হেমনাথ বললেন, বিরাট লাভের কারবার কেঁদেছে যে লালমোহন।
লারমোর হাসতে হাসতে বলতে লাগলেন, তা যা বলেছ হেম। পনের দিন, বিশ দিন পর পর ঢাকা থেকে দেড়শ’ দুশ’ টাকার করে ওষুধ আনিয়ে দিচ্ছ। আর চক্ষের পলকে আমি উড়িয়ে দিচ্ছি। কারবারটা লাভের বৈকি।
অবনীমোহনের মুখ দেখে মনে হল, কিছুই বুঝতে পারছেন না। তার মনের কথা খানিক আন্দাজ করে হেমনাথ বললেন, আমি মুখে আর কতটুকু বলতে পারব? লারমোরকে ক’দিন দেখ, এত ওষুধ নিয়ে ও কী করে নিজেই বুঝতে পারবে।
অবনীমোহন কী বলতে যাচ্ছিলেন, সেই সময় পানের রসে ঠোঁট টুকটুকে করে সুরমা আর স্নেহলতা এ ঘরে এলেন। শিবানী অবশ্য আসেন নি।
ঘরে পা দিয়েই স্নেহলতা বললেন, এ বেলা তো বাঁচা মাছ, সরপুঁটি আর পাবদাখাওয়া হল। ওবেলা কী হবে?
হেমনাথ বললেন, কেন, ইলিশই তো আছে—
স্নেহলতা কিছু বলবার আগেই হঠাৎ সুর করে ছড়া কেটে উঠলেন লারমোর :
পয়লা পাতে কিছু তিক্ত
ঘৃত দুই হাতা।
তাহার পর মুগ দাইল (মুগ ডাল)
সহ ইলিশ মাথা।
সরিষার পাক দিয়া ইলশার ঝাল,
কাঁচা মরিচ ফোড়ন দিয়া ইলশার ঝোল,
এর সাথে পাই যদি ভাজা খান চার,
স্বর্গ তো থাকে না রামা বেশি
দূরে আর।
শাস্ত্রমতে রাইন্ধা ইলিশ
অন্যথা না হয়
অন্যথা করিবে যে, আমার
মাথা খায়।
চোখ এবং ঠোঁট কুঁচকে শুনে গেলেন স্নেহলতা। তারপর বললেন, আজকাল বুঝি খুব মঙ্গলকাব্য পড়া হচ্ছে।
ঘাড় কাত করলেন লারমোর, হ্যাঁ, খুব ভাল জিনিস।
কী ভাল? চোখের তারা তীক্ষ্ণ করে স্নেহলতা জিজ্ঞেস করলেন, সারা মঙ্গলকাব্য, না তার ভেতর বেছে বেছে এই ইলিশ মাছের জায়গাটা?
এক গাল হেসে লারমোর বললেন, ইলিশ মাছের জায়গাটা। ঈশ্বরের পৃথিবীতে এমন বস্তু আর সৃষ্টি হয় নি।
সস্নেহ প্রশ্রয়ের সুরে স্নেহলতা বললেন, একটা মেছো বেড়াল।
লারমোর কী বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বিনুর চোখ জানালার বাইরে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চঞ্চল হয়ে উঠল সে। দূরে বাগানের ভেতর ডালপালাওলা ঝুপসি মতো কী যেন টেনে টেনে আনছে যুগল।
আজ এই প্রথম যুগলকে দেখল বিনু। সকালবেলা হেমনাথের সঙ্গে রাজদিয়া দেখতে বেরিয়েছিল তারা। নদীতীর, স্টিমারঘাট, মাঝিঘাট, আশ্বিনের যাদুভরা নীলাকাশ, ইলিশ মাছের আড়ত, রামকেশব, রুমা ঝুমা-নানা দৃশ্য, বিভিন্ন মানুষ, বিচিত্র সব ঘটনা বিনুকে এত মুগ্ধ এবং বিস্মিত করে রেখেছিল যে যুগলের কথা একবারও তার মনে পড়ে নি। অথচ রাজদিয়াতে এসে যাকে সব চাইতে তার ভাল লেগেছে, বিস্ময়কর মনে হয়েছে, সে যুগল।
জানালার বাইরে থেকে চোখদুটো এবার ভেতরে নিয়ে এল বিনু, একবার লারমোরকে দেখে নিল। এই মানুষটিও তার কাছে কম বিস্ময়কর নন। যুগল এবং লারমোর–দু’ধারের দুই বিস্ময়ের টানাটানিতে শেষ পর্যন্ত যুগলই জিতল। পায়ে পায়ে ঘরের বাইরে এসে এক ছুটে বিনু বাগানে এসে হাজির।
দূর থেকে ঝুপসি জঙ্গলমতো মনে হয়েছিল। কাছে এসে বিনু দেখতে পেল, সরু সরু লম্বা পাতা আর কাঁটাভর্তি মোটা মোটা অসংখ্য লতা স্তুপাকার হয়ে আছে। রুপোর মতো চকচকে ধারাল দা দিয়ে ক্ষিপ্র হাতে পাতাটাতা হেঁটে যুগল লতাগুলো একধারে সাজিয়ে রাখছিল। বিনুকে দেখে মুখ ভরে হাসল সে, এই যে ছুটোবাবু, সকাল থিকা আপনের দেখা নাই। কতবার যে খোঁজ করছি!
