বিনু বলল, ভাত ডাল মাছ যা দিয়েছ, অর্ধেক তুলে নাও–
পাখি যুগলের দিকে তাকায়। যুগল চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, না না, কিছুতেই না। ওইটুক না খাইলে আমাগো শান্তি হইব না–
বিনু একরকম জোর করেই বেশ খানিকটা ভাত মাছ টাছ তুলিয়ে ছাড়ল। তারপর খেতে শুরু করল।
খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্প। এলোমেলো, অসংলগ্ন। হেমনাথের বাড়িতে পালাপার্বণে কী ধরনের ভোজ হত, সীমান্তের এপারে জিনিসপত্র এমনই অগ্নিমূল্য যে কোনও কিছুতে হাত ঠেকানো যায় ন্স, ইত্যাদি ইত্যাদি। এরই ফাঁকে বহুকাল আগে সুজনগঞ্জের হাটে যাওয়ার পথে অথৈ জল সাঁতরে বিনুদের নৌকোয় পাখির উঠে আসার কথাও উঠল।
বিনু খেতে খেতে লক্ষ করল, লজ্জায় পাখির মুখ প্রায় মাটিতে গিয়ে ঠেকেছে। হেরিকেনের উজ্জ্বল আলোর ছটা পড়েছে তার মুখটায়। সেদিনের জলপরীর মতো আজও তাকে অলৌকিক মনে হচ্ছে।
একসময় বিনু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, তোমাদের মুকুন্দপুরে সব মিলিয়ে কত জন আছে?
বিনু বলল, ক্যান কন তো?
বলোই না—
মনে মনে হিসেব কষে যুগল বলল, পোলাপান মিলাইয়া তা একশ’ ষাইট সত্তর হইব।
বিনু জানালো, তার খুব ইচ্ছা কাল দুপুরে একসঙ্গে মুকুন্দপুরবাসীদের পাশাপাশি বসে খাবে। কারোর বাড়িতে আলাদা করে রান্না হবে না। এখানকার মেয়েরা সবাই মিলে রান্নাবান্না করবে। সমস্ত খরচ বিনুর।
কিছুক্ষণ হতবাক তাকিয়ে থাকে যুগল। তারপর বলে, অ্যাত মাইনষেরে খাওয়াইবেন ক্যান?
বিনু বলে, অনেকদিন বাদে দেশের লোকজনের সঙ্গে দেখা হল। একসঙ্গে একটু আনন্দ করব। এই আর কি।
মেলা ট্যাকা খরচ হইব ছুটোবাবু—
কত আর? একশ’ টাকায় হবে না?
যুগল বলল, মাছ তো আর কিনন (কেনা) লাগব না। বিল থিকা ধইরা লইলেই হইব। কিননের মইদ্যে চাউল ডাইল আর আনাজপাতি। একশ’ ট্যাকায় ভাইসা যাইব। আপনে খাইতে থাকেন। আমি অহনই বেবাকরে জানাইয়া আসি। তার আর তর সইছিল না। খুশিতে, উত্তেজনায় ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটতে ছুটতে বাইরের অন্ধকারে এবং কুয়াশায় মিলিয়ে গেল সে।
বেশ কিছুক্ষণ পর যুগল যখন ফিরে এল, বিনু আর কার্তিক গণেশের খাওয়া হয়ে গেছে। বাইরের উঠোনে আঁচিয়ে এসে বিনু বিছানায় বসে ছিল। পাখি এঁটো বাসনকোসন তুলে নিয়ে মাটির মেঝে পরিপাটি করে নিকিয়ে দিয়ে গেছে। একধারে সেই হেরিকেনটা জ্বলছে।
ঘরে বিনু ছাড়া এখন আর কেউ নেই। কাকি গণেশ পাখির সঙ্গে চলে গেছে পাশের ঘরে।
যুগলকে দেখে একটু হেসে বিনু বলে, খবর দেওয়া হল?
যুগলের চোখেমুখে আনন্দ আর উত্তেজনার রেশ এখনও থেকেই গেছে। সে বলে, হ, দিয়া আসলাম। এইখানকার মানুষজন কত যে খুশি হইছে, বুঝাইয়া কইতে পারুম না। হেরা কী কয় জানেন দুটোবাবু?
