ্যটা ছিল?
গ্রামোফোনের বাক্সটা তুলে ধরে হিরণ বলল, এইটা আনতে গিয়েছিলাম। গেল মাসে আহাদ কাকার মেয়ের বিয়ে গেছে না, তখন এটা নিয়ে গিয়েছিল।
আজই ওটার কী দরকার পড়ল?
লারমোর এই সময় বলে উঠলেন, গ্রামোফোন দিয়ে কী হয়? ছেলেটা ঘরে পা দিতে না দিতে তুমি যে মোক্তারের জেরা শুরু করে দিলে হেম। বোস রে হিরু–
হিরণ তক্তপোশের একধারে বসল।
গ্রামোফোনের নামে উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন লারমোর। বললেন, আজ একটু গানবাজনা হোক তা হলে।
হিরণ বলল, সেই জন্যেই এটা নিয়ে এলাম।
লারমোর শুধোলেন, কী কী রেকর্ড আছে রে?
রবীন্দ্রসঙ্গীতই বেশি।
রবীন্দ্রসঙ্গীত! মন্ত্র জপ করার মতো লারমোর বললেন, মানুষের পৃথিবীতে নিষ্পাপ, পবিত্র জিনিস খুব বেশি নেই। অল্প যে ক’টা আছে তার ভেতর রবীন্দ্রনাথের গান একটা, না কি বল হেম? বলে হেমনাথের দিকে তাকালেন।
আস্তে মাথা নাড়লেন হেমনাথ, হ্যাঁ। ওই গানগুলো দিয়ে ঈশ্বরকে যেন ছোঁয়া যায়।
ঠিক বলেছ। লারমোর আবার হিরণের দিকে ফিরলেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া আর কী আছে? কীর্তন?
হিরণ বলল, আছে দু’চারখানা।
ভাটিয়ালি?
আছে।
এ যে একেবারে মহোৎসবের ব্যাপার রে। দে, লাগিয়ে দে।
স্নেহলতা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন। এবার বলে উঠলেন, উঁহু উঁহু, এখন না।
লারমোর বললেন, তবে কখন?
সন্ধের পর। ইলিশ মাছগুলো রাত্তিরে খেতে হবে তো।
নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।
কাঁচা নিশ্চয়ই খাওয়া যাবে না। যাই, কিরকম কী রান্না হবে ওদের বলে আসি। বলতে বলতে হাতের ভর দিয়ে উঠে পড়লেন স্নেহলতা।
আকুল সুরে লারমোর বললেন, ইলিশ ভাতে আর ইলিশের ডিম দিয়ে টক যেন অবশ্যই হয়।
বর দেবার ভঙ্গিতে স্নেহলতা বললেন, হবে। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
একটু পরেই সন্ধে নেমে গেল। অন্ধকারটা কোথায় যেন হাত-পা গুটিয়ে চুপটি করে বসে ছিল, লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে চোখের পলকে দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ল। খুব ঘন করে বোনা কালো শাড়ির মতো আশ্বিনের সন্ধে চোখের সামনের সজল শ্যামল দৃশ্যপটকে দ্রুত মুড়ে ফেলতে লাগল।
এতক্ষণ জোনাকিদের দেখা পাওয়া যায় নি। হঠাৎ তারা উঠোনে, দূর ধান বনে, বাগানের নিবিড় গাছপালার ফাঁকে নাচানাচি শুরু করে দিল।
এদিকে স্নেহলতা ইলিশ মাছের ব্যবস্থা করে ঘরে ঘরে হেরিকেন জ্বালিয়ে দিলেন। তারপর দরজায় দরজায় জলছড়া দিয়ে সন্ধেবাতি দেখিয়ে পুবদুয়ারী ঘরে চলে এলেন। তক্তপোশের একধারে বসতে বসতে হিরণকে বললেন, নে, এবার আরম্ভ কর।
গ্রামোফোনে দম দিয়ে নতুন পিন লাগিয়ে রেকর্ড বাজাতে শুরু করল হিরণ। একের পর এক গান–সাহানা দেবীর, নীহারবালার, অমলা দত্তর, কনক দাসের। সবগুলোই রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান।
প্রায় সবাই তন্ময় হয়ে শুনছিল। কিন্তু তক্তপোশের দূর প্রান্তে যেখানে সুধা সুনীতি বসে আছে সেখানকার হাওয়ায় ফিসফিসানির মতো একটা শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে।
বিনুও সুধা সুনীতির কাছেই এতক্ষণ বসে ছিল, এখন শুয়ে পড়েছে। সারাদিন ঘোরাঘুরি গেছে। আর বসে থাকতে পারছিল না সে। চোখের পাতা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে জুড়ে আসছিল।
এই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটা বাজছে, আমার প্রাণের মাঝে সুধা আছে—
আধো ঘুমে বিনু শুনতে পেল সুনীতি সুধাকে বলছে, অ্যাই ছুটকি সুধা বলল, কী বলছিস? বেছে বেছে কিরকম গান এনেছে দেখেছিস? কিরকম? গলা আরও নামিয়ে সুনীতি বলল, একেবারে সুধামাখানো।
আড়ে আড়ে একবার স্নেহলতা সুরমাদের দেখে নিয়ে জিভ ভেংচে দিল সুধা, ভাল হবে না বলছি দিদি-ই-হি-হি-হি–
আগের গানটা শেষ হয়ে গিয়েছিল। হিরণ রেকর্ড বদলে দিল। নতুন গানটায় মৃদু নেশার মতো আলতোভাবে কী যেন জড়ানো।
