কিন্তু—
কী?
বিলের মালিক নিশ্চয়ই কেউ আছে। তারা তোমাদের মাছ ধরতে দিচ্ছে?
যুগল বলল, বিলের মালিক অবশ্যই একজন ছিল কিন্তু সে মারা যাওয়ায় ছেলেদের মধ্যে বাপের বিষয় আশয় নিয়ে ধুন্ধুমার চলছে। যতদিন না তার একটা নিষ্পত্তি হচ্ছে, বিলের দিকে কারোর নজর নেই। আপাতত তাই নির্বিঘ্নে মাছ মারতে পারছে যুগলরা।
বিনু বলল, তবে যে বলেছিলে, মালিকের গুণ্ডাদের সঙ্গে লড়াই করে তোমরা এখানে বেঁচে আছ?
যুগল জানায়, বিলের মালিক সরকারেরা। আর পারের যত জমিন আর জঙ্গল হের মালিক পালচধরিরা (চৌধুরিরা)। আমাগো যুজ্যু পালচধরিগো লগে। উই দ্যাখেন ছুটোবাবু’ ঘরের একটা কোণের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল সে।
আগে লক্ষ করেনি বিনু, ওই কোণটায় খাড়া করে রাখা হয়েছে সাত ফলাওলা টেটা, তেল পাকানো লাঠি, সড়কি, ইত্যাদি নানা ধরনের মারণাস্ত্র।
যুগল বলতে লাগল, এইগুলা দিয়াই পুঙ্গির পুতেগো লগে যুজ্ঞ চালাইয়া যাইতে আছি। অ্যামন লাঠি সড়কি মুকুন্দপুরের বেবাক মাইনষের ঘরে ঘরে।
জবরদখল কায়েম রাখতে লড়াইয়ের কথা আগেই জানিয়েছিল যুগল। এই লড়াই তো আছেই। কিন্তু তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে বিনু। বলে, সরকারদের ঝগড়াঝাটি চিরকাল থাকবে না। সে সব মিটে গেলে ওরা নিশ্চয়ই বিল নিয়ে পড়বে। তখন কি তোমাদের জলের ধারে ঘেঁষতে দেবে?
যুগলকে এবার একটু বিচলিত দেখায়, ছুটোবাবু, এই কথাখান যে আমি ভাবি নাই তা না। তয় অহন তো চইলা যাইতে আছে। পরে যদিন সরকাররা ফ্যাসাদ বাধায়, লাঠি সড়কি লইয়া নাইমা পড়ুম।
এটা কোনও কাজের কথা নয়। কত দিকে কতজনের সঙ্গে লড়াই করবে? বিনু বোঝায়, যুগলের সংসার আছে, ছেলেমেয়ে বউ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অন্যের বিলের ওপর নির্ভর করে চিরদিন তো চলতে পারে না। ভবিষ্যতের কথা ভেবে রুজি-রোজগারের স্থায়ী একটা ব্যবস্থা করা দরকার।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে যুগল। তাঁকে চিন্তাগ্রস্ত দেখায়। একসময় ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলে, আপনে ঠিকই কইছেন ছুটোবাবু। লিখাপড়া তো শিখি নাই। আচায্যি মশয়ের লাখান নয় কেলাস তরিও যদিন পড়তাম, নিয্যস একখান চাকরি বাকরি জুইটা যাইত। একটু থেমে বলে, লিখাপড়ার শক্তিই অন্যরকম। প্যাটে যদিন কালির অক্ষর থাকে, পিরথিমীর যেইখানেই যাও, না খাইয়া মরতে হইব না। পাকাপাকি একখান ব্যবোস্তা হইবই। হে যাউক, আমার কী করন দরকার হের (তার) বুদ্ধি পরমাশ্য দ্যান–
একটি অক্ষরপরিচয়হীন মানুষের পক্ষে নতুন জায়গায় এসে কতটা কী করা সম্ভব? এখানকার অন্য সবাই যা করছে বেঁচে থাকার তা-ই একমাত্র পথ। অর্থাৎ মালপত্র ফেরি করা, নইলে বাজারে দোকান খুলে বসা। বিনু দোকানের কথাটাই বলল।
বিমর্ষ মুখে যুগল বলে, দোকান যে দিমু ট্যাকা কই? পুজি (মূলধন) না থাকলে কি ব্যবসা করন যায়?
