নিশিকান্ত বেশ নিরাশ হল, ঠিক আছে। হ্যামকত্তার নাতির যহন হেই ইচ্ছা, কী আর করন! তাইলে চাউল ডাইল যা দিছস, লইয়া যা–
যুগল পাখিকে বলল, যা, আচায্যি মশয়ের ঘর থিকা হগল লইয়া আয়। হাত-পাও ভালা কইরা ধুইয়া, কাঁচা কাপড় পিন্ধা (পরে) রানবি (রাঁধবি)।
বিনু তার হাতের রান্না খাবে। খুশিতে হাওয়ার আগে উড়তে উড়তে চলে গেল পাখি।
শুধু বিনুর খাওয়াদাওয়া নিয়ে ভাবলেই তো চলবে না। যুগলের সমস্ত দিকে নজর। পতিতপাবনরা রয়েছে, হরিন্দরা রয়েছে। আজ রাতের জন্য তাদের খাওয়ানোর দায়িত্ব নিল বুধাই পাল, নগা পাল, প্রাণবল্লভ আর হাচাই পাল। কাল থেকে অন্য ব্যবস্থা করা হবে। কারও একার পক্ষে দুই পরিবারের এতগুলো লোকের খাদ্য জোটানো অসম্ভব। যতদিন না পতিতপাবন আর হরিন্দর রুজি রোজগারের কোনও বন্দোবস্ত হচ্ছে, পালা করে করে তারা এর ওর বাড়ি খাবে। দুই পরিবারে ছেলেমেয়ে নিয়ে মোট দশজন। মুকুন্দপুরবাসীদের কারোর এমন অবস্থা নয় যে একসঙ্গে এতগুলো লোককে খাওয়ায়। ঠিক হল, একেক বাড়িতে দুজন দুজন করে খাবে। তাতে কারোর ওপর ততটা চাপ পড়বে না।
বেলা আরও হেলে গেছে। পশ্চিম দিকের গাছপালার আড়ালে সূর্যটা কখন নেমে গিয়েছিল, বিনুরা লক্ষ করে নি। সূর্যটাকে দেখা না গেলেও দিনের শেষ বিলীয়মান আলোটুকু এখনও আকাশের গায়ে অবছাভাবে লেগে আছে।
কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরে এই মুকুন্দপুর। এর একধারে আদিগন্ত ফসলের মাঠ। আরেক দিকে অজস্র গাছপালা, ঝোপঝাড়, বনজঙ্গল এবং অফুরান বিল। পায়ের তলার মাটি ভিজে ভিজে। বিদ্যুৎ আসে নি। কলকাতার তুলনায় ঠাণ্ডাটা এখানে অনেক বেশি। হেমন্তের এই বেলাশেষে মাটি থেকে হিম উঠে আসছে। দূরে, বিলের ওধারে, গাছপালার মাথায় কুয়াশা জমতে শুরু করেছে। বেশ শীত শীত লাগছে বিনুর। বোঝা যাচ্ছে, দিনের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। দেখতে দেখতে ঝপ করে সন্ধে নেমে যাবে।
যুগল বলল, ওস পড়তে আছে ছুটোবাবু। বাইরে বইসা থাকলে ঠাণ্ডা লাইগা জ্বরজারি হইতে পারে। ঘরে চলেন– বুধাই পালদের বলল, পতিতদাদা আর হরিন্দদাদাগো তোমাগো ঘরে লইয়া যাও।
ভিড়টা আস্তে আস্তে পাতলা হতে থাকে। পতিতপাবনদের নিয়ে বুধাই পালরা চলে যায়।
যুগলের বাড়িটা একেবারে বিলের কিনারা ঘেঁষে। বাড়ি আর আর কী। দু’খানা ঘর। মেঝে মাটির। চারপাশে কাঁচা বাঁশের বেড়া। মাথায় টালির ছাউনি। জানালাগুলোতে পাল্লার বদলে বাখারির ঝাঁপ। সামনের দিকে উঠোনের একধারে মাটির উঁচু বেদির ওপর তুলসীর ঝাড়। আরেক পাশে রান্নাঘর।
