পাখিও আর আগের মতো নেই। তার শরীরেও প্রচুর ভাঙচুর হয়ে গেছে। ওকে দেখামাত্র এখনও সেই চিত্রটা পলকে চোখের সামনে ফুটে উঠল। পারাপারহীন অথৈ জলে অলৌকিক জলপরীর মতো শাপলাবন শালুকবনের ভেতর দিয়ে সাঁতার কেটে কেটে সে তার আর যুগলের নৌকোয় এসে উঠেছিল। তারপর ওদের দুজনের বিয়েতে কত ঘটা, কত হইচই, কত বাদ্যিবাজনা।
চোখাচোখি হতে লাজুক হাসে পাখি।
এদিকে সামনের জটলাটার মধ্যে সবাই নিচু গলায় কথা বলছিল, হ্যামকত্তার নাতি আমাগো এইখানে আসছেন! আমাগো কী সুভাইগ্য! হেমনাথ এদের স্মৃতিতে এখনও সজীব। দেশভাগ হয়ে গেছে, সীমান্তের এপারে তারা চলে এসেছে, জীবনে আর কোনও দিনই হয়তো তার সঙ্গে এদের দেখা হবে না, তবু রাজদিয়ার সেই মানুষটির প্রতি এই লোকগুলোর অনন্ত শ্রদ্ধা, অফুরান ভালবাসা। কতকাল ধরে এই লোকগুলোর সুখেদুঃখে শোকে কি আনন্দে বড় মায়ায় তিনি জড়িয়ে থেকেছেন। এত তাড়াতাড়ি কি তাকে ভোলা যায়! বিনু জানে, তার যে এমন সমাদর, সে শুধু হেমনাথের নাতি বলেই।
টুনি বলে, অ বাবুগো বাড়ির পোলা, যুগাইলা কইছিল আপনেরে লইয়া আসব। বিশ্বাস যাই নাই–
বাকি সবাই তার কথায় সায় দেয়।
বিনু হাসে, এখন বিশ্বাস হয়েছে তো?
টুনির মধ্যে অদ্ভুত এক সারল্য রয়েছে। হেসে হেসে মাথা হেলিয়ে দেয় সে, হইছে।
সবাই শতমুখে দেশের কথা জানতে চায়। তারা পাকিস্তান থেকে এসেছে অনেকদিন আগে। বিনু এসেছে সদ্য। এখন সেখানে কী চলছে, বিনুদের সঙ্গে আর কারা কারা এপারে এল, হিন্দুদের পক্ষে আর সেখানে থাকা সম্ভব হবে কিনা, ইত্যাদি হাজারো প্রশ্ন।
যুগল অধৈর্য হয়ে উঠেছিল। ব্যস্তভাবে বলল, এখন উই হগল প্যাচাল থাউক। কতখানি পথ ছুটোবাবুগো হাটাইয়া নিয়া আসছি। ঘাইমা চুইমা গ্যাছে। পাখি, তুই গিয়া বিল থিকা বালতি ভাইরা জল আইনা দে। ছুটোবাবু হাতমুখ ধুইয়া জিরাইয়া লউক।
বিনুর মনে পড়ল, বিয়ের আগে দ্বীপের মতো টুনিদের সেই বাড়ি থেকে সাঁতরে পাখি যখন তাদের নৌকোয় এসে ওঠে, যুগল তাকে তুমি করে বলেছিল। এখন বলছে তুই। ভালবাসাটা নতুন কোন খাত দিয়ে বইছে, কে জানে।
যুগল বিলের দিকে হাত বাড়িয়ে পতিতপাবনদের বলে, উইখানে ঘাটলা আছে। আপনেরা হাত পাও ধুইয়া আসেন।
বিনুর এবং পতিতপাবনদের জন্য আলাদা আলাদা বন্দোবস্ত। বিনু লজ্জা পেয়ে যায়। তার জন্য জল আনতে পাখি দৌড় লাগাতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে সে বলে, আমি নিজেই বিলে যাচ্ছি। জল এনে দিতে হবে না।
যুগল বলে, আপনেগো কত নুন খাইছি ছুটোবাবু। এই স্যাবাটুকু (সেবাটুকু) করতে দ্যান—
বিনু ধমকে ওঠে, এ নিয়ে আর একটা কথাও বলবে না। আমি এখনও অথর্ব হয়ে পড়িনি।
যুগল চুপ করে থাকে। তার মুখ খুলতে সাহস হয় না।
