হরিদাস সাহার কথা মনে পড়ল বিনুর। নয়া চিকন্দি গ্রামে ছিল তাদের বাড়ি। ওদের প্রথম দেখে তারপাশার স্টিমারঘাটে। সেখানে হরিদাস সাহার স্ত্রী মুখে কাপড় গুঁজে অঝোরে কেঁদে যাচ্ছিল। সে কি বুকফাটা, আর্ত কান্নার আওয়াজ! কারণটাও জেনেছিল বিনু। ওদের যুবতী মেয়েকেও হানাদারেরা তুলে নিয়ে গেছে।
যুগল বলছিল, আমাগো এই মুকুন্দপুরে আরও কয় ঘর আছে। পাকিস্থানে হেরাও মাইয়া খুয়াইয়া আসছে। হেরা কান্দে না ছুটোবাবু, শোকে একেবারে পাথর হইয়া গ্যাছে।
বুকের ভেতর শ্বাসকষ্টের মতো একটা যাতনা অনুভব করছিল বিনু।
যুগল থামে নি, এইখানে পাঁচ সাত জন যুবুতী মাইয়া মা-বাপের লগে আইছে। পাকিস্থানে তাগো ইজ্জৎ নাশ হইয়া গ্যাছে। পেরথম পেরথম ঘর থিকা বাইর হইত না। আমরাই বুঝাইয়া সুঝাইয়া বাইরে টাইনা আনছি। কইছি, বইনেরা যা হইছে তার লেইগা তোমাগো তো কুনো দুষ নাই। উই হগল লইয়া আর মাথা ঘামাইও না। সুমখে জীবন পইড়া আছে। বাচতে তো হইব ভালা কইরা। হগলের লগে মিলো মিশো (মেলামেশা কর), আনন্দ কর। দেখবা বেবাক ঠিক হইয়া যাইব।
বিদ্যুৎচমকের মতো ঝিনুকের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অসীম উদারতায় মুকুন্দপুরের লাঞ্ছিত মেয়েগুলোকে যুগলেরা কাছে টেনে নিয়েছে। হেমনলিনীরা কি যুগলদের মতো মহানুভব হতে পারতেন না? তা হলে ঝিনুককে নিয়ে তার কি কোনও সমস্যা থাকত?
হঠাৎ খেয়াল হল, কয়েক দিনের মধ্যে তীর্থ সেরে অবনীমোহন কলকাতায় ফিরবেন। ঝিনুককে দেখলে তিনি কী বলবেন, তার কী প্রতিক্রিয়া হবে? নতুন করে ভাবতে গিয়ে বুকের ভেতরটা কেঁপে যায় বিনুর।
.
৩.৩৩
রাত একটু বাড়লে একে একে অনেকে এসে দেখা করে গেল। এরা সকালে চান সেরে, নাকেমুখে গুঁজে ফেরি কি দোকানদারি করতে বেরিয়েছিল। এইমাত্র ফিরেছে। বিনু যখন পড়ন্ত বেলায় যুগলের সঙ্গে আসে, ওরা কেউ মুকুন্দপুরে ছিল না।
হেমকর্তার নাতিকে দেখে সবাই ভীষণ খুশি। বিনু যে সত্যিসত্যিই মুকুন্দপুরে আসবে, এ ছিল তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ আশাতীত। সকলেই জানালো, কালকের দিনটা কেউ আর বেরুবে না। বিনুর সঙ্গে কাটিয়ে দেবে।
সবার শেষে এল হরনাথ। চল্লিশের ওপরে বয়স। রোগা, পাতলা চেহারা। লম্বাটে মুখ। চুল উঠে উঠে কপালটা মাঠ হয়ে গেছে। পরনে ধুতি আর হাতা-গুটনো, শ্যাওলা রঙের ফুলশার্ট।
রাজদিয়া থেকে সাত আট মাইল পুবে হাজিপুরে ছিল হরনাথদের বাড়ি। কিন্তু দেশে থাকতে তার সঙ্গে কখনও দেখা হয় নি বিনুর। কিংবা দেখা হলেও মনে নেই।
হরনাথ বলল, মুকুন্দপুরের বেবাক মাইনষের মুখে আপনের কথা এত শুনছি যে দ্যাখনের বড় ইচ্ছা আছিল। আইজ আপিসে আর্জেন্ট কাম আছিল, তাই যাইতে হইছে। কাইল ছুটি নিছি। সে জানায়, এই নয়া বসতের বাসিন্দাদের মতো তারও ইচ্ছা, কালকের দিনটা বিনুর সঙ্গে কাটিয়ে দেয়।
কিছুক্ষণ গল্প করে হরনাথ চলে গেল।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গণেশ এসে হাজির। যুগলকে বলল, মায়ের রান্ধন হইয়া গ্যাছে। জিগাইল বাবুগো পোলায় কি অহন খাইব?
