পাশ থেকে শিবানী আস্তে করে বললেন, আমি একটা মোটা লাঠি যোগাড় করে রেখেছি বৌদি। খেতে না পারলে–
স্নেহলতা বাকিটুকু পূরণ করে দিলেন, ওই লাঠিটা দিয়ে আমরা ননদ-ভাজে গলার ভেতর খুঁজে গুঁজে দেব।
হঠাৎ দু’হাত জোড় করে, মাথা ঝুঁকিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে লারমোর বলে উঠলেন, তার চাইতে আমার প্রাণদন্ডের আজ্ঞা হোক মহারানী।
স্নেহলতা রাগ করতে গিয়েও হেসে ফেললেন, খুব হয়েছে। কত রঙ্গই যে জানো সাহেব!
সমস্ত ব্যাপারটাই যে নির্মল কৌতুকের খেলা, চারধারে দাঁড়িয়ে বিনুরা বেশ বুঝতে পারছিল। হেমনাথদের সঙ্গে লারমারের সম্পর্কটা কতখানি মধুর আর মনোরম তাও টের পাচ্ছিল। যাই হোক, স্নেহলতাকে হাসতে দেখে সবাই হেসে উঠল।
হাসতে হাসতেই স্নেহলতা বললেন, নেহাত ভাগনী, ভাগনীজামাই, নাতি নাতনীরা কলকাতা থেকে এসেছে, তাই ছুটে আসা হয়েছে। নইলে কবে আসত তার কি কিছু ঠিক আছে! সারা দিন এত রাজকার্য করতে হয়ে যে দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে যাবার ফুরসত হয় না।
এই সময় পেছন থেকে হেমনাথ বলে উঠলেন, রমুদের জন্যেই শুধু না গো গিন্নি, ইলিশের গন্ধেও লালমোহন ছুটে এসেছে। বলে হাতের মাছগুলো তুলে দেখালেন।
ইলিশ দেখাতে গিয়ে এমন বিপদ হবে, কে জানত। বেশ আড়ালে আড়ালে ছিলেন হেমনাথ, একেবারে তোপের মুখে পড়ে গেলেন। স্নেহলতার মনোযোগ লারমোরের দিক থেকে এবার তার ওপর এসে পড়ল। চোখ কুঁচকে স্নেহলতা বললেন, এই যে আরেক জন
ভীত সুরে হেমনাথ বললেন, আমি আবার কী করলাম?
সেই সকাল থেকে কোন দিগ্বিজয় করে আসা হল শুনি? এখন কত বেলা হয়েছে হুঁশ আছে?
হেমনাথ ভেবেছিলেন, ইলিশের কথা তুললে লারমোরকে নিয়ে মজাটা আরও জমবে। কিন্তু সেটা পুরোপুরি তার বিরুদ্ধেই গেল। মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, ওদের রাজদিয়া দেখাতে দেরি হয়ে গেল। তা ছাড়া রামকেশবটা
তার কথা শেষ হতে না হতে স্নেহলতা গলা চড়ালেন, চান নেই খাওয়া নেই, ঘুরে ঘুরে আমার সোনাদের মুখগুলো কালো হয়ে গেছে। এদিকে রমুটাও না খেয়ে বসে আছে, অসুস্থ রোগা মানুষ। বাড়ি থেকে একবার বেরুতে পারলে ফেরার কথা কি তোমার মনে থাকে!
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে আর ভরসা হল না হেমনাথের, ইলিশ মাছ নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে রান্নাঘরের দিকে অদৃশ্য হলেন।
স্নেহলতা ঠোঁট টিপে হেসে ফেললেন, যাবার রকম দেখ না! সারাদিন চড়ায় বড়ায় ঘুরে এখন ইলিশ দিয়ে ভোলাতে এসেছে। ভেবেছে ইলিশ দেখলে আমি স্বর্গে চড়ব। বলতে বলতে লারমোরের দিকে তাকালেন, এই যে সাহেব, আর সঙের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে ঘরে আসা হোক। ভাল কথা, আমি কিন্তু এ বেলা ইলিশ বেঁধে খাওয়াতে পারব না।
লারমোর বললেন, বেশ তো, রাত্তিরেই খাব। ও জিনিস যখন চোখে একবার দেখেছি, না খেয়ে যেতে পারব না। গুরুর বারণ।
ইলিশের নামে জিভ একেবারে সাত হাত। মধুর হৃভঙ্গে লারমোরকে বিদ্ধ করে বিনুদের দিকে চোখ ফেরালেন স্নেহলতা, এস দাদারা, এস অবনী—
.
