বিনু বলল, সে তোমাকে ভাবতে হবে না। আসছে বেস্পতিবার হাসপাতালে পা দেখিয়ে হিরণদাদের বাড়িতে তো যাচ্ছই। তখন টাকাটা পেয়ে যাবে।
যুগল বলল, ট্যাকা নিমু। তয় একখান কথা ছুটোবাবু।
বিনু উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায়, কী কথা?
যেইদিন পারুম ট্যাকাটা কিন্তুক আপনেরে ফিরত দিমু। না কইতে পারবেন না।
বিনু জানে, যুগলের আত্মসম্মান বোধ প্রখর। সে ঋণী থাকতে চায় না। বলল, ঠিক আছে, দিও–
বাইরের মলিন আলোটুকু কে যেন কোন ফাঁকে এক টানে সরিয়ে নিয়ে গেছে। বিলের জল এবং ওধারের নিবিড় গাছপালা এখন ঘন কুয়াশায় আর অন্ধকারে একাকার। কখন সন্ধে নেমে গিয়েছিল, বিনুরা খেয়াল করে নি।
সমস্ত চরাচর জুড়ে সবুজ আলো জ্বেলে লক্ষ কোটি জোনাকি উড়ছে। দুরের জঙ্গল থেকে পেঁচা এবং নাম না-জানা পাখিরা কর্কশ গলায়, চেঁচিয়ে উঠছে। আঁধার খান খান করে ভৌতিক শব্দ করে চিৎকার করছে খটাশেরা। কোথায় যেন শিয়ালদের মজলিশ বসেছে। তারা একটানা ডেকে চলেছে। মুকুন্দপুরের কুকুরগুলো সমঝদার শ্রোতা হয়ে নীরবে বসে নেই। চড়া গলায় গজরাতে গজরাতে অদৃশ্য শিয়ালদের হাঁকাহাঁকি লক্ষ করে তাড়া করে যাচ্ছে। এছাড়া চারপাশ একেবারে নিঝুম।
বিনুর মনে হল, মহাপৃথিবীর বাইরে কোনও অচেনা, অলৌকিক ভূখণ্ডে সে যেন চলে এসেছে।
জানালা দিয়ে শীতল হাওয়া বিলের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে হু হু করে ঘরে ঢুকছিল। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পাওয়া মানুষের মতো যুগল বলে ওঠে, ইস, আন্ধার হইয়া গ্যাছে। বাতাস জবর টালকি (ঠাণ্ডা) লাগতে আছে। শশব্যস্তে উঠে গিয়ে ঘরের জানালাগুলো বন্ধ করতে করতে স্বর উঁচুতে তুলে সে ডাকাডাকি করতে লাগল, পাখি–পাখি–
রান্নাঘর থেকে পাখির গলা ভেসে এল, কী কও?
ছুটোবাবু আন্ধারে বইসা আছে। তর হুশ নাই। অহনই বাত্তি আঙ্গাইয়া (জ্বালিয়ে) গণশার হাতে পাঠাইয়া দে–
একটু পরে বছর পাঁচেকের একটা ছেলে জ্বলন্ত হেরিকেন ঘরের মাঝখানে নামিয়ে রেখে চলে গেল। মুহূর্তে ঘরটা আলোয় ভরে যায়।
উঠোন পেরিয়ে খানিক আগে এখানে আসার সময় রান্নাঘরে দুটো ছেলেকে দেখেছিল বিনু। তাদের মধ্যে এও ছিল। বলল, এই বুঝি গণেশ?
যুগল ঘাড় হেলিয়ে দেয়, হ। আমার বড় পোলা। ছুটোটার নাম কাত্তিক। হেয় (সে) পাকের ঘরে তার মায়ের কাছে রইছে।
একটু ভেবে বিনু জিজ্ঞেস করে, ছেলেদের কী ব্যবস্থা করেছ?
কুন ব্যবোস্তার কথা কন ছুটোবাবু?
একটু আগে লেখাপড়ার কথা বলছিলে না? ছেলেদের স্কুলে ভর্তি করেছ?
