পুরুষরা অনেকেই বিল থেকে বালতি বালতি জল এনে রাখছে। রান্নার কাজে লাগবে। কেউ কেউ কোত্থেকে যেন নিয়ে আসছে গোছ গোছ কলাপাতা। বেশির ভাগই উদ্দেশ্যহীনের মতো এবারে ওধারে ঘোরাঘুরি করছে। নানা জায়গায় ছোট ছোট জটলা। তারা জোর আড্ডা জমিয়েছে।
এখানকার যত কাচ্চাবাচ্চা, সব পুরো চত্বর তোলপাড় করে বেড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গে জুটেছে একপাল কুকুর। সেগুলোও বাচ্চাদের পেছন পেছন ছুটছে।
সমস্ত এলাকা জুড়ে উৎসব উৎসব ব্যাপার। কে বলবে, কাল হানাদারেরা যখন নতুন বসতিতে আগুন ধরিয়ে এখানকার মানুষজনকে উৎখাত করতে আসে, আতঙ্কে উত্তেজনায় সব থমথম করছিল। পুরুষেরা অবশ্য জমি-মালিকের ভাড়াটে বাহিনীর সঙ্গে লড়ার জন্য ছুটে গিয়েছিল। মেয়েরাও বেরিয়ে পড়েছিল।
রাতারাতি অলৌকিক কোনও ভোজবাজিতে সব কিছু পালটে গেছে।
যেখানে বড় বড় মাছগুলো ফেলে রাখা হয়েছে, বিনুকে নিয়ে প্রথমে সেখানে চলে এল যুগল। দ্যাখেন ছুটোবাবু, মাছ দ্যাখেন। একেকটার ওজন আট দশ স্যারের (সেরের) কম হইব না। অ্যামন। মাছ আপনে বডারের এই পারে আর কুনোখানে পাইবেন না।
যুগলের উচ্ছ্বাস দেখে সামান্য হাসে বিনু। কিছু বলে না। তার চোখে পড়ল, মাছ কাটুনিদের মধ্যে পতিতপাবন আর হরিন্দর বউরাও রয়েছে। একটা রাত পেরুতে না-পেরুতেই তারা এখানকার মানুষজনের সঙ্গে মিশে গেছে। খুব ভাল লাগল বিনুর।
মাছ দেখানো হলে যুগল বলল, চলেন, এইবার অন্যখানে যাই–
ওরা বিলের দিকে হাঁটতে শুরু করে। এর মধ্যে অনেকেই তাদের সঙ্গ নিয়েছে। সবার মুখেই এক কথা।
দ্যাশভাগের পর এমুন আনন্দ আর কুনোদিন পাই নাই। হগলই হ্যাঁমার নাতির লেইগা–
চারপাশের মেয়েরা কেউ অবশ্য কিছু বলছিল না। শুধু লাজুক মুখে হাসছিল। তাদের চোখে অপার খুশির ঝলক।
বিলের পাড় ধরে পুব দিকে, বসতির শেষ মাথায় চলে আসে বিনুরা।
এরপর একদিকে বিল, বিলের ধার ঘেঁষে উদ্দাম কচুবন। পানিকচু, শোলাকচু, খারকন। তা ছাড়া আছে প্রায় মাইলখানেক জুড়ে বেতঝোপ। কালো কালো মুত্রাবন। চাপ-বাঁধা হোগলা বন। তারপর থেকে নিবিড় জঙ্গল। কত রকমের যে গাছ! নিম নিশিন্দা বট অর্জুন শিশু পাকুড় পিটক্ষিরা ডেউয়া বুনো কলা–এমনি অজস্র। গাছগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে রয়েছে হাজার ধরনের লতা। অনেকগুলো গাছের ডালপালা থেকে নোলকের মতো ঝুলছে বুনো ধুদুল আর লাল টুকটুকে তেলাকুচ।
