এই মুহূর্তে বিনুর মন থেকে রামকেশব, রুমা ঝুমা, অধর সাহা, নকুল, রুপোর পাহাড়ের মতো ইলিশের স্থূপ, মনোরম নদীতীর, এমনকি ঝিনুক পর্যন্ত মুঝে গেছে। তার বারো বছরের অপরিণত অস্তিত্বের পুরোটাই দখল করে নিয়েছেন এই বিস্ময়কর চমকপ্রদ মানুষটি, যার নাম ডেভিড লারমোর।
বারকয়েক চোখাচোখির পর বিনু ধরা পড়ে গেল। সমেহ হেসে লারমোর শুধালেন, কী দেখছ?
লজ্জা পেয়ে বিনু তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল, উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর আবার তাকাতে লাগল বিনু। তার মনের কথাটা বোধহয় পড়তে পারলেন লারমোর। বিনুর দিকে খানিক ঝুঁকে বললেন, আমায় কিছু বলবে?
এই মানুষটি সম্বন্ধে এই মুহূর্তে বিনুর মনে অনেক জিজ্ঞাসা, অসীম কৌতূহল। ঘাড় ঈষৎ হেলিয়ে সে জানালো-বলবে।
লারমোর বললেন, বল না—
এতক্ষণে গলায় স্বর ফুটল বিনুর। ফিসফিসিয়ে বলল, পরে।
পরে কেন, এখনই বলে ফেল।
বিনু চুপ।
একটু ভেবে হাসতে হাসতে লারমোর বললেন, আচ্ছা, পরেই বলো।
একসময় ফিটনটা বাড়ি পৌঁছে গেল।
১.০৯ ভেতর-বাড়ির উঠোনে
ভেতর-বাড়ির উঠোনে এসে ফিটন থামালেন লারমোর। তারপর খানিক আগের মতোই লাফ দিয়ে নেমে চেঁচামেচি জুড়ে দিলেন, রমু কই রে–আমার সুরমা কোথায়?
সুরমা কাছেই ছিলেন। দক্ষিণ-দুয়ারী বড় ঘরখানার বারান্দায় পিঠময় চুল মেলে দিয়ে শিবানী আর স্নেহলতার সঙ্গে চাল বাছতে বাছতে গল্প করছিলেন। ডাকটা কানে যেতে চকিত হয়ে মুখ ফেরালেন। উঠোনের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল, লারমোর দাঁড়িয়ে আছেন। আশ্বিনের এলোমেলো বাতাসে তার সাদা দাড়ি এবং চুল উড়ছে।
এতকাল পরও লারমোরকে দেখেই চিনতে পারলেন সুরমা। নিমেষে তার বয়স থেকে কুড়ি পঁচিশটা বছর যেন মুছে গেল। কৈশোর যৌবনের মাঝামাঝি একটা সময় কিছুকাল রাজদিয়ায় কাটিয়ে গিয়েছিলেন। তখন সুরমা নীরোগ, সুস্থ। পরিপূর্ণ উজ্জ্বল স্বাস্থ্যে ঝলমল করতেন। প্রাণবন্ত চঞ্চল পাখিটির মতো সারাদিন ছিল তার ছোটাছুটি, ছেলেমানুষির খেলা। বিশেষ করে লারমোরকে কাছে পেলে আবদার আর লাফালাফির মাত্রাটা যেত হাজার গুণ বেড়ে।
এতদিন পর লারমোরকে দেখে সেই উচ্ছল স্নিগ্ধ দিনগুলোতে যেন ফিরে গেলেন সুরমা। রাজদিয়ায় এসে বার বার নিজের বয়স ভুলছেন। অসুস্থ রুণ শরীরের কথা ভুলছেন, পারিবারিক মর্যাদার কথা ভুলছেন। আজও সব ভুলে কুড়ি পঁচিশ বছর আগের মতো কিশোরীটি হয়ে উড়তে, উড়তে ছুটতে ছুটতে উঠোনে নেমে এলেন। লারমোরকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, এই তো আমি লালুমামা–
