কয়েক পলক অবাক তাকিয়ে থাকে বিনু। যুগল এবং মুকুন্দপুরের অন্য সব বাসিন্দা আচমকা এমন একটা অনুরোধ করে বসবে, ভাবা যায় নি। সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। বিস্ময়ের ধাক্কাটা সামলে নিয়ে বলল, আমি থাকব কলকাতায়। সেখানে আমার দিদিরা আছে, বাবা আছে। চাকরি বাকরিও ওখানেই করতে হবে। এতদূরে জমি নিয়ে কী করব?
যুগল বোঝায়, পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ মানুষ চলে আসছে। দু’পাঁচ বছরের মধ্যে সীমান্তের এপারে দশ হাত জায়গাও ফাঁকা থাকবে না। অযাচিতভাবে মুকুন্দপুরের জমিটা যখন পাওয়াই যাচ্ছে, যার জন্য একটা পয়সাও দাম দিতে হবে না, ভবিষ্যতের কথা ভেবে সেটা নেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
যুগল বলতে থাকে, আপনেরে কিছুই করতে হইব না ছুটোবাবু। জঙ্গল সাফ হইলে আপনের নামে সাত কাঠা জমিন মাইপা, খুটি কুইপা (পুঁতে) সীমানা ঠিক কইরা দিমু।
বিব্রত বিনু বলে, কোনও দিন আমার পক্ষে এখানে এসে বাড়ি তৈরি করে থাকা সম্ভব নয়। শুধু শুধু কেন জমি দিতে চাইছ? আমাদের একটা বাড়ি তো কলকাতায় আছে। যাদের অনেক বেশি দরকার, বর্ডারের এপারে মাথা গোঁজার জায়গা নেই, তাদের বরং জমিটা দিও। সেটাই সত্যিকারের ভাল কাজ হবে।
যুগল জেদের সুরে বলে, ঘর তোলেন না-তোলেন, উই জমিন আপনেরই থাকব। অন্য কেওরে (কাউকে) দিমু না।
বিনু ধরেই নেয়, যুগলের মাথায় যে গোঁ চেপেছে সেটা থেকে তাকে টলানো যাবে না। চিরকালই সে আবেগের ঝোঁকে চলে। কোনও ওজর, কোনও যুক্তিই সে কানে তোলে না।
অসহায়ের মতো বিনু বলল, এর কোনও মানে হয়?
ওধার থেকে হরনাথ বলল, চলেন, আপনের নামখান লেইখা রাখি।
বিনু বিমূঢ়ের মতো জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাব? নাম লেখাবার কারণটা কী?
গ্যালেই বুঝতে পারবেন।
জঙ্গল পেছনে ফেলে, বসতির ভেতর এক কোণে একটা টালির ছাউনিওলা দোচালা ঘরে বিনুকে নিয়ে আসে হরনাথেরা। দরজার মাথায় টিনের পাতের ওপর লেখা : মুকুন্দপুর বাস্তুহারা কল্যাণ সমিতি।
হরনাথ বলল, এইটা হইল আমাগো কুলোনির অফিস।
ঘরের ভেতর মাঝারি সাইজের শস্তা একটা টেবল, দুতিনটে নড়বড়ে কাঠের চেয়ার। একধারে আধভাঙা পুরনো আলমারি, কাঁচা বাঁশের বেড়ার গায়ে এ বছরের ক্যালেণ্ডার ঝোলানো। ক্যালেণ্ডারটা যেদিকে, তার উলটো দিকের বেড়ায় কয়েক জন বরেণ্য দেশনেতার ছবি। দেশবন্ধু গান্ধীজি সুভাষচন্দ্র এবং রবীন্দ্রনাথ।
বিনু যুগল আর হরনাথ ঘরের ভেতর চলে এসেছিল। বাকিরা সব দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
বিনুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে আলমারি থেকে একখানা মোটা, লম্বা, বাঁধানো খাতা বার করে টেবলে রেখে নিজেও বসল হরনাথ। বলল, কারা কারা কোন কোন তারিখে মুকুন্দপুর কুলোনিতে আইসা ঘর তুলছে, তাগো ফেমিলিতে কতজন কইরা মেম্বার, দ্যাশভাগের আগে বর্ডারের উই পারে কুন কুন গেরামে হেরা থাকত, কারে কতটুক জমিন দেওয়া হইছে, এই হগল খাতায় লেইখা রাখছি। একটা রেকর্ড থাকন ভাল, না কি কন?