জঙ্গলের ভেতরটা অন্ধকার। গাছপালা ঝোপঝাড় এত ঘন যে রোদ ঢোকে না। সেখান থেকে কত রকমের আওয়াজ যে ভেসে আসছে! ঝিঁঝির ডাক। তক্ষকের ডাক। ঘুঘুর ডাক। ডাহুকের কর্কশ। চিৎকার। অগুনতি পাখির ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে সরীসৃপদের বুক টেনে চলার শব্দ, নাম না-জানা জন্তুদের ছুটে যাওয়ার শব্দ–সব মিলিয়ে বনভূমি জুড়ে বিচিত্র পাঁচমেশালি ধ্বনি। হঠাৎ মামুদপুরের কথা মনে পড়ে গেল বিনুর। ঘাতক বাহিনীর ভয়ে নদীর ধারে জঙ্গলের ভেতর তাদের রাত কাটাতে হয়েছিল। সেখানেও অবিকল এই ধরনের সব শব্দ তার কানে এসেছে।
যুগল কচুর ঝাড়গুলো দেখিয়ে বলল, কত কিসিমের কচু দেখছেন ছুটোবাবু! মুকুন্দপুরের মাইনষে এক বচ্ছর খাইয়াও শ্যাষ করতে পারব না।
বিনুর মনে পড়ল, কাল রাত্তিরে মাছের মাথা দিয়ে কচুর ঘণ্ট বেঁধেছিল পাখি। নিশ্চয়ই এই বিলের পাড়ের কচু। সে একটু হাসল। আর তখনই চোখে পড়ল, কচুবন আর বেতঝোপের গা ঘেঁষে কত যে গর্ত তার লেখাজোখা নেই।
বিনু জিজ্ঞেস করল, ওগুলো কিসের গর্ত?
ইন্দুরের। তয় থাকে সাপেরা।
বুঝলাম না।
যুগল বুঝিয়ে দিল। ইঁদুরের খোঁজে সাপ গর্তে ঢুকে তাদের খেয়ে নিজেরা সেখানে আস্তানা গাড়ে।
ভয়ে ভয়ে গর্তগুলো দেখতে থাকে বিনু।
যুগল এবার জঙ্গলের দিকে আঙুল বাড়ায়, এই যে বনখান দেখতে আছেন, এইটা মাইল তিনেক জাগা জুইড়া। বছর দুইয়ের মইদ্যে এইর এট্টা গাছও আর থাকব না। বেবাক সাফ হইয়া যাইব।
কেন?
যুগল জানায়, কাল পতিতপাবন আর হরিরা এসেছে। পরে শিয়ালদা স্টেশন এবং রিফিউজি ক্যাম্পগুলো ঘুরে ঘুরে সে রাজদিয়া অঞ্চলের আরও অনেককে খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসবে। এত মানুষের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে না? সে জন্য জমি চাই। প্রচুর জমি। জঙ্গল নির্মূল না করলে সেই জমি। কোথায় পাওয়া যাবে? গাছপালা কেটে, সাপখোপ মেরে, হিংস্র বুনো জন্তু তাড়িয়ে মুকুন্দপুরের সীমানা অবিরাম প্রসারিত করে যেতে হবে। গড়ে তুলতে হবে অসংখ্য বাসস্থান। ছিন্নমূল মানুষের জন্য এই আদিম, বিজন বনভূমিতে পরিপূর্ণ এক বসুন্ধরা।
এই জবরদখল বসতি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলার কথা বলতে বলতে হঠাৎ কী ভেবে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে যুগল, ছুটোবাবু, আমার একখান কথা রাখতেই হইব।
বিনু জিজ্ঞেস করে, কী কথা?
জঙ্গল সাফ করনের পর যে জমিন বাইর হইব, হেইর থিকা আপনেরে কয়েক কাঠা লইতে হইব।
অন্য যারা বিনুদের সঙ্গে জঙ্গলের এই প্রান্তে চলে এসেছে, এতক্ষণ তারা চুপচাপ ছিল। তাদের ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে, না কইরেন না বিনুবাবু–
মুখটা ডান পাশে ফেরাতেই বিনুর চোখে পড়ল, ভিড়ের ভেতর হরনাথ কুণ্ডু। কাল রাতে যুগলদের ঘরে এসে আলাপ করে গিয়েছিল, তারপর এখন তাকে ফের দেখা গেল।
বাকি সবাই যুগল এবং হরনাথের কথায় সায় দেয়। বিনুকে জমি নিতেই হবে।