বিনু বলল, আমরা দাদুর সঙ্গে বেরিয়েছিলাম।
হে তো জানিই। আপনেরা রাইজদা দেখতে গেছিলেন। তা অ্যাত দেরি করলেন ক্যান?
দেরি হবার কারণটা সংক্ষেপে জানিয়ে দিল বিনু।
যুগল শুধলো, আমাগো রাইজদা ক্যামন দেখলেন ছুটোবাবু? বলে এমনভাবে তাকাল যেন বিনুর ভাল-মন্দ’ বলার ওপর তার বাঁচামরা নির্ভর করছে।
বড্ড ছোট। অন্যমনস্কের মতো উত্তর দিয়ে কাঁটালতাগুলো দেখিয়ে বিনু বলল এগুলো কী?
ব্যাত, ব্যাতের লতা।
কী হবে এগুলো দিয়ে?
রহস্যময় হেসে যুগল বলল, হইব এট্টা জিনিস। এটু খাড়ন, নিজের চৌখেই দেখতে পাইবেন।
বিনু উত্তর দিল না।
যুগল আবার বেলল, বেথুন খাইছেন ছুটোবাবু?
‘বেথুন’ শব্দটা জীবনে এই প্রথম শুনল বিনু। অবাক হয়ে সে বলল, বেথুন কী?
ব্যাতের ফল। বেতফল আবার খায় নাকি?
খায়, খায় ছুটোবাবু। অ্যামন বস্তু না খাইলে জীবন এক্কেরে ব্রেথা (বৃথা)। বলে, চোখ বুজে মুখের ভেতর যেন বেতফলের স্বাদ নিতে লাগল যুগল।
বেতফল কখনও খায় নি বিনু। ওটা না খেলে জীবন বৃথা হয়ে যায় কিনা, এই মুহূর্তে বুঝতে পারল না সে। আস্তে করে শুধু বলল, কেমন লাগে খেতে?
নিজের মুখে আর কী কমু ছুটোবাবু, চত্তির মাসে ব্যাতফল পাকব। তহন খাইয়া দ্যাখবেন।
বিনু বুঝল, যুগলের কথার সত্যাসত্য যাচাই করতে হলে চৈত্র মাস পর্যন্ত তাকে ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। এখন সবে আশ্বিন।
দেখতে দেখতে সবগুলো বেতের লতা থেকে পাতাটাতা হেঁটে ফেলল যুগল। লতাগুলোর গায়ে অবশ্য চোখা চোখা ধারাল কাটা থেকেই গেল, সেগুলো আর চাছল না। পাতা ছাঁটা হলে কাটাসুদ্ধ একেকটা বেত নিয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে এক ধরনের অদ্ভুত আকারের গোল ঠোঙা তৈরি করতে লাগল যুগল। ঠোঙাগুলোর একটা দিক খুব সরু, তারপর বেতের পাক ক্রমশ বড় হয়ে মুখের কাছটা মস্ত হয়ে উঠেছে। মুখটার ব্যাস প্রায় পৌনে এক হাতের মতো।
পঁচিশ তিরিশটা ঠোঙা তৈরি হলে প্রতিটার সরু দিকে একটা করে লম্বা দড়ি বাঁধতে লাগল যুগল।
