বিনু শিউরে ওঠে, এর ভেতর তোমরা আছ কী করে?
যুগল ভরসা দেবার সুরে বলে, এইর মইদ্যেই থাকতে হইব। আমাগো দ্যাশে সাপ আছিল না? যেইখানেই খাল বিল নদী জঙ্গল, হেইখানেই সাপ। তয় (তবে রোজ কিন্তুক ঘরে সাপ হান্দে (ঢোকে) না। কুনো কুনো দিন আইসা পড়ে।
তোমরা বেড়ার ওই ফঁকগুলো বুজিয়ে দিতে পার না?
দেই তো। কিন্তুক ইন্দুরে কাইটা দেয়। আবার বুজাই, আবার কাটে। উই ফুটাগুলা সাপের যাওন আহনের পথ। দুই চাইর দিনের ভিতরে উইগুলা ফির বুজাইয়া ফালামু–
বিনু আতঙ্কগ্রস্ত হলে কী হবে, যুগলের কিন্তু ঘরে সাপের আনাগোনা নিয়ে কোনও রকম দুশ্চিন্তাই নেই। একেবারে নির্বিকার। রাতে জমি-মালিকের সশস্ত্র বাহিনী উৎখাত করার জন্য আচমকা আচমকা হানা দেয়। চারপাশের জলায় জঙ্গলে সাপের ছড়াছড়ি। এমন এক ভয়ঙ্কর পরিবেশের সঙ্গে কী আশ্চর্য ভাবেই না ওরা মানিয়ে নিয়েছে। সব কিছুই যেন শ্বাসবায়ুর মতো সহজ আর স্বাভাবিক।
যুগল চলে যাবার পর দরজায় খিল দিয়ে শুয়ে পড়ল বিনু। নিমেষে নিবিড় ঘুমে তার চারপাশের পৃথিবীকে লুপ্ত হয়ে গেল।
.
৩.৩৪
কালী মাঈকি—
জয়।
কালী মাঈকি—
জয়।
হঠাৎ তুমুল শেরগোলে ঘুম ভেঙে গেল বিনুর। সঙ্গে সঙ্গে দরজায় অনবরত ধাক্কা, কপাট খোলেন ছুটোবাবু। তরাতরি–তরাতরি–
যুগলের গলা। ঘুমচোখে প্রথমটা বিনু খেয়াল করতে পারল না, কোথায় আছে। পরক্ষণে সমস্ত মনে পড়ে গেল। যুগলের ডাকাডাকির মধ্যে এমন তীব্র ব্যগ্রতা রয়েছে যে বিনু চকিত হয়ে ওঠে। মশারি তুলে লাফ দিয়ে নিচে নেমে দরজা খুলে দেয়।
যুগল ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকে কোনা থেকে একটা লাঠি আর টেটা নিয়ে মুহূর্তে বেরিয়ে যায়।
পেছন থেকে বিনু জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে যুগল? কী হয়েছে?
দূর থেকে যুগলের গলা ভেসে আসে, পুঙ্গির পুতেরা আগুন লাগাইতে আইছে। আইজ হালাগো যমের দক্ষিণ দুয়ার দেখাইয়া ছাড়ুম। আপনে ঘর থিকা বাইর হইবেন না ছুটোবাবু
যমের দক্ষিণ দুয়ারের শাসানিটা আগে আরও একবার কি দিয়েছিল যুগল? মনে পড়ল না। বিনু পলকে আন্দাজ করে নেয়, জমি-মালিকের ঘাতকবাহিনী নির্ঘাত হানা দিয়েছে। শিরদাঁড়ার ভেতর দিয়ে শিহরন খেলে যায় তার।
ঘর থেকে বেরুতে বারণ করেছে যুগল। কিন্তু প্রবল উত্তেজনা বিনুকে এক ধাক্কায় বাইরে টেনে নিয়ে আসে।
গোটা মুকুন্দপুর জুড়ে প্রতিটি কোনা থেকে একই ধ্বনি উঠছে, কালী মাঈকি জয়, কালী মাঈকি জয়। আওয়াজটা হেমন্তের কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ চিরে চিরে দিগদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ছে। পুরুষমানুষরা। কেউ ঘরে নেই। সকলের হাতেই মারণাস্ত্র। লাঠি, বল্লম, ল্যাজা। অনেকের হাতে মশাল। গলার শিরা ছিঁড়ে চিৎকার করতে করতে তারা মুকুন্দপুরের শেষ মাথায় কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মশালের আলো তাদের ক্রুদ্ধ, হিংস্র, উত্তেজিত মুখগুলোর ওপর ঝলকে যাচ্ছে।
