কারোর সাড়া পাওয়া গেল না। যুগল বেশ নিরাশই হল, নাঃ, এই গাড়িতে আমাগো উই দিকের একজনও আসে নাই। আর সোময় নষ্ট কইরা কী হইব! চলেন ছুটোবাবু, যাই গা–
শেষ কামরাটা দেখে প্ল্যাটফর্মের মাঝামাঝি যখন ওরা চলে এসেছে, আচমকা ডান দিক থেকে চেনা গলার ডাক বিনুর কানে ভেসে আসে, ছুটোবাবু, ছুটোবাবু
মুখ ফেরাতে বিনু দেখতে পায়, ইটের আল দিয়ে ঘেরা কুড়ি পঁচিশ স্কোয়ার ফিট এলাকার ভেতর হরিন্দ তার বউ ছেলেমেয়েদের নিয়ে বসে আছে। প্ল্যাটফর্মের এই জায়গাটুকুই তা হলে তার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।
সেদিন একসঙ্গে তারা তারপাশা থেকে স্টিমারে এবং পরে গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে কলকাতায় এসে নেমেছিল। তখন অন্য কোনও দিকে লক্ষ্য ছিল না বিনুর। একমাত্র চিন্তা, কিভাবে অবনীমোহনকে খুঁজে বার করবে।
তারপর মাঝখানের কটা দিন তাকে আর ঝিনুককে ঘিরে এত এত সব কাণ্ড ঘটে গেছে, দু’জনকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে হয়েছে শহরের এক মাথা থেকে অন্য প্রান্তে, যে অন্য কারোর কথা চিন্তা করার সময় পাওয়া যায় নি। অবশ্য সুধাদের কাছে আসার পর দুর্ভাবনা এবং উদ্বেগের সাময়িক অবসান ঘটেছে।
হরিন্দ উঠে এসেছিল। বিনু জিজ্ঞেস করল, সেই থেকে নিশ্চয়ই এখানে আছ? পরক্ষণে মনে হল, প্রশ্নটা একেবারে নির্বোধের মতো হয়ে গেছে। এই বিশাল অচেনা মহানগরে অন্য কোথায়ই বা যেতে পারে ওরা!
বিনু যা ভেবেছে তারই যেন প্রতিধ্বনি শুনতে পেল হরিন্দর কথায়, কই আর যামু? শুনাশুন শুনতে আছি, আমাগো রানাঘাটের কাছে কুন এক কেম্পে পাঠাইয়া দিব। কানে আসছে, কেম্পের অবোস্তা এইখানের থিকাও খারাপ।
বিনু কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগে হরি ব্যাকুলভাবে তার দুই হাত জড়িয়ে ধরে বলল, এই জাগাটা একেবারে নরক। শয়ে শয়ে মানুষ, চাইরটা মোটে পাইখানা। গু মুতে চাইর দিক থিকথিকা। দুই বেলা দুই দলা কইরা খিচোড়ি খাইতে দ্যায়। ইস্টিশানে ছয় সাত হাত জাগার (জায়গার) মইদ্যে। আমাগো পাঁচজন মাইনষের শোওন-বসন। কী যে করুম, কপালে কী যে লিখা আছে, ভাইবা দিশা পাই না। হের উপুর শয়তানের গুষ্টি যুবুত মাইয়াগো ভাগাইয়া লইয়া যাইতে আছে। ট্যার পাই, আমার মাইয়াটার উপুর শকুনের দিষ্টি আইসা পড়ছে।
পতিতপাবনের মতো হরিন্দরও মেয়ে নিয়ে একই সমস্যা। সে থামে নি, আমারে বাঁচান ছুটোবাবু। এই নরককুণ্ডু থিকা অন্য কুনোখানে লইয়া গিয়া থাকনের ব্যবস্তা কইরা দ্যান। খাওন জুটুক চাই না–জুটুক, মাইয়াটার সব্বনাশ য্যান না হয়—
বিনু জিজ্ঞাসু চোখে যুগলের দিকে তাকায়। বুঝে নিতে চায়, হরিন্দরা মুকুন্দপুরে গেলে তার আপত্তি বা অসুবিধা হবে কিনা।
মুকুন্দপুরে পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়বে। বাড়বে জনবল। প্রবল উৎসাহের সুরে যুগল হরিন্দকে বলে, অহনই আমাগো লগে চল হরিন্দদাদা। একখান ভালা জাগা আছে। শান্তিতে থাকতে পারবা। কুনো কুত্তার পুতের সাইদ্য নাই হেইখানে গিয়া তুমার মাইয়ার দিকে নজর দেয়। যদিন কেও যাও, হের কইলজা (কলিজা) ফাইড়া রক্ত খাম। আসো–আসো–
ভূমণ্ডলের কোনও প্রান্তে তাদের জন্য নিরাপদ স্থান আছে কিনা, কে জানে। হতভম্বের মতো হরিন্দ বিনুর দিকে তাকায়। যুগলের কথায় কতটা ভরসা করা যায়, সে ভেবে পাচ্ছে না। সংশয়ের সুরে বলে, যুগইলা কী কয়, শুনছেন ছুটোবাবু? যামু?