বিনু তার কাপড়ের ঝোলা থেকে সাবান আর তোয়ালে বার করে পতিতপাবনদের নিয়ে বিলে চলে যায়।
নারকেল গুঁড়ি কেটে পোক্ত ঘাট বানানো হয়েছে। এই হেমন্তে বিলের জল বড় শান্ত। নিস্তরঙ্গ।
স্টেশন থেকে এতটা পথ হেঁটে বেশ ক্লান্তি লাগছিল। সারা শরীরে ধুলোর পুরু স্তর জমেছে। বিনু খুব ভাল করে অনেকক্ষণ চোখেমুখে জল ছিটালো। তারপর সাবান ঘষে হাত-পা মুখটুখ ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে ফেলল।
কার্তিক মাস শেষ হতে চলল। এর মধ্যে জল ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। আরামে গা যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে।
বিল থেকে ফিরে ফের সেই টিনের চেয়ারে বসে পড়ল বিনু, পতিতপাবনেরা শতরঞ্চিতে। এর ভেতর চায়ের ব্যবস্থা করে ফেলেছে যুগলরা। টুনি বড় একখানা ভরনের থালায় কলাই-করা গেলাসে গেলাসে চা আর মোটা মোটা সুজির বিস্কুট সাজিয়ে নিয়ে এল।
একটা গেলাস তুলে চুমুক দিল বিনু। শস্তা, তিতকুটে চা। তবে আগুন আগুন। এতটা হাঁটাহাঁটির পর এই চা-ই স্নায়ুগুলো চাঙ্গা করে দিল।
মুকুন্দপুরের বাসিন্দারা এখনও সামনে অনড় দাঁড়িয়ে আছে। একজনও চলে যায় নি।
বিনু বুধাই পালকে বলে, আপনারা যে এখানে আছেন, চলে কী করে? সরকারি সাহায্য কিছু পান?
বুধাই বলে, একখান ফুটা আধলাও না। কষ্টে দিন কাটতে আছে ছুটোবাবু। ভুরে (ভোরে), আন্ধার থাকতে উইঠা হাচাই, নগা আর আমি বেলঘইরা (বেলঘরিয়া) চইলা যাই। পাইকারগো কাছ থিকা শস্তায় আনাজপাতি কিনা উইখানের বাজারে বইসা খইদ্দারগো বেশি দরে বেচি। যা দুই চাইর পহা (পয়সা) লাভ হয়, হেই দিয়া কুনো গতিকে সোংসার চইলা যায়। তয় (তবে) এই মুকুন্দপুরে আমাগো বেবাকের একখান কইরা ঘর হইছে। এইটুকই যা শান্তি।
বিনুর মনে পড়ে, রাজদিয়ায় থাকতে সেই বৈশাখ থেকে পুজোর আগে পর্যন্ত রাশি রাশি মাটির হাঁড়ি পাতিল কলসি ইত্যাদি বানিয়ে পুইনে পুড়িয়ে স্থূপাকার করে রাখত বুধাই আর হাচাই দুই ভাই। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পর দেড়শ’ কি দুশ’ মণী নৌকোয় সেগুলো বোঝাই করে চলে যেত বহুদূরে। পদ্মা মেঘনা কি ধলেশ্বরীর চরে চরে, গাওয়াল’ করতে। হাঁড়ি পাতিলের বদলে নৌকো ভরে ধান নিয়ে ফিরত সেই হিমঋতুতে। পৌষের শেষাশেষি বা মাঘের শুরুতে। এই ছিল তাদের জাত-ব্যবসা।
নগাকে অবশ্য কোথাও যেতে হত না। বছর জুড়েই পূর্ব বাংলায় হাজার পার্বণ। দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, কার্তিক পুজো, শীতলাপুজো। নগা বাড়িতে বসেই বছরভর প্রতিমা বানাত। কাজের শেষ নেই। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এসে নৌকোয় করে তার প্রতিমা কিনে নিয়ে যেত।
