যুগল বলল, এই হইল আমাগো মুকুন্দপুর।
উত্তর না দিয়ে চতুর্দিক লক্ষ করতে করতে এগিয়ে চলেছে বিনু।
যুগল থামে নি। সমানে বলে যাচ্ছে, এই যে বাড়িঘর দেখতে আছেন, এইখানে কয় মাস আগে কী আছিল জানেন?
কী?
ঠাসা জঙ্গল। আছিল শয়ে শয়ে জাইত সাপ (বিষাক্ত সাপ), বাঘডাসা, ভাম, বড় বড় বিছা। দ্যাশের মানুষজন জুটাইয়া জঙ্গল সাফা কইরা, সাপ খোপ মাইরা এই গেরাম বসাইছি ছুটোবাবু। হগলই তো পাকিস্থানে ফেলাইয়া আসছি। সাহস কইরা রিফুজ কেম্প থিকা বাইর হইয়া পড়ছিলাম বইলাই না এই ঘর তুলতে পারছি। নাইলে কেম্পে পইচাই মরতাম। য্যামনই হউক, নিজেগো ঘর তো– তৃপ্তিতে, আত্মপ্রসাদে যুগলের চোখমুখ ঝলমল করতে থাকে।
অপার বিস্ময়ে যুগলের দিকে তাকায় বিনু। তাকে যত দেখছে ততই মুগ্ধ হচ্ছে। দূর গাঁ থেকে যুগল যখন হেমনাথের বাড়িতে কামলা খাটতে এসেছিল, খাল বিল নদী আর জলতলের রুপোলি ফসল অর্থাৎ মাছ ছাড়া পার্থিব অন্য কোনও দিকে তার নজর ছিল না। সেই যুগল সব খুইয়ে আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে একদিন চলে এল এখানে। শূন্য হাতে একক প্রচেষ্টায় সৃষ্টি করেছে ছিন্নমূল মানুষের এই উপনিবেশ। এ কি সামান্য ঘটনা! বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যে কোনও বড় শিল্পীর চেয়েও তার এই বিপুল কর্মকান্ড অনেক বেশি মহান।
যুগল বলতে লাগল, ছুটোদিদিগো বাড়ির কাছে হেই যাদবপুর বাশধানির (বাঁশদ্রোণী) চাইর ধারে জবর দখল কুলোনি হইছে। ইচ্ছা করলে হেই হগল জাগায় জমিন পাইয়া যাইতাম। কিন্তুক লই নাই–
কলকাতার অত কাছে। সেখানে কত সুযোগ সুবিধা। যাদবপুরের ওধারের জমি না নিয়ে কিন্তু ভুল করেছ।
একেবারেই না ছুটোবাবু। যুগল হেসে হেসে বলে, আপনে তো জানেন, যুগাইলা নদী আর মাছ ছাড়া বাচব না। যাদবপুর বাশধানীতে নদী কই? মাছ কই? তামাম পিরথিমী ঘুইরা ঘুইরা শ্যাষ তরি এই বিলের খোঁজ পাইলাম। নদী না জুটুক, একখান আলিসান বিল তো জুটছে। আমাগো দ্যাশের লাখান অত না হইলেও এই বিলে মেলা মাছ। রুইত কাতল শৌল বোয়াল গোলসা ট্যাংরা গরমা টাকি। ঠিক কইরা ফেলাইলাম, এইখানেই ঘর বান্ধুম।
অফুরান উদ্যমে এই বসতি তৈরি করেছে ঠিকই। কিন্তু যুগলের কাছে বাসস্থানই শেষ কথা নয়। এর সঙ্গে জল আর মাছও তার চাই। যুগলের রক্তমাংসে আজন্ম ওই দুটো জড়িয়ে আছে। নইলে কলকাতার কাছে জমি পেয়েও সে হেলায় হাতছাড়া করে!
দূরে আঙুল বাড়িয়ে যুগল এবার জিজ্ঞেস করে, উইখানে কী দ্যাখেন ছুটোবাবু?
বসতি যেখানে শেষ, তারপর থেকে একটানা বনভূমি। বিনু বলল, জঙ্গল। কেন বল তো?