অনেকটা দূরে, পশ্চিম দিকে ধানখেত যেখানে শুরু, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটা দল। তাদের হাতেও রকমারি অস্ত্র এবং মশাল। তবে ওরা পনের বিশ জনের বেশি হবে না। মুকুন্দপুরের বিশাল প্রতিরোধ বাহিনী দেখে তারা এগুতে ভরসা পাচ্ছে না। দু’পক্ষই নিজের নিজের জায়গায় অনড় দাঁড়িয়ে একটানা অকথ্য খিস্তিখেউড় করে চলেছে। এ যেন এক আদিম রণভূমি।
হুমন্দির পুতেরা, এক কাইক যদিন আউগাস (এগোস), মায়ের প্যাটে ফির হান্দাইয়া দিমু
ও পক্ষও নীরব নেই। ওরা কী জবাব দিচ্ছে, এতদূর থেকে বোঝা যায় না। তবে সেগুলো নিশ্চয়ই শাস্ত্রবাক্য নয়।
বড় চত্বরে সব ঘর থেকে বৌ ঝি বুড়োবুড়ি এবং বাচ্চাকাচ্চারা বেরিয়ে এসেছিল। তারা উদভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি করছে। কেউ কেউ সমানে কাঁদছে।
হতবুদ্ধি বিনু পলকহীন তাকিয়ে থাকে। কী করবে, ভেবে পায় না। হঠাৎ তার চোখে পড়ে, যুগলদের উঠোনের এক কোণে দুই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে পাখি। জড়সড়, সন্ত্রস্ত।
পাখিও বিনুকে দেখতে পেয়েছিল। কাঁপা গলায় বলল, আপনে বাইর হইছেন ক্যান? কাত্তিক গণশার বাপে আমারে নজর রাখতে কইয়া গ্যাছে। আপনে য্যান, ঘরের ভিতরে থাকেন। যে কুনো সোময় খুনাখুনি বাইধা যাইতে পারে।
বিনু বলল, আমার জন্যে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। ছেলেদের নিয়ে ঘরে যাও।
বিনুর কণ্ঠস্বরে হুকুমের মতো কিছু ছিল, পাখির আর কিছু বলতে সাহস হয় না। নিঃশব্দে দুই ছেলের হাত ধরে তাদের ঘরে চলে যায়। বিনু উঠোনেই দাঁড়িয়ে থাকে।
ওদিকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দু’পক্ষের মধ্যে বাংলা ভাষার বাছা বাছা কিছু গালাগালির আদান প্রদান চলে। যে শব্দপুঞ্জের সৃষ্টি হয় তা হেমন্তের বাতাসকে বিষিয়ে তোলে। তবে নৈশ যুদ্ধটা শেষ পর্যন্ত হতে হতেও হয় না। বেগতিক বুঝে হানাদারেরা ধানখেত পেরিয়ে উধাও হয়ে যায়।
মুকুন্দপুরের পদাতিক বাহিনী ফিরে এসে মশাল নিবিয়ে যে যার ঘরে চলে যায়। বিশাল চত্বরটা ফাঁকা হয়ে গেছে। বুড়োবুড়ি, অল্প বয়সের ছেলেমেয়ে, বউ-ঝি, এখন আর কেউ নেই।
উঠোনেই দাঁড়িয়ে ছিল বিনু। যুগল ফিরে এল, আমি জানতাম, চিল্লামিল্লি শুইনা ছুটোবাবু কিছুতেই ঘরে বইয়া থাকব না। পাখি আপনেরে বাইর হইতে না করে নাই? আমি যে অরে অত কইরা কইয়া গ্যালাম।
বিনু জানায়, অবশ্যই পাখি তাকে ঘরে থাকতে বলেছিল। সে তার বারণ শোনে নি। হইচই শুনে ওরাও বেরিয়ে পড়েছিল। বিনুই বরং ওদের জোর করে ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে।