এক মুহূর্ত সুরমার দিকে তাকিয়ে রইলেন লারমোর, তারপরেই নির্মল স্নেহের আলোয় মুখখানা ভরে গেল। সুরমাকে বুকের ভেতর টেনে নিয়ে একসঙ্গে কত কথা যে বলে গেলেন। স্নেহলতা, শিবানী বা হেমনাথ যা যা বলেছিলেন সেই সব কথা। এতকাল কেন রাজদিয়ায় আসেন নি সুরমা, শরীর কেন এত রোগা হয়ে গেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। লারমোরের বুকের ভেতর থেকে সুরমা একে একে উত্তর দিতে লাগলেন।
এদিকে ফিটন থেকে সুধা-সুনীতি-বিনু আর অবনীমোহনও নেমে এসেছেন। ইলিশ মাছ হাতে ঝুলিয়ে হেমনাথও নেমেছেন। ওধারের বারান্দা থেকে স্নেহলতা শিবানী পায়ে পায়ে কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন।
প্রাথমিক উচ্ছাস খানিক কেটে গেলে বন্দিনী সুরমা লারমোরের বুকের ভেতর থেকে মুক্তি পেলেন। আর তখনই চোখ পাকিয়ে, তর্জনী নাচিয়ে স্নেহলতা এগিয়ে এলেন, এই যে সাহেব–
দু’পা পিছিয়ে লারমোর ভয়ে ভয়ে শুধোলেন, এমন রণরঙ্গিণী মহিষমর্দিনী রূপে কেন? আমার বুক কিন্তু কাঁপছে।
আগের সুরেই স্নেহলতা বললেন, ক’দিন পর এ বাড়িতে আসা হল?
বোধহয় ছ’সাত দিন।
মোটেও না।
ঢোক গিলে লারমোর বললেন, তবে?
স্নেহলতা বললেন, বারো দিন।
অত দিন আসি নি!
নিশ্চয়ই, আমি গুনে রেখেছি।
গলাটাকে খাদের ভেতর নাময়ে লারমোর এবার বিড়বিড় করলেন, আবার গোনাগুনির কী দরকার ছিল!
স্নেহলতার চোখ আরও বড় হল, গলা আরও তিন পর্দা চড়ল, গুনে রেখে অন্যায় করেছি?
অসহায়ের মত এদিক সেদিক তাকিয়ে লারমোর কোনওরকমে বলতে পারলেন, না মানে–
তাঁর কথা শেষ হবার আগেই স্নেহলতা ঝলকে উঠলেন, কী কথা হয়েছিল শুনি? ঠিক ছিল, এবার থেকে এ বাড়িতে খাওয়া হবে। আমি রোজ দু’বেলা করে বারো দিন চব্বিশ বেলা ভাত ফুটিয়ে মরছি আর আসল মানুষের টিকির দেখা নেই।
লারমোর উত্তর দিলেন না।
স্নেহলতা থামেন নি। একবার অবনীমোহনকে, একবার সুরমাকে, একবার সুধা সুনীতিকে সাক্ষী মেনে সমানে গজগজ করতে লাগলেন। তিনি যা বললেন, সংক্ষেপে এইরকম। লারমোরের কেউ নেই, একা একা রাজদিয়ার আরেক প্রান্তে পড়ে থাকেন। তার ওপর যথেষ্ট বয়সও হয়েছে। খাওয়া দাওয়ার ঠিকঠিকানা নেই। ওঁর গাড়ির বুড়ো কোচোয়ানটা যেদিন চাট্টি ভাত ফুটিয়ে দেয় সেদিন খান, নইলে দু’দিন হয়তো খেলেনই না। এমন করলে শরীর টেকে? তাই স্নেহলতা কদিন আগে কথা আদায় করে নিয়েছিলেন, এবার থেকে তার কাছে দু’বেলা খেয়ে যাবেন লারমোর। কথা দিয়ে। ভদ্রলোক সেই যে উধাও হয়েছেন, বার দিন পর আবার তাকে দেখা গেল। কাজেই স্নেহলতার রেগে যাবার কারণ আছে।
লারমোর আধবোজা চোখে আঁটা-ঠোঁটে চুপচাপ সব শুনে গেলেন।
স্নেহলতা বললেন, তোমাকে যখন একবার পেয়েছি সাহেব, চব্বিশ বেলার ভাত একসঙ্গে খাওয়াব।