যুগল বিনুকে সঙ্গে করে তার বাড়িতে নিয়ে এল। উঠোন পেরিয়ে যেতে যেতে দেখা গেল, রান্নাঘরে পাখি রান্নার তোড়জোড় করছে। যুগলের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে এখন তার পরনে পরিষ্কার একখানা শাড়ি আর জামা। দুটো বাচ্চা তার কাছে বসে খেলছে। নিশ্চয়ই যুগলের ছেলে।
কাজ করতে করতে পায়ের শব্দে চোখ তুলে একবার বিনুদের দিকে তাকাল পাখি। তার মুখে। লাজুক হাসি ফোটে। পরক্ষণে নতচোখে ফের সে নিজের কাজে মন ঢেলে দেয়।
যুগলের পিছু পিছু ডানপাশের বড় ঘরখানায় চলে এল বিনু। একধারে বেড়ার গায়ে লাগানো তক্তপোষে ফিটফাট বিছানা। পরিপাটি করে সবুজ ডোরাদার চাদর পেতে রাখা হয়েছে। বালিশে কাঁচা ওয়াড় পরানো। পায়ের দিকে গায়ে দেবার জন্য ভঁজকরা চাদর। বিনু বুঝতে পারে, এসব তারই জন্য।
পাখি যে সুগৃহিণী তার ছাপ ঘরের সর্বত্র। বিছানার উলটো দিকের বেড়া ঘেঁষে ক’টা টিনের বাক্স, আয়না, চিরুনি, আলনায় সামান্য ক’টা জামাকাপড়। কোথাও অগোছালো ভাব নেই।
যুগল বলল, বিছনায় বসেন ছুটোবাবু’ সে নিজে ঘরের কোনা থেকে একটা বেতের মোড়া টেনে এনে কাছাকাছি বসল।
বাঁ ধারের জানালা দিয়ে তাকালে পর পর অনেকগুলো ঘর চোখে পড়ে। বিনু জিজ্ঞেস করল, ওগুলো কাদের?
যুগল জানায়, প্রথমটা টুনিদের, তারপর থেকে তার শ্বশুর গোপাল দাস, খুড়শ্বশুর কানাই দাস, পিসশ্বশুর নবীন দাস, মাসশ্বশুর দয়াল দাস ইত্যাদিদের। দেশভাগের পর যখন ভাটির দেশে একতরফা খুনজখম লুটপাট ধর্ষণ শুরু হয়, সেই সময় কলকাতায় চলে এসেছিল যুগল। নিজের বউ বাচ্চাদের নিয়েই শুধু না, তার শ্বশুর গোষ্ঠীটাকেই সঙ্গে করে এনেছে। এবং এই মুকুন্দপুরে তারই কাছে ওদের পাকাপাকি থাকার বন্দোবস্ত করেছে।
যুগল বলতে লাগল, আত্মবান্ধব পাশে থাকন ভালা। বিপদে আপদে হেরাই বল ভরসা। তাই না ছুটোবাবু?
বিনু গলার স্বরে জোর দিয়ে বলে, একশ’ বার–
ডানদিকের জানালার বাইরে হাত পনের দূর থেকে বিল। দিন যত ফুরিয়ে আসছে, বিলের চেহারাও ততই বদলে যাচ্ছে। জলের রং ক্রমশ কালো হচ্ছে।
মুখ ফিরিয়ে এবার বিলের দিকে তাকাল বিনু। হেমন্তের স্থির নিস্তরঙ্গ জল উথলপাথল করে মাছেরা ঘাই দিয়ে চলেছে অনবরত।
মাছগুলো অদৃশ্য রয়েছে জলের তলায়। বিলের ওপর দিকের আলোড়ন দেখেই যুগল বলে দিচ্ছে, কোনটা কোন মাছের ঘাই। বিনু জানে, জলতলের অন্তহীন রহস্য যুগলের নখদর্পণে। সে যা বলছে, মোল আনা নির্ভুল। রাজদিয়ায় থাকতে এমন প্রমাণ বহুবার পেয়েছে বিনু। খাল-বিল নদীর রুপোলি ফসলেরা কে কী করে বেড়াচ্ছে, জলস্তর ভেদ করে সে যেন তা দেখতে পায়।
যুগল বলে, বিলের এই মাছই মুকুন্দপুরের আমাগো কয় ঘর মাইনষের একমাত্তর ভরসা।
