সেই ইংরেজ আমলে শত প্রলোভন উপেক্ষা করেছেন রামরতন। বর্জন করেছেন যাবতীয় পার্থিব উচ্চাকাঙ্ক্ষা। পূর্ব বাংলার তুচ্ছ এক গ্রামে গিয়ে হেডমাস্টারির দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন। সারাটা জীবন যিনি মানুষ গড়ার কাজে ক্ষয় করে দিলেন, শেষ বয়সে তার কী মূল্য পেলেন তিনি? মেয়েদের সম্মান বাঁচানোর জন্য তাকে দেশ ছাড়তে হল।
জীবন্ত রামরতন শেষ পর্যন্ত সীমান্তের এপারে পৌঁছতে পারেন নি। রিফিউজি স্পেশালে এসেছিল তার শব। নিথর, অসাড়। তাঁকে ঘিরে চারটি শোকাতুরা মহিলার চিত্রটি যেন দেখতে পাচ্ছে বিনু।
রামরতনের ভাইপো বিমলের বাড়িতেই আছেন তার স্ত্রী এবং তিন মেয়ে। মেয়েদের মধ্যে দু’জনের বিয়ে হয় নি। কেমন আছে ওরা?
বিমল তার ঠিকানা লিখে দিয়েছিল। বিনু বলেছিল, খুব শিগগিরই একদিন সেখানে যাবে। কিন্তু যাওয়া হয় নি। নিজের নানা সমস্যায় এতটাই ব্যতিব্যস্ত ছিল যে ওদের কথা মনেও পড়ে নি। মুকুন্দপুর থেকে ফিরে এসে খুব শিগগিরই একদিন বিমলের বাসায় যেতে হবে।
এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম যেখানে শুরু, তার মুখটায় দাঁড়িয়ে ছিল পতিতপাবনরা। হরিন্দদের দেখে ওরা বেশ খুশি হল। এবং অবাকও।
পতিতপাবন জিজ্ঞেস করে, দ্যাশ থিকা কবে আসলা হরিন্দ?
হরিন্দ বলে, এই তা দিন সাতেক। ছুটোবাবুর লগে তারপাশায় দেখা। হেইখান থিকা একলগে আসছি।
আছিলা কই?
এ ক’দিন তাদের কোথায় কেটেছে, জানিয়ে দিল হরিন্দ।
পতিতপাবন সামান্য আক্ষেপের সুরে বলে, আমরা আসছি দুই মাসের উপুর। এই ইস্টিশানের আরেক মুড়ায় (প্রান্তে) আছিলাম। কান্ড দেখ, একখানে থাকছি, অথচ কারোর লগে কারোর দেখা হয় নাই।
স্টেশনের বড় গোল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে যুগল, আগরপাড়ার গাড়ি ছাড়নের সোময় হইয়া আইল। তরাতরি চলেন। এই টেরেন ধরতে না পারলে পরের গাড়ির লেইগা আধা ঘন্টা বইসা থাকতে হইব।
তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে জোরে জোরে পা চালাতে চালাতে হরিন্দ পতিতপাবনকে বলে, আপনেরাও কি যুগইলাগো কাছে থাকনের লেইগা চললেন?
পতিতপাবন মাথা নাড়ে, হ।
আমরাও। ছুটোবাবু ভরসা দিচ্ছে। হের উপুর আর কথা নাই।
.
৩.৩২
আগরপাড়ায় এসে বিনুরা যখন নামল, হেমন্তের বেলা অনেকটা হেলে গেছে। রোদ জুড়িয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
স্টেশনের দু’ধারেই নানা ধরনের দোকানপাট। লোকজনও বেশ চোখে পড়ছে। সব মিলিয়ে জায়গাটা মোটামুটি জমজমাট।
যুগল সবাইকে নিয়ে রেল লাইনের ওপারে চলে এল। এদিকটা বেশ ঘিঞ্জি। দোকানও তুলনায় অনেক বেশি। একধারে গাছতলায় কাতার দিয়ে কটা সাইকেল রিকশা দাঁড়িয়ে আছে।
বিনু বলল, রিকশা নেওয়া যাক–কী বল যুগল?