বিনু বলে, নিশ্চয়ই যাবে।
হেমকর্তার নাতির ওপর রাজদিয়া অঞ্চলের মানুষজনের অগাধ বিশ্বাস। কোথায় কতদূরে যেতে হবে, সেখানে বাসস্থানের কী ব্যবস্থা, কিছুই জানতে চায় না হরিন্দ। চোখের পলকে পোঁটলাপুঁটলি বেঁধে হেঁদে ছেলেমেয়ে বউকে নিয়ে বিনুদের পিছু পিছু হটতে থাকে।
স্টেশনে আগেই ভিড় ছিল। এইমাত্র রিফিউজি স্পেশাল আসায় সেটা কয়েক গুণ বেড়ে গেল। হাজার হাজার মানুষের জটলা, হট্টগোল, কান্নাকাটি সরকারি কর্মচারী আর স্বেচ্ছাসেবীদের অনবরত ছোটাছুটি, মাইকে মুহুর্মুহু নানা ধরনের ঘোষণা। সব মিলিয়ে তুমুল বিশৃঙ্খলা। তার মধ্য দিয়ে পথ করে যেতে যেতে অনেকের কথা মনে পড়তে লাগল বিনুর। তালসোনাপুরের সেই ধুরন্ধর অধর ভূঁইমালী, পায়ের ব্যাণ্ডেজের ভেতর জমি বাড়ির দলিল, টাকা আর গয়না লুকিয়ে খোঁড়া সেজে যে পাকিস্তানি অফিসারদের ধোঁকা দিয়েছিল, কিংবা নয়া চিকন্দি গ্রামের হরিদাস সাহা যার মেয়েকে দাঙ্গাবাজরা রাত্তিরে তুলে নিয়ে যায়, বা তাহেরগঞ্জের নিরীহ ভুবন দাস, এমনি আরও অনেকে। এদের সঙ্গে তারপাশা থেকে স্টিমারে এবং গোয়ালন্দ থেকে ট্রেনে চেপে এই তো সেদিন শিয়ালদায় এসে নামল বিনু। কিছুক্ষণ আগে স্টেশনের বাইরের বিশাল চত্বরে যুগল যখন রাজদিয়া এলাকার লোকজন খুঁজে বেড়াচ্ছিল, তখনও তাদের দেখা যায় নি। এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে যারা ইটের আল তুলে বসে আছে, তাদের মধ্যেও ওরা নেই। ওদের কি রিফিউজি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে? কিছুই জানার উপায় নেই। হয়তো ওই লোকগুলোর সঙ্গে জীবনে আর কখনও দেখা হবে না। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে ওঠে বিনুর।
হঠাৎ এদের পেছনে সরিয়ে দিয়ে রামরতন গাঙ্গুলিদের মুখগুলো চোখের সামনে ফুটে ওঠে। আশ্চর্য, এঁদের কথাই সবার আগে মনে পড়া উচিত ছিল। জামতলির সৎ, আদর্শবাদী মাস্টারমশাইটি একদা স্বপ্ন দেখতেন, স্বাধীন ভারতের জন্য সত্যিকারের মানুষ তৈরি করতে হবে। শিক্ষাকে পৌঁছে দিতে হবে সর্বত্র, দেশের সুদূর কোণে কোণে। জাতি যদি সুশিক্ষিত না হয়, দেশের ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে যায়।