আস্তে মাথা নাড়ে বিনু।
হরনাথ বলতে লাগল, গভর্নমেন্ট রিফুজিগো লেইগা নানারকম প্ল্যান করতে আছে। এই রেকর্ড দেখাইলে পরে হয়তো সুযুগ সুবিধা মিলতে পারে।
লোকটা দূরদর্শী। ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিখুঁতভাবে এখানকার উদ্বাস্তুদের সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য লিখে রাখছে। হরনাথকে বেশ ভাল লাগল বিনুর।
হরনাথ খাতা এবং কলম খুলে একটা ফাঁকা পাতা বার করে এবার বলল, আপনের নাম, কইলকাতার ঠিকানা, বাবার নাম, দ্যাশ থিকা কবে আসছেন কইয়া যান
মুকুন্দপুর বাস্তুহারা কল্যাণ সমিতির অফিসে টেনে আনার উদ্দেশ্য এবার পরিষ্কার হয়ে যায়। যুগল হরনাথ এবং এখানকার অন্য সকলে আন্তরিকভাবেই চাইছে, সে তাদেরই একজন হয়ে যাক। আত্মসমর্পণ ছাড়া উপায় নেই। হরনাথের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যায় বিনু।
প্রশ্নোত্তর পালা শেষ হলে একটা ফাঁকা ঘরে হরনাথ লিখল, পুব দিকের জঙ্গল সাফ হইবার পর শ্রী বিনয়কুমার বসুকে সাত কাঠা জমি দেওয়া হইবে।
লেখালিখির পালা চুকলে খাতা বন্ধ করল হরনাথ। বলল, আপনের লাখান বিদ্বান মাইনষের নাম রেকর্ডে থাকলে গভর্নমেন্টের কাছে আমাগো জোর বাড়ব।
বিনু সামান্য হাসল।
৩.৩৬-৪০ খাওয়াদাওয়ার পালা
৩.৩৬
রান্নাবান্না শেষ হতে বেলা হেলে গেল। এবার খাওয়াদাওয়ার পালা।
সামনের বিশাল চত্বরটায় মুকুন্দপুরের পুরুষ আর বাচ্চাদের কাতার দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হল। মাটিতে বসে কলাপাতায় খাওয়ার ব্যবস্থা। একমাত্র বিনুর জন্যই পাখি কালকের সেই ফুলতোলা। আসনটা এনে দিয়েছে।
মেয়েরা নিপুণ হাতে পরিবেশন করছে। পুরুষদের খাওয়া শেষ হলে তারা খাবে।
পদ খুব বেশি নয়। মসুর ডাল, নানারকম আনাজ দিয়ে পাঁচমেশালি একটা তরকারি, কাতলা মাছের ঝোল এবং বোয়াল মাছের পাতুরি।
হই হই করে সবাই খাচ্ছে। সেই সঙ্গে নানা গল্প। ঠাট্টা। মজার মজার কথায় ভোজসভার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত হাসির লহর উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। আর শতমুখে শুধু বিনুর নাম। হেমকর্তার নাতি হেমকর্তার মনই পেয়েছে। পাঁচ শ’ হাত চওড়া একটা মন।
মাত্র এক শ’টা টাকা খরচ হয়েছে বিনুর। আর তাতেই মুকুন্দপুরবাসীদের মুখে প্রাণখোলা হাসি ফোঁটাতে পেরেছে। অম্লান, অফুরান হাসি।
চারপাশের হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলো দেখতে দেখতে বিচিত্র আবেগে বুকের ভেতরটা তোলপাড় হতে থাকে বিনুর।
