যুগল বলল, আর ওসে খাড়ইয়া থাইকেন না। ভিতরে চলেন। দুজনে বিনুর ঘরে আসে। যুগল বলে, নিজের চৌখে দেখলেন তো, আমরা ক্যামন কইরা বাইচা আছি।
বিনু বিছানায় বসতে বসতে বলে, কাল রাতে এখানকার সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল। জমিদারের গুণ্ডারা যে এসেছে, টের পেলে কী করে?
আপনেরে কইছিলাম না, পালা কইরা রাইত জাইগা আমরা নজর রাখি। কাইল যাগো পালা আছিল হেরা শুয়োরের পুতেগো দেইখা কালী মাঈকি জয়’ ধ্বনি দিয়া বেবাকেরে সজাগ কইরা দিছে। হেরপর মা কালীর নাম লইয়া লাঠি সড়কিহাতে আমরা চাইর দিক থিকা বাইর হইয়া পড়লাম।
বিনুর মনে পড়ে গেল, গত বেস্পতিবার সুধাদের বাড়িতে যুগল এই ধরনের নজরদারির কথা বলেছিল বটে।
যুগল বলল, আপনে আসছেন। আর শালারা আইজই আতশা (আচমকা) আগুন ধরাইতে আসল। আপনের কাঁচা ঘুমটা ভাইঙ্গা গ্যাছে। আর জাইগা থাকবেন না। শরীল খারাপ হইব। দুয়ার বন্ধ কইরা শোন–
যুগল চলে যাবার পর দরজায় খিল আটকে ফের শুয়ে পড়ে বিনু।
.
৩.৩৫
ঘুম ভাঙতে আজ অনেক বেলা হয়ে গেল। দূর থেকে পাখপাখালির অবিরল কিচিরমিচির ভেসে আসছিল। মানুষজনের গলাও শোনা যাচ্ছে।
চোখ মেলে বিনু দেখতে পেল, কাঁচা বাঁশের বেড়ার ফাঁক দিয়ে সোনালি ফিতের মতো রোদের অজস্র ফালি ঘরের ভেতর এসে পড়েছে।
ধড়মড় করে উঠে বসল সে। কটা হাই তুলে বিছানা থেকে দ্রুত নেমে দরজা খুলল। বাইরের উঠোনে যুগলরা তো রয়েছেই, মুকুন্দপুরের আরও ক’জন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। দূরের চত্বরে প্রচুর লোকজন চোখে পড়ছে।
চকিতে বিনুর মনে পড়ে গেল, আজ এখানকার কেউ কাজে বেরুবে না। সে তাদের খাওয়াবে। যাবতীয় খরচ তার। কালই টাকাটা দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। খেয়াল ছিল না।
বিব্রত বিনু ডাকতে লাগল, যুগল–যুগল—
যুগল দৌড়ে এল, ঘুম ভাঙল দুটোবাবু?
এত বেলা হয়েছে। আমাকে ডাকো নি কেন?
কাইল রাইতে অ্যামন তাফাল গেল। ঘুমাইছেন দেরিতে। হেইর লেইগা আর জাগাই নাই।
এস, টাকা নিয়ে যাও। এতগুলো লোক খাবে। জিনিসপত্র কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। কখন কী করবে?
