সেই বুধাই পাল, হাচাই পাল আর নগা পাল কৌলিক ব্যবসা ছেড়ে এখন আনাজ বেচছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল বিনুর। জিনকে লক্ষ করে বলল, এই পশ্চিম বাংলাতেও তো লোকে মাটির বাসনকোসন কেনে। প্রচুর লক্ষ্মীপুজো, দুর্গাপুজো, কালীপুজো হয়। প্রতিমারও চাহিদা আছে। দেশের মতো আপনারা সে সব বানান না কেন?
বুধাই পাল বুঝিয়ে বলল, হাঁড়ি কলসি বা প্রতিমা তৈরির জন্য বিশেষ বিশেষ মাটি দরকার। সেই মাটি কোথায় পাওয়া যায়, তারা জানে না। তবে খোঁজখবর নিচ্ছে। তা ছাড়া, বাসনকোসন বা দেবদেবীর মূর্তি গড়লেই তো হল না। তার খদ্দের চাই। নতুন জায়গায় তারা জিনিস বেচবে কার কাছে? দেশে সাত পুরুষ ধরে এক কাজ করে এসেছে। সেখানে বাঁধা ক্রেতা ছিল। এই বয়সে এক কাপড়ে নতুন দেশে এসেছে। পাঁচ পয়সার সম্বল নেই। এখানকার বাজারের হালচাল জানা নেই। ফের ব্যবসা কঁদবে কিসের ভরসায়?
কথায় কথায় জানা গেল, রাজদিয়া থেকে মাইল দশেক দূরের গ্রাম গিরিগঞ্জ থেকে দুঘর কর্মকার এসেছে। দেশে তারা নেহাইয়ে গরম লোহা পিটিয়ে শাবল কোদাল খন্তা ইত্যাদি বানাত। বুধাই পালদের মতো তাদেরও এখানে নিজেদের কাজ করার সুযোগ নেই। যারা চাষবাস করত বা বরজে পান ফলাত, তাদেরও পৈতৃক কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। চাষ যে করবে, এখানে সেই জমি কোথায়?
মুকুন্দপুরের বেশির ভাগ মানুষই দু’মুঠো ভাতের জন্য ট্রেনে ট্রেনে আজকাল নানা জিনিস ফেরি করে বেড়ায়। ধূপকাঠি, বিস্কুট, লজেন্স, রকমারি পুতুল, লক্ষ্মীর পাঁচালি, গোপাল ভাঁড়ের মজাদার গল্প, সাড়ে বত্রিশ ভাজা। কেউ কেউ কলকাতায় গিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বড়ি, আচার, পাঁপড় বেচে। অনেকে কলকাতারই ফুটপাতে শস্তা রুমাল, বালিশের ওয়াড়, সায়া, ব্লাউজ, বাচ্চাদের জামাপ্যান্ট ইত্যাদি নিয়ে বসে। কয়েকজন সোদপুর নৈহাটি আর বেলঘরিয়ার বাজারে ছোটখাটো দোকানও দিয়েছে। কুমোর, কামার, তাঁতি, বারুই, আপাতত এখানকার সবাই হয় ফেরিওলা, নয়তো দোকানদার।
যুগল এবং আরও ক’জন ফেরি করে না, বা কোথাও দোকান দেয় নি। তারা এই বিলের মাছ ধরে নানা বাজারে পাইকারদের কাছে বিক্রি করে আসে। এইভাবেই চলছে।
যুগল বলল, মুকুন্দপুরের হগলের দেখা অহন পাইবেন না ছুটোবাবু। হেরা বাইর হইয়া গ্যাছে সকালে। ঘুইরা ঘুইরা মাল বেইচা রাইতে ফিরব। কইয়া গ্যাছে, ফিরাই আপনের লগে দেখা করব।
একটু চুপচাপ।
তারপর যুগল আবার বলে, আমাগো বেবাকটির (সবার) দিন আনি দিন খাই অবোস্তা। তয় এইখানে দুইজন লিখাপড়া জানা মানুষ আছে। তাগো প্যাটের চিন্তা নাই।
বিনু জিজ্ঞেস করে, কাদের কথা বলছ?
