চুপচাপ বিনু দেখে যাচ্ছিল। দড়ি বাঁধা যখন শেষ হয়ে এসেছে সেই সময় কোত্থেকে যেন সুধা এসে হাজির। অবাক চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বলল, এগুলো কী?
যুগল বলল, ফা (ফাঁদ)।
কী হবে এসব দিয়ে?
বিনুকে যেভাবে বলেছিল তেমনি রহস্যের সুরে হেসে হেসে যুগল সুধাকে বলল, অহন কমু না।
সুধা ভুরু কুঁচকে তাকাল, বললে কী হবে?
আগে থিকা কইলে গুণ নষ্ট হইয়া যাইব।
সুধার চোখমুখ বিরক্ত, কিছুটা বা বিমূঢ় দেখাল। আর কিছু বলল না সে।
দড়ি বাঁধা হয়ে গিয়েছিল। যুগল বলল, আসেন ছুটোবাবু, আসেন ছুটোদিদি, ফাল্গুলার ব্যবোস্তা কইরা আসি।
সুধা আর বিনুকে নিয়ে পুকুরপাড়ে চলে এল যুগল। তারপর বেতের ফাঁদগুলো জলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল। লম্বা দড়ির একদিক দিয়ে ফাঁদগুলো বাঁধা, দড়ির অন্য প্রান্তগুলো চারপাশের গাছপালার মোটা ডাল বা গুঁড়িতে বেঁধে রাখল যুগল।
বিনু বলল, এগুলো জলে ফেললে যে?
যুগল বলল, সাতখান দিন সবুর করেন ছুটোবাবু, তারপর বুঝতে পারবেন ক্যান ফেলাইছি।
ফাঁদটাঁদ ফেলা হয়ে গেলে সুধা-বিনু-যুগল কথা বলতে বলতে আবার বাগানে ফিরে এল। আর তখনই দেখা গেল, রাস্তার দিক থেকে মস্ত এটা বাক্স হাতে ঝুলিয়ে হিরণ আসছে। বিনুরা দাঁড়িয়ে পড়ল।
কাছাকাছি এসে একমুখ হাসল হিরণ। সুধার চোখে চোখ রেখে খুব খুশি গলায় বলল, আরে আপনি! বাগানে কী করছেন?
কেমন করে যেন হাসল সুধা। রাজহাঁসের মতো গলাটা ঈষৎ বাঁকিয়ে মজার গলায় বলল, আপনার জন্যেই দাঁড়িয়ে আছি।
আমার জন্যে!
হ্যাঁ স্যার—
আমি এখন আসব, আপনি জানতেন?
স্বরে দীর্ঘ টান দিয়ে সুধা বলল, হুঁ—
হিরণ বলল, কেমন করে জানলেন?
হাত গুনে—
হিরণ আর কিছু বলল না, উজ্জ্বল হাসিভরা চোখে তাকিয়ে রইল।
একটুক্ষণ নীরবতা। তারপর হিরণের হাতের বাক্সটা দেখিয়ে সুধা বলল, ওটা কী?
গ্রামোফোন। আপনাদের জন্যে নিয়ে এলাম।
পাশ থেকে যুগল বলে উঠল, গামাফোন কী হিরু দাদা?
হিরণ বলল, কলের গান।
যুগল এবার প্রায় লাফিয়ে উঠল গান শুনুম, গান শুনুম—
সুধা হিরণকে বলল, বাগানে দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে, ঘরে গিয়ে গান শোনা যাক।
চলুন–
চারজনে বাড়ির দিকে চলতে শুরু করল। সুধা হিরণ আগে আগে, যুগল বিনু পেছনে।
যেতে যেতে হিরণের সঙ্গে খুব কথা বলতে লাগল সুধা, আর হাসতে লাগল। এমনিতেই প্রচুর কথা বলে সে, দিনরাতই বকবকায়মান। কিন্তু এখনকার প্রগলভতার তুলনা নেই।
পেছন থেকে আড়ে আড়ে বিনু দেখতে লাগল, ছোটদির চোখে মুখে হাসি নাচছে, আর কী এক অলৌকিক আলো খেলে যাচ্ছে। সুধার মুখে এমন হাসির ছটা, আলোর খেলা আগে আর কখনও দেখে নি বিনু।
১.১০ হিরণ আর সুধা
হিরণ আর সুধা সোজা পুবদুয়ারী ঘরখানায় চলে এল, তাদের পিছু পিছু বিনুও। যুগলও সঙ্গে এসেছিল। সে ভেতরে ঢুকল না। দরজার কাছে উদ্গ্রীব দাঁড়িয়ে থাকল।
অবনীমোহন কি লারমোর, সুরমা কিংবা স্নেহলতা–সবাই ঢিলেঢালাভাবে তক্তপোশে বসে ছিলেন। আর এলোমেলো গল্প করছিলেন।
হিরণকে দেখে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন লারমোর। উচ্ছ্বাসের সুরে বললেন, আরে শ্যামচন্দর যে! আয় আয়।
ঘাড় বাঁকিয়ে হাসিমুখে হিরণ বলল, আমি তো শ্যামচরকালো কুটকুটে। তুমি কী?