কী?
হামকায় রাইজদায় তেনার বাড়ি যে যাইত হেরে (তাকে) ঠাইসা খাওয়াইত। না খাইলে ছাড়ন ছুড়ন নাই। তেনার নাতি দাদুর ম্যাজাজখান পুরা পাইছে।
বিনু হাসতে লাগল।
যুগল একটু গম্ভীর হয়ে এবার বলল, তয় একখান কথা—
বিনু তার মুখের দিকে তাকায়। যুগলের বলার ভঙ্গিটা এবার কানে সামান্য বেসুরো লাগে। সে জিজ্ঞেস করে, কী কথা?
আমাগো এইখানে দুই ঘর বামন আছে। তেনারা আর হগলের লগে বইসা খাইতে চায় না। ভাবতে আছি, চাউল ডাইল মাছ তাগো ঘরে পাঠাইয়া দিমু। নিজেগোরটা (নিজেদেরটা) নিজেরা রাইন্ধা খাউক। যুগল বলতে লাগল, দ্যাশ থিকা শিয়ালদা ইস্টিশানে পইড়া আছিল বচ্ছরখানেক। লঙ্গরখানায় কুন জাইতের (জাতের) না কুন জাইতের রান্ধা খিচোড়ি খাইছে। মুকুন্দপুরে আইসা হেগো (তাদের) মাথায় জাইত চাড়া দিয়ে উঠছে।
যুগলের স্বরে ক্ষোভ, ধিক্কার এবং চাপা ক্রোধও। বিনু উত্তর দিল না। দেশভাগের পর লক্ষ লক্ষ মানুষ সর্বস্ব খুইয়ে কে কোথায় ছিটকে পড়ল, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড উথলপাথল, কোনও কিছুই আর আগের জায়গায় নেই। তবু মুকুন্দপুরের দু’ঘর বামুন সুযোগ পাওয়ামাত্র জাতপাতের সেই পুরনো গোঁড়ামিতে ফিরে গেছে। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল বিনুর।
একটু নীরবতা।
তারপর যুগল বলল, ঘুম নি পাইছে ছুটোবাবু? তমস্ত দিন কম তাফাল তো যায় নাই।
সত্যিই ঘুম পাচ্ছিল। সেই দুপুর থেকে নানা জায়গায় ছোটাছুটির পর গা এখন ছেড়ে দিয়েছে।
দু’চোখ জড়িয়ে আসছে। আস্তে মাথা নাড়ল বিনু, হ্যাঁ।
যুগল ব্যস্তভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে পাখিকে ডেকে নিয়ে এল। বিনুর বিছানায় মশারি খাঁটিয়ে তোষকের চারধারে নিখুঁত করে গুঁজে দিয়ে বলল, ঘরে হেরিকেন বাত্তি রইল। আপনে দরজায় খিল দিয়া শুইয়া পড়েন। বেরিয়ে যেতে যেতে বলল, একখান কথা কই ছুটোবাবু
উৎসুক চোখে তাকাল বিনু।
যুগল বলে, রাইতে বাইরে যাওনের দরকার হইলে আখা (হঠাৎ) বিছনা থিকা লাইমা পইড়েন না। হেরিকেন বাত্তি তো আঙ্গাইনা (জ্বালানো) থাকব। দেইখা শুইনা নিচে পা-ও রাখবেন। আমরা পাশের ঘরে থাকুম। আমাগো বরম (বরং) ডাইকেন–
বিনু অবাক। বলে, কেন বল তো?
ঘরের চারদিকের কাঁচা বাঁশের বেড়াগুলোর দিকে আঙুল বাড়িয়ে যুগল বলে, ভালা কইরা দ্যাখেন–
বিনু লক্ষ করল, বেড়াগুলো সব জায়গায় মেঝের মাটিতে গাঁথা নেই। কোথাও কোথাও চার পাঁচ আঙুল ফাঁক রয়েছে।
যুগল বলতে লাগল, ফাঁকগুলা দেখছেন তো? ওইর ভিতর দিয়ে রাইতে সাপ হান্দে (ঢোকে)। বিলান (বিল অঞ্চলের) জাগা। চাইর দিকে মেলা সাপ–