ঘরের ভেতর চলে এসেছিল দু’জনে। যুগল হেসে বলল, চিন্তা কইরেন না ছুটোবাবু। মাছের বন্দবস্ত হইয়া গ্যাছে। কাইল রাইতে কইয়া রাখছিলাম, আইজ ভোরে উইঠা বারইগো পানবল্লভ (প্রাণবল্লভ), আমার বইনের জামাই ধনঞ্জয়, অ্যামন চাইর পাঁচ জনে জাল নিয়া বিলে নামছিল। চাইরটা আলিসান কাতল আর ছয়টা বোয়াল মারছে। সে আরও জানায়, এদিকের তোড়জোড় পুরোদমে চলছে। বিনুর টাকাটা পাওয়া গেলেই কয়েকজনকে আগরপাড়ার বাজারে পাঠানো হবে। তারা চাল ডাল আনাজ তেল মশলাপাতি কিনে আনবে। কতক্ষণ আর লাগবে? বড় জোর আড়াই তিন ঘন্টা।
এ ঘরের বিলের দিকের জানালাটা কাল রাতে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। সেটার পাশে দুটো আংটায় বিনুর কাপড়ের ঝোলা এবং জামা ঝোলানো রয়েছে। জামার পকেটে আছে তার মানি ব্যাগ।
বিনু জামাটা আনতে যাচ্ছিল, হঠাৎ তার হাতটা ধরে টেনে রাখে যুগল। ত্রস্ত সুরে চেঁচিয়ে ওঠে, যাইয়েন না, যাইয়েন না। উই দ্যাখেন– বলে আঙুল বাড়িয়ে দেয় সে।
আংটার পাশে যে দড়ি দিয়ে মশারিটা বিলের দিকের বেড়ার গায়ে বাঁধা রয়েছে সেটা পেঁচিয়ে রয়েছে গায়ে হলুদ হলুদ রেখা-ওলা কালো রঙের একটা সাপ। বিনু চমকে ওঠে।
যুগল বলে, আপনেরে কইছিলাম না, শালার পুতেরা রাইতের আন্ধারে ঘরে হান্দে (ঢোকে)। বলে টস্ত্র যে কোণটায় থাকে সেখান থেকে একটা লাঠি এনে দড়িতে জোরে জোরে ক’টা ঝাঁকি মারল। সাপটা মাটিতে পড়ে প্রচণ্ড আক্রোশে লেজে ভর দিয়ে, বিশাল ফণা তুলে দাঁড়িয়ে পড়ে। ছোবল মারার জন্য অল্প অল্প ফণাটা দুলছে। সেটার চোখদুটো চুনির মতো জ্বলছে।
যুগল সাপটাকে এতটুকু সুযোগ দিল না। বিদ্যুৎগতিতে লাঠির এক বাড়িতে প্রথমে ওটার কোমর ভেঙে ফেলল। তারপর ঘায়ের পর ঘা। সাপের ইহলীলা লহমায় শেষ।
বিলের দিকের জানালা খুলে, মরা সাপটাকে লাঠির ডগায় তুলে বাইরে ফেলে দিতে দিতে বলল, ঘরে য্যামন হান্দছিলি (ঢুকেছিলি), তরে নিপাত করলাম। লাঠিটা জায়গামতো রেখে এসে বলে, পাখি উঠানে আপনের মুখ থোওনের লেইগা বালতিতে জল আইনা রাখছে। মুখ ধুইয়া চা চু খাইয়া লন। কাইল আমাগো এই জাগাখান দেখাইতে পারি নাই। আইজ ঘুরাইয়া দেখামু।
অবাক বিস্ময়ে যুগলের কাণ্ডকারখানা দেখছিল বিনু। এমন একটা বিষধর সাপ মারার পরও পুরোপুরি নির্বিকার। এ সব যেন তার কাছে জলভাত। অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে মানিব্যাগ বার করে যুগলকে টাকা দিল সে।
যুগল চলে গেল।
মুখটুখ ধুয়ে এসে বাসি জামাকাপড় ছেড়ে পাজামা পাঞ্জাবি পরে নিল বিনু। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পাখি চা আর বেতের সাজিতে সকালের খাবার নিয়ে এল। চিঁড়েভাজা, নারকেল কোরা আর এখো
খাওয়া যখন শেষ, যুগল আবার ফিরে এসে তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
উঠোন পেরিয়ে বিশাল চত্বরটায় এসে বিনুর চোখে পড়ল, সারা মুকুন্দপুর ওখানে ভেঙে পড়েছে। চারদিকে তুমুল ব্যস্ততা। পৌনে দু শ’র মতো মানুষ খাবে, তারই তোড়জোড় চলছে। বয়স্ক ক’জন মেয়েমানুষ চত্বরের এক কিনারে গর্ত খুঁড়ে, ইট পেতে বিরাট বিরাট আখা বানাচ্ছে। সেগুলোর পাশে স্থূপাকার শুকনো লকড়ি। লকড়িগুলো জ্বালিয়ে রান্নাবান্না হবে। আরেক দিকে অন্য একটা দল বড় বড় বঁটি পেতে বসেছে। তাদের সামনে বিশাল বিশাল পাহাড়প্রমাণ কাতলা আর বোয়াল কাতার দিয়ে শোয়ানো রয়েছে। ভোজের জন্য এগুলোই ভোরবেলা বিল থেকে ধরা হয়েছে। এবার তাদের কাটা হবে।