তোমাদের মুকুন্দপুরের এত লোক যে দোকানদারি করছে তারা টাকা পেল কোথায়?
দ্যাশ থিকা হেরা কিছু আনতে পারছিল। হেই দিয়া মহাজনের কাছ থিকা মাল কিনা (কিনে) দোকানে বেচে।
তুমি কিছু আনতে পার নি? তোমরা যখন ইণ্ডিয়ায় এলে তখনও তো অবস্থা এখনকার মতো খারাপ হয় নি। অনেকে অনেক কিছু আনতে পেরেছে।
আনছিলাম ছুটোবাবু। হগল খরচ হইয়া গ্যাছে। হাত এক্কেবারে শূন্য। নিত্য দাসের কথা মনে পড়ল বিনুর। তার মুখে শুনেছিল, গভর্নমেন্ট ছোটখাটো ব্যবসার জন্য উদ্বাস্তুদের কিছু অনুদান আর কিছু লোন দিচ্ছে। অবশ্য তার জন্য প্রচুর তদ্বির করতে হয়, বহুজনের কাছে নানা ডিপার্টমেন্টে ধরনা দিতে হয়। যুগল নিত্য দাসের মতো চতুর নয়। সে কি দিনের পর দিন লেগে থেকে পারবে সে সব আদায় করতে? তবু ঋণ এবং অনুদানের কথাটা ওকে জানানো দরকার। বিনু জানালোও।
যুগল বলল, গরমেন (গভর্নমেন্ট) যে অ্যামন সুযুগ সুবিধা দিতে আছে, শুনি নাই তো। এইর লেইগা কাগো ধরতে হইব?
বিনুরও তা জানা নেই। নিত্য দাসের সঙ্গে খুব শিগগিরই দেখা হবে। যদি সে কথা রাখে, হেমনাথের চিঠি নিয়ে নিশ্চয়ই সুধাদের বাড়ি আসবে। তখন তাকে জিজ্ঞেস করে সব জেনে নেবে।
বিনু বলল, খবর নিয়ে তোমাকে জানাবো। তুমি একাই না, ইচ্ছা করলে এখানকার আরও অনেকেই ঋণ টিন পেতে পারে।
যুগলের চোখমুখ উদ্দীপনায় ঝকমক করতে থাকে, কাইলই হগলরে ডাইকা জানাইয়া দিমু–
না না, এখন কিছু বলো না। আগে আমি নিজে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝে নিই।
একট চুপচাপ।
তারপর বিনু ফের বলে, ঋণ পেতে অনেক সময় লাগে। তার আগে এক কাজ কর—
যুগল জিজ্ঞেস করে, কী কাম ছুটোবাবু?
বিনু এর মধ্যে মনে মনে হিসেব করে নিয়েছে। রাজদিয়া থেকে আসার সময় বেশ কিছু টাকা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। তা ছাড়া, হিরণও তাকে দিয়েছে। খরচ টরচ করার পর কয়েক শ’ টাকা এখনও হাতে আছে।
বিনু বলল, আমি তোমাকে আপাতত শ’চারেক টাকা দিতে পারি। তাই দিয়ে ছোটখাটো কোনও দোকান খুলতে পারবে?
এমনটা ভাবতেই পারে নি যুগল। অযাচিত ভাবে বিনু সাহায্য করতে চাইছে। খুশিতে, কৃতজ্ঞতার তার মনে ভরে যায়। বলে, পারুম ছুটোবাবু, পারুম। এইর থিকা কত কম পুজিতে অনন্যরা দোকান দিছে। কিন্তুক–
কী?
আপনে হপায় (সবে) দ্যাশ থিকা আসছেন। আছেন সুধা বইনের বাড়ি। অত ট্যাকা কই থিকা দিবেন?