হঠাৎ আলো নিবে গেল যেমন হয়, মুখটা তেমনি কালো হয়ে গেল যুগলের। চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকে সে। মুহ্যমান। বিমর্ষ। তারপরে বলে, না ছুটোবাবু। ইস্কুল আছে হেই আগরপাড়ায়। ভত্তি করুম ক্যামনে? দুই আড়াই মাইল হাইটা পোলা দুইটারে লইয়া ক্যাঠা (কে) হেইখানে যাইব, ক্যাঠাই বা ফিরাইয়া আনব? পাখির তো সংসারের কাম থাকে। হেয় (সে) বাড়ি ছাইড়া বাইর হইতে পারব না। আমারও সোময় নাই। ভূরে উইঠা মাছ মাইরা পাইকারগো কাছে দৌড়াইতে হয়। পোলাগো নিয়া ইস্কুলে যামু ক্যামনে?
এ এক গভীর সমস্যা। আগে তো অন্নচিন্তা। তারপর ছেলেদের পড়াশোনার ভাবনা। কী উত্তর দেবে, ভেবে পেল না বিনু।
যুগল থামে নি, অনেকদিন ভাবছি, আমাগো মুকুন্দপুরে একখান ইস্কুল খোলন দরকার। হুদা (শুধু) কাত্তিক গণশার লেইগা না, এইখানের অন্য পোলামাইয়াগো লেইগাও। তাগো বাপ-মায়েরাও ইস্কুলের কথা কয়। আমিও খোঁজে আছি ছুটোবাবু।
বিনু জিজ্ঞেস করে, কিসের খোঁজে?
মাস্টারের। রাইজদা তাজপুর দেলভোগ গিরিগুঞ্জ, এই হগল জাগা থিকা মেলা মাস্টার দ্যাশ ছাইড়া চইলা আইছে। তাগো কেওরে (কাউকে) কেম্পে কি শিয়ালদার ইস্টিশানে পাইয়া গেলে মুকুন্দপুরে লইয়া আসুম। তেনারে দিয়া ইস্কুল বসানের ইচ্ছা। হে ছাড়া
তা ছাড়া কী?
একজন ডাক্তর কি কবিরাজেরও দরকার। রোগ ব্যারাম হইলে রুগীরে মাচানে শুয়াইয়া কান্ধে তুইলা হেই আগরপাড়ায় যাইতে হয়। কী যে কষ্ট!
পলকহীন যুগলের দিকে তাকিয়ে থাকে বিনু। মুগ্ধ। অভিভূত। রাজদিয়ায় যে নিরক্ষর যুবকটি হেমনাথের বাড়িতে কামলা খাটত, পাট জাগ দিত, ধানবোনা এবং ধানকাটার তদারক করত, অথৈ জলধারায় নৌকো বাইতে বাইতে ভাটিয়ালি গাইত আর মনের সুখে মাছ মেরে বেড়াত সেই মানুষ বিল এবং জঙ্গলে ঘেরা মুকুন্দপুরের এই বিজন ভূখণ্ডে একটি পরিপূর্ণ জনপদ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। এখানে স্কুল বসাবে, চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। লেখাপড়া বা রোগ সারাবার জন্য দূরে কোথাও ছুটতে হবে না।
বিনু কী বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ সামনের বিশাল খোলা চত্বরের ওধারের কোনও ঘর থেকে বয়স্ক মেয়েমানুষের কাতর, করুণ কান্নার ধ্বনি হেমন্তের অন্ধকার এবং কুয়াশা চিরে চিরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
সচকিত বিনু জিজ্ঞেস করে, কে কাঁদছে যুগল?
হেরিকেনের আলোয় চোখে পড়ে, যুগলের সারা মুখ বিষাদে ছেয়ে গেছে। সে বলে, গৌরাঙ্গ বিশ্বাসের বউ।
গৌরাঙ্গ বিশ্বাস কে?
আপনে কি চিনবেন? দেলভভাগে ওনাগো বাড়ি আছিল।
বিনু জানায় গৌরাঙ্গ বিশ্বাসকে সে চেনে না। জিজ্ঞেস করল, কাঁদছে কেন?
পাকিস্থানে উনাগো বস্যের মাইয়ারে (যুবতী মেয়েকে) কাইড়া লইয়া গ্যাছে। হেই দুঃখে কান্দে। যতদিন বাচব, ততদিন কাইন্দাই যাইব।