যুগল জানায়, এখানে পুরো অঞ্চলটা জুড়েই ছিল জঙ্গল। সামনের দিকের যৎসামান্য অংশ নির্মূল করে গ্রাম বসানো হয়েছে। বাকিটা সাফ করলে প্রচুর জমি বেরুবে। কম করে ওদিকটায় আরও হাজার পাঁচেক মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। যুগলের একান্ত ইচ্ছা, রাজদিয়া অঞ্চলের লোকজন এসে বাড়িঘর তুলে থিতু হয়ে বসুক। সেই জন্যই তো শিয়ালদা স্টেশনে ঘুরে ঘুরে সে তাদের খুঁজে বেড়ায়। তার ধারণা, পূর্ব বাংলার অন্য এলাকার অচেনা মানুষ এলে হয়তো বনিবনা হবে না। তখন দিনরাত অশান্তি, ঝগড়াঝাটি, ধুন্ধুমার কান্ড।
কথায় কথায় ওরা বসতির ভেতর চলে এসেছিল। ঘরগুলোর চৌহদ্দির বাইরে, সামনের দিকে অনেকখানি খোলা জায়গা। ওখানে ধুলোমাটি মেখে প্রচুর বাচ্চাকাচ্চা হুটোপুটি করছে। কটি কিশোরী, যুবতী এবং মাঝবয়সী সধবা মেয়েমানুষকেও দেখা গেল। এধারে ওধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। নানা বয়সের ক’টা পুরুষ। যুবক, আধবুড়ো, বৃদ্ধ। নতুন মানুষজন দেখে সবাই থমকে গিয়েছিল। এমনকি বাচ্চাগুলোও হইচই থামিয়ে অবাক বিস্ময়ে বিনুদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ গলার স্বর অনেক উঁচুতে তুলে উত্তেজিত ভঙ্গিতে চিৎকার করতে থাকে যুগল, কে কই আছ, তরাতরি এইখানে চইলা আসো। দ্যাখো কারে নয়া আসছি।
চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। সবগুলো ঘর থেকে একজন দু’জন করে ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে আসে।
যুগল একই সুরে চেঁচিয়ে যায়, আমাগো ছুটোবাবু, হ্যামকত্তার নাতি আইছে। কেও একখান চ্যার (চেয়ার) কি জলচৌকি নিয়া আসো। পতিতপাবন দাদা আর হরিভাইও বউ পোলা মাইয়া নিয়া আইছে। তাগো বসনের ব্যবোস্তা কর।
লহমায় একটা পুরনো জং-ধরা টিনের চেয়ার এবং একটা আধ-ছেঁড়া শতরঞ্চি এনে কারা যেন পেতে দেয়। বিনুকে বসানো হয় চেয়ারে, পতিতপাবনদের শতরঞ্চিতে।
মুকুন্দপুর বসতির মানুষগুলো সামনের দিকটা ঘিরে দাঁড়িয়েছে। যুগলের উত্তেজনাটা তাদের মধ্যেও যেন চারিয়ে গেছে।
যুগল বলল, অ্যাতখানি হাইটা আসছে। তিয়াস লাগছে। জল আনো–
বিনু ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সার সার মানুষগুলোকে দেখছিল। সবই প্রায় পরিচিত মুখ। রাজদিয়ার কুমোরপাড়ার দুই ভাই বুধাই পাল আর হাচাই পাল, তালতলির নগা পাল, বিনোদ সাহা, যুগলের শ্বশুর গোপাল দাস, তার ভগ্নিপতি ধনঞ্জয়, বারুই বাড়ির প্রাণবল্লভ, মাছের আড়তদার নকুল কুণ্ড, সুজনগঞ্জের মিঠাইয়ের দোকানদার হারান ঘোষ, পোস্ট অফিসের পিওন নিবারণ, তাজপুরের নিশিকান্ত আচার্য, এমনি অনেকে। তাদের ছেলেমেয়ে বউরাও রয়েছে।
ভিড়ের শেষ মাথায় যুগলের পিসতুতো বোন টুনি আর তার বউ পাখি। সুজনগঞ্জের হাটে যাবার পথে টুনিকে প্রথম দেখেছিল বিনু। অদ্ভুত বাড়ি ছিল টুনিদের। আশ্বিন মাসে, দুর্গাপুজোর আগে আগে ওদের উঠোনটা ছিল এক মানুষ জলের তলায়। চারপাশে অনেক উঁচু ভিতের ওপর চারখানা টিনের চালের ঘর। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাবার জন্য ধনুকের আকারে সাঁকো। একটা সাঁকোর মাথায় দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলছিল টুনি। আর চার পাঁচ বছরের বাচ্চা দুটো তার লাউয়ের মতো ঝুলন্ত স্তন চুষছিল চো চো। বিরক্ত টুনি ঝাড়া দিয়ে তাদের উঠোনের জলে ফেলে দিচ্ছিল, আর বাচ্চাদুটো হাত পা ছুঁড়ে সাঁতরাতে সাঁতরাতে উঠে এসে আবার টুনির মাই টানছিল। দৃশ্যটা মনে পড়তেই অতি কষ্টে হাসি চাপল বিনু। সেই টুনির স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। একসময় ছিল বেশ মোটাসোটা ভারী শরীর। দুতিনটে ছেলেমেয়ের মা হলেও আলগা একটা জেল্লা ছিল চেহারায়। এখন চামড়া খসখসে, চোখ বসে গেছে, হাড় ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। সেই বড় দাঙ্গার সময় থেকে একের। পর এক যা চলেছে, তাতে টিকে যে আছে, এই না কত!