নিশিকান্ত আচার্যকে দেখিয়ে যুগল বলে, একজন হইল উই আচায্যি মশই, আরেক জন হরনাথ কুণ্ড। দুই জনে পণ্ডিত মানুষ। আচায্যি মশাই নয় কেলাস তরি (ক্লাস নাইন পর্যন্ত) পড়ছে। হরনাথ কুণ্ডু মেট্রিক পাশ। ওনারা গরমেনের (গভর্নমেন্টের) চাকরি পাইছে।
নিশিকান্তকে বহুবার দেখেছে বিনু। কিন্তু হরনাথ কুণ্ডর কথা মনে পড়ল না। সে বলল, ওই নামে রাজদিয়ায় কেউ কি ছিল?
যুগল বলল, না। উনাগো গেরাম হাজিপুর। রাইজদা থিকা সাত আট মাইল পুবে।
উনি কোথায়? ডেকে নিয়ে এস। আলাপ করব।
আপিসে গ্যাছে। কইলকাতায়। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা পার হইয়া যাইব।
মুকুন্দপুরের বাসিন্দাদের অনেকেই এখন নানা কাজে বাইরে রয়েছে। রাতের আগে তাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
বিনু ভাবছিল, একজন ম্যাট্রিক পাশ। আরেকজন ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে। এই বিদ্যায় কী ধরনের সরকারি কাজ পাওয়া সম্ভব? খুব কৌতূহল হচ্ছিল তার। নিশিকান্তর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কোথায় চাকরি করেন?
নিশিকান্ত শুধু নিজেরই না, হরনাথ কুণ্ডুর চাকরি সম্বন্ধেও সবিস্তার সব জানালো। উদ্বাস্তুদের জন্য সরকারি একটা কোটা আছে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তাদের কাজকর্ম দেওয়া হয়। নিশিকান্ত চাকরি পেয়েছে ফুড ডিপার্টমেন্টে। দমদম স্টেশনের কাছে একটা রেশনের দোকানে সে ক্যাশ মেমো লেখে। নাইন ক্লাসের বিদ্যায় এমন কাজ জোটে না। উদ্বাস্তু বলে নিয়মটা শিথিল করা হয়েছে। হরনাথ কুণ্ডুর বেলাতেও তা-ই। চল্লিশের ওপর বয়স। এই বয়সে সরকারি কাজ মেলে না। এখানেও সেই সহানুভূতি বা করুণা। তার চাকরি হয়েছে ল্যাণ্ড রেভেনিউ ডিপার্টমেন্টে।
নিশিকান্তর ডিউটি ন’টা থেকে পাঁচটা। সে বলল, তুমি আমাগো হ্যামকত্তার নাতি। তুমি আসবা বইলা আইজ আর র্যাশনের দোকানে যাই নাই। দ্যাশ ছাইড়া চইলা আসছ। এইটা একখান কামের কাম করছ। তা হ্যামকস্তারে রাইজদায় রাইখা আসলা ক্যান?
পরিচিত লোকজনদের সবারই হেমনাথ সম্পর্কে এক প্রশ্ন। তিনি কেন দেশে পড়ে আছেন? অন্যদের যা বলেছে, নিশিকান্তকে সেই একই উত্তর দিল বিনু। জন্মভূমি ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।
জোরে জেরে মাথা নাড়ে নিশিকান্ত। বোঝাতে চায়, হেমনাথের সিদ্ধান্তটা ঠিক নয়। মস্ত ভুল করছেন তিনি। একটুকী ভেবে সে বলে, যুগইলা তোমার খাওনের লেইগা চাউল ডাইল তরিতরকারি মাছ আমাগো ঘরে দিয়া গ্যাছে। রাইতে খাইতে খাইতে দ্যাশের কথা ভালা কইরা শুনুম। অহন যাই। তোমার মাসিমারে গিয়া রান্ধন বসাইতে কই।
খাওয়ার ব্যাপারে মুকুন্দপুরে আসার সময় বিনু কী কড়ার করিয়ে নিয়েছিল, হঠাৎ যুগলের মনে পড়ে যায়। হাতজোড় করে শশব্যস্তে সে নিশিকান্তকে বলে, আচায্যি মশই, আপনের পায়ে ধরি, আমার অপরাধ নিয়েন না। ছুটোবাবু আমাগো রান্ধনই খাইব। তেনি জাতপাত মানেন না। এইর পর উনি তো মুকুন্দপুরে আরও আসব। তহন একদিন খাওয়াইয়া দিয়েন।