যুগল বলল, মোটে দুই মাইল পথ। হেয়া ছাড়া আমাগো উই দিকের রাস্তাও ভালা না। রিশকা যাইতে চায় না। গ্যালে মেলা (অনেক) ভাড়া চাইব। কম কইরা পাঁচখান রিশকা এতগুলান মাইনষরে লইয়া যাইতে লাগব। হুদাহুদি (শুধু শুধু এত ট্যাকা খরচ করবেন ক্যান? সে জানে রিকশা নিলে ভাড়াটা বিনুই দেবে।
যুগল বলতে লাগল, কথা কইতে কইতে চইলা যামু। আধা ঘন্টাও লাগব না।
বিনু হাসল, ঠিক আছে। তাই চল–সে বুঝতে পারে, অনাবশ্যক তার কিছু টাকা খরচ হোক, যুগল তা চাইছে না। স্টেশন এলাকাটা, পেরুলে নতুন পুরনো মিলিয়ে বেশ কিছু ঘরবাড়ি। তবে সব কেমন যেন ছাড়া ছাড়া। শহর সেভাবে এখনও দানা বাঁধে নি।
এধারে ওধারে অনেকগুলো পাকা রাস্তা চোখে পড়ল। এখানে যে একটা মিউনিসিপ্যালিটি আছে তার প্রমাণস্বরূপ রাস্তাগুলোর ধারে ধারে নতমস্তকে স্ট্রিট লাইটের পোস্ট দাঁড়িয়ে আছে। আলোগুলো অবশ্য এই দিনের বেলায় জ্বলছে না। দু’ধারে বাঁধানো ভোলা নর্দমাও দেখা যাচ্ছে।
মিনিট দশেক হাঁটার পর শহরের চৌহদ্দি শেষ। দু’চারটে বাড়ি যে এদিকে নেই তা নয়। তবে অনেকটা দূরে দূরে।
পথ প্রদর্শকের মতো আগে আগে চলেছে যুগল। তার পাশে বিনু। পেছনে বাকি সবাই।
যে রাস্তা দিয়ে বরাবর পুব-দক্ষিণে বিনুরা হাঁটছে সেটার খানিকটা পিচ দিয়ে মোড়া, কিছুটা খোয়ায় ঢাকা। তারপর কাঁচা পেঁয়ো পথ যেমন হয় হুবহু তা-ই।
পিচ এবং খোয়ার এলাকা পেরুতেই দু’ধারে ধানের খেত। এখনও ফসল কাটা হয় নি। সোনালি শস্যে আদিগন্ত মাঠের ঝাঁপি ভরে আছে। মাঝে মাঝে খাল, সাঁকো, সাঁকোর মাথায় মাছরাঙা। অনেক দূরে, আকাশ যেখানে পিঠ ঝুঁকিয়ে দিগন্তে নেমেছে, আবছা কটা গ্রাম। বাতাস চিরে চিরে মহাশূন্যে সাদা রেখা টেনে বকের ঝাক কোথায় উড়ে চলেছে, কে জানে।
রোদের জলুস যত মরে আসছে, হেমন্তের আকাশ ততই মলিন হচ্ছে। বিকেল ফুরোতে না ফুরোতেই মিহি সরের মতো কুয়াশা নামতে শুরু করেছে।
যুগল বলেছিল, মুকুন্দপুর স্টেশন থেকে মাত্র দু’মাইল। বিনুর ধারণা, কম করে তিন সাড়ে তিন মাইল হাঁটা হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করল, আর কতদূর যুগল?
আইসা গেছি ছুটোবাবু–সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে যুগল বলল, উই যে তালগাছগুলা খাড়ইয়া রইছে হের পরেই মুকুন্দপুর।
তিন চার শ’ হাত তফাতে তালগাছের একটা জটলা। সংখ্যায় পনের ষোলটা হবে। আকাশের দিকে সেগুলো মাথা তুলে আছে।
তালগাছের দঙ্গলটা পেরুতেই চোখে পড়ল বাঁ দিকে বিশাল এক বিল। বহু দুরে, ওধারের সেই দিগন্ত পর্যন্ত সেটার বিস্তার। বিলের ডান দিকে ষাট সত্তরটার মতো ঘর। ভেবে চিন্তে, রীতিমতো পরিকল্পনা করে সেগুলো বানানো হয় নি। তাড়াহুড়ো করে যত্রতত্র তোলা হয়েছে। পূর্ব বাংলার ধাঁচে প্রতিটি ঘরেরই কাঁচা বাঁশের বেড়া, মাথায় টিন কি টালির ছাউনি। দরজা জানালা কাঁচা আমকাঠ চিরে তৈরি। তবে সব কটা ঘরেরই চারপাশ ঘিরে অনেকটা করে খোলামেলা জায়গা।