এ বেলার খাওয়াদাওয়া সারতে সারতে বেলা হেলে গেল। পশ্চিম আকাশের ঢালু পাড় বেয়ে সূর্যটা অনেকখানি নেমে গেছে। রোদের রং এখন কাঁচা হলুদের মতো। গাছের পাতাগুলো দিনশেষের আলোয় যেন সোনালি ঝালর হয়ে উঠেছে। দু’টো পাখি ওধারের ঘরের চালে বসে ছিল। হঠাৎ কী হল, একটা পাখি চঞ্চল ডানায় তার সঙ্গীকে ঘিরে কিছুক্ষণ উড়ে উড়ে মুখোমুখি বসল, তারপর ঠোঁটে ঠোঁট ঘষে সোহাগ জানাতে লাগল, আদর করতে লাগল। বুঝিবা আশ্বিনের এই বিকেল তাদের যাদু করেছে।
উঠোনের এক ধারে আঁচিয়ে অবনীমোহনরা পুবের ঘরের ঢালা তক্তপোশে এসে বসলেন। সবাই এসেছেন, শুধু সুধা বাদ। অবশ্য স্নেহলতা শিবানী এবং সুরমাও আসেন নি। তাদের এখনও খাওয়া হয় নি। হেমনাথদের খাইয়ে এই সবে তারা খেতে বসেছেন।
পুবের ঘরে এসে কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। তারপর লারমোরই শুরু করলেন। প্রথমে বিনু আর সুনীতির সঙ্গে ঠাট্টাটাট্টা করে অবনীমোহনের সঙ্গে কলকাতার গল্প জুড়ে দিলেন। হালকাভাবে হিটলার, ইউরোপ এবং যুদ্ধের প্রসঙ্গও উঠল।
বড় বড় পলকহীন চোখে লারমোরের দিকে তাকিয়েই আছে বিনু। এই মানুষটি সম্বন্ধে তার বিস্ময় আর কাটছে না। কলকাতায় হাজার হাজার সাহেব দেখেছে সে। কিন্তু এদেশের পোশাক, এদেশের ভাষা, এদেশের অন্ন এমন নিষ্ঠায় এমন মমতায় গ্রহণ করে এরকম বাঙালি হয়ে যেতে আগে আর কাউকে দেখে নি।
কলকাতার গল্প, যুদ্ধের গল্প শেষ করে লারমোর হেমনাথের দিকে ফিরলেন, বুঝলে ভাই–
হেমনাথ জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন, কী বলছ?
ওষুধ তো ফুরিয়ে গেছে।
ফুরিয়ে গেছে।
হ্যাঁ, হেম। আস্তে মাথা নাড়লেন লারমোর।
বালিশে শরীর সঁপে দিয়ে আধশোয়ার মতো ছিলেন হেমনাথ। এবার উঠে বসলেন, কুড়ি দিনও হয়নি, ঢাকা থেকে আড়াই শ’ টাকার ওষুধ তোমাকে আনিয়ে দিয়েছি। এর ভেতর খতম করে ফেললে!
লারমোর হাসলেন, কী করব বল?
অবাক চোখে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল বিনু। এবার বিমূঢ়ের মতো লারমোরকে দেখতে লাগল। আড়াই শ’ টাকার ওষুধ তো একটুখানি ব্যাপার না, লারমোর কি কুড়ি দিনে সব খেয়ে ফেলেছেন। বিনুর একবার ইচ্ছে হল, জিজ্ঞেস করে। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই অবনীমোহন শুধোলেন, এত ওষুধ দিয়ে কী হল? বিনুর মতো তিনিও বুঝিবা কিছুটা বিমূঢ় হয়েছেন।