।হঠাৎ যেন খেয়াল হল যুগলের। সেই দুপুরের আগে আগে সুধাদের বাড়ি থেকে খেয়ে বেরিয়েছে বিনু। শিয়ালদা স্টেশনে রাজদিয়া অঞ্চলের মানুষজনের খোঁজ করা, পতিতপাবনদের নিয়ে। আগরপাড়ায় এসে তিন সাড়ে তিন মাইল হেঁটে মুকুন্দপুরে আসা, ধকল তো কম যায় নি। এখানে এসে দু’খানা বিস্কুট আর এক কাপ চা ছাড়া পেটে কিছুই পড়ে নি। নিশ্চয়ই বিনুর খুব খিদে পেয়েছে।
শশব্যস্ত যুগল বলে, হ হ, অহনই খাইব। তর মায়েরে এই ঘরেই খাওনের বন্দবস্ত করতে ক।
লহমায় সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। চটের ওপর সুতোর নকশা করা মস্ত আসন পেতে, ঝকঝকে ভরনের গেলাসে জল এনে রাখল পাখি। তারপর কাঁসার থালায় ভাত এবং ছোট বড় বাটিতে বোঝাই করে খাদ্যবস্তু আসতে লাগল।
যুগল কৃতার্থ ভঙ্গিতে বলল, আপনে যে কুনোদিন আমাগো বাড়ি দু’গা ভাত খাইবেন, হপনেও (স্বপ্নেও ভাবি নাই। কী যে সুভাগ্যি! তার গলা আবেগে বুজে এল।
বিনু বিব্রত মুখে বলে, এই সব বলে আমাকে লজ্জা দিও না যুগল।
যুগল বলল, ঠিক আছে, কমু না। খাইতে বসেন ছুটোবাবু—
বিনু লক্ষ করেছে, শুধু একখানা আসনই পাতা হয়েছে। একটু অবাক হয়ে বলল, এ কী! তোমরা খাবে না?
আপনে আগে খাইয়া লন। আমরা পরে খাম—
উঁহু, তা হবে না। তোমরাও বসো–
অনেক বলা সত্ত্বেও কিছুতেই যুগলকে বসানো গেল না। তবে কার্তিক গণেশের জন্য আসন পেতে দিল পাখি। একসঙ্গে খেতে বসে তারা বিনুকে সঙ্গ দেবে।
প্রচুর পদ বেঁধেছে পাখি। তিন রকম মাছ। কাতলা, বোয়াল, মৌরলা। ভাজা, ঝোল এবং সর্ষে বাটা দিয়ে ঝাল। তা ছাড়া মসুর ডাল। মাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক।
বিনু আঁতকে ওঠে, কী করেছ তোমরা! মানুষে কি এত খেতে পারে!
অ্যাত আর কই! রাইজদায় হ্যামকত্তার বাড়ি কী খাওনটাই না খাইতাম। হেই তুলনায় কী ই বা আপনের সুমখে ধইরা দিতে পারছি!
এত খরচ করার মানে হয়?
যুগল বলে, খরচ কই করলাম? চাউল আর ডাইল ছাড়া কিছুই কিনি নাই। মাছ যা দেখতে আছেন, হগলই আমাগো বিলের। কচুও এইখানকারই।
বিপুল পরিমাণ খাদ্যবস্তু সাজিয়ে দিয়ে সামান্য দূরে নতচোখে বসে আছে পাখি। মাথায় ছোট করে ঘোমটা টানা। কপালে মস্ত সিঁদুরের ফোঁটা, সিঁথিতেও চওড়া করে সিঁদুরের টান। দুই ছেলের মা। তবু মনে হয়, নতুন যুবতী। দেশভাগের পর এত যে ঝড় ঝাঁপটা গেছে, তবু তার চেহারায়। এখনও লাবণ্য আর সরলতা মাখানো। শালিকের মতো টানা কালো চোখে আর ঠোঁটে লাজুক হাসি।