সুর করে এক কলি গেয়ে উঠলেন লারমোর, আমি গোরাচাঁদ হে—
তাই নাকি!
নিশ্চয়ই। বিশ্বসংসার সে কথা বলবে। নিজের একখানা হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে লারমোর বললেন, দ্যাখ কেমন ধবধবে–
ঠোঁট কুঁচকে কপট তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে লালমোরের হাতখানা ঠেলে দিল হিরণ, এ হাত বার করে আর রঙের গর্ব করতে হবে না। গোরাচাঁদ একদিন হয়তো ছিলে, এখন আর নেই। এদেশে থাকতে থাকতে–
সন্দিগ্ধ চোখে লারমোর তাকালেন, থাকতে থাকতে কী?
আমাদের মতো কষ্টিপাথর হয়ে গেছ।
বলছিস, বলছিস?
একবার কেন, হাজার বার বলছি।
একটু আগে লারমোরের চোখেমুখে কণ্ঠস্বরে লঘু কৌতুকের আভা ছিল, এবার তাতে ভিনভাবের রং লাগল। আবেগপূর্ণ সুরে তিনি বলতে লাগলেন, কষ্টিপাথরই আমি হতে চেয়েছিলাম রে। যেদিন প্রথম এদেশে আসি সেদিন থেকেই আমার সাধ বাঙালি হব। তারপর চল্লিশ বছর ধরে সেই চেষ্টাই করে আসছি। নিজের বলতে যা ছিল সব ফেলে দিয়ে, সব ভুলে গিয়ে এ দেশের অন্ন-বস্ত্র-ভাষা মাথায় তুলে নিয়েছি। প্রাণভরে সারা গায়ে এখানকার আলো-বাতাস ধুলোকাদা মেখেছি। বাকি ছিল গায়ের রংটা। তুই তো বলছিস, রঙের গর্ব আমার ঘুচেছে। এতদিনে আমি কি তবে পুরোপুরি এদেশের মানুষ হতে পারলাম?
লারমোরের আবেগ হিরণের বুকের অতলে সব চাইতে স্পর্শকাতর তারটাকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। গম্ভীর গলায় সে বলল, তুমি শুধু এদেশের মানুষ না লালমোহন দাদু, সব দেশের সব কালের মানুষ। তুমি বাঙালি হতে চেয়েছ, তার বদলে আমরা যদি তোমার মতো হতে চাইতাম, জীবন ধন্য হয়ে যেত।
খানিক আগের ঘোরটা হঠাৎ কেটে গেল। হালকা গলায় লারমোর বললেন, থাক, আমাকে আর আকাশে তুলতে হবে না। একটু থেমে আবার বললেন, যার মতো হলে সত্যি সত্যি ধন্য হতে পারতুম সে আমি না, ওই মানুষটা–
লারমোর আঙুল দিয়ে হেমনাথকে দেখিয়ে দিলেন।
বিব্রতভাবে চেঁচামেচি করে উঠলেন হেমনাথ, বেশ তো দু’জনের ভেতর হচ্ছিল। তার মধ্যে আমাকে আবার টানাটানি কেন? হিরণ তোমাকে আকাশে চড়াতে চাইছে। একলাই ওঠ না বাপু। অত উঁচুতে ওঠার লোভ আমার নেই।
