যেইখানে থাকি। মুকুন্দপুরে। হেইখানে কুনো সুমুন্দির পুতের আপনের মাইয়ার দিকে নজর দিতে সাহস হইব না।
মুকুন্দপুরটা কুন জাগায়?
সংক্ষেপে সব বলল যুগল। সেখানে গেলে চেনাজানা মানুষজনের সঙ্গে যে দেখা হবে, তাও জানালো। আরও জানায়, রাজদিয়া অঞ্চলের লোকেদের খোঁজে প্রায়ই সে শিয়ালদায় আসে। আজও সেই উদ্দেশ্যেই এসেছিল। পতিতপাবনের খবরটা বিনুর কাছেই সে পেয়েছে।
পতিতপাবন বিনুকে জিজ্ঞেস করে, যুগইলার লগে তেমার ক্যামনে দেখা হইল?
বিনু বলল।
তুমি তাইলে মুকুন্দপুর দেখতে যাইতে আছ?
হ্যাঁ।
পতিতপাবন আবার যুগলের দিকে মুখ ফেরায়, যুগইলা, তুই তো আমারে লইয়া যাইতে চাস। হেইখানে গ্যালে খামু কী? শিয়ালদায় তভু দুই ব্যালা খিচোড়ি দ্যায়–
যুগল বলল, হে এট্টা বন্দবস্ত হইয়া যাইব। আগে চলেন তো। আমাগো যদিন দুই গরাস জোটে, আপনেগোও জুটব। এইখানে পইচা গইলা মরণের থিকা ভালা কইরা বাচনের এট্টা চ্যাষ্টা কইরা দ্যাখেন না–
কী একটু ভাবে পতিতপাবন। হেমনাথের বাড়ির কামলা যুগলকে রাজদিয়ায় কত বার দেখেছে। কিন্তু এই যুগল তার একেবারেই অচেনা। মহাকাশের পরপার থেকে সে এক দুর্লভ আশার বার্তা নিয়ে যেন হাজির হয়েছে। নৈরাশ্যের অতল গহ্বরে যখন পতিতপাবন ডুবে যাচ্ছে, সদয় একখানা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে যুগল। এ ছিল তার প্রত্যাশার বাইরে। একেবারেই অভাবনীয়।
পতিতপাবন ভীষণ উদ্দীপ্ত। তার চোখে মুখে হাতে পায়ে বিদ্যুৎ খেলে যায়। বলে, যুগইলা, তর লগেই যামু। বিনুভাই, তোমরা ইট্টু খাড়ও। জবর ক্ষুদা (ক্ষুধা) পাইছে। শ্যাষবারের লাখান শিয়ালদার খিচোড়িটা খাইয়া যাই। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছেলে মেয়ে বউকে টানতে টানতে লঙ্গরখানার লাইনে গিয়ে দাঁড়ায় সে।
এদিকে যে লোকটা ঘাড় গুঁজে পড়ে ছিল, কখন হুঁশ ফেরার পর সে উধাও হয়ে গেছে, বিনুরা কেউ লক্ষ করে নি।
আধ ঘন্টাও লাগল না, খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে সামান্য যা বাসনকোসন ছিল, কাপড়ে বেঁধে পতিতপাবন বলল, যারা আমাগো খাওয়ানের ভার নিছে তাগো কইয়া আসছি, খাতা থিকা আমাগো নাম কাইটা দ্যান। অর্থাৎ যে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান পতিতপাবনদের দায়িত্ব নিয়েছিল তাদের ভারমুক্ত করে এসেছে সে।
যুগল বলল, ভালাই করছেন পতিতদাদা—
তর ভরসায় শিয়ালদার লগে বেবাক সম্পর্ক চুকাইয়া দিলাম যুগইলা—
যুগল হাসে, ঠিক আছে। অহন লন (চলুন) যাই–
বাইরের বিস্তৃত চত্বর থেকে হাজার হাজার মানুষের বেড়াজাল ভেদ করে স্টেশনের ভেতর চলে এল ওরা। বিনু বলল, একটু দাঁড়াও, টিকিট কেটে নিই–
যুগল বলল, কিসের টিকট ছুটোবাবু? কিছুই কাটতে অইব না।
বিনা টিকিটে যেতে বলছ!
আমাগো দ্যাশ গ্যাছে, ভিটা গ্যাছে, বেবাক খুয়াইয়া আসছি। দ্যাশখান কি আমরা ভাগ করছি? বডারের উই পারে যা ফেলাইয়া আসছি, আমাগো আইনা দেউক। তহন একখানের জাগায় (জায়গায়) দুইখান টিকিট কাটুম। আসেন তো–
ওরা আগরপাড়ার ট্রেন ধরার জন্য তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে যাচ্ছিল, হঠাৎ গজরাতে গজরাতে হুড়মুড় করে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে গোয়ালন্দ থেকে রিফিউজি স্পেশাল এসে থামল। পাকিস্তানের ট্রেন কখন আসবে তার ঠিকঠিকানা নেই। সকালে যে ট্রেনের আসার কথা সেটা হয়তো শিয়ালদায় পৌঁছল বিকেলে, কিংবা মধ্যরাতে। আসলে গোয়ালন্দ থেকে নির্দিষ্ট সময়ে যে ট্রেন ছাড়বে, জোর দিয়ে তা বলা যায় না। বর্ডারের ওপারের সমস্ত কিছুই চলে পাকিস্তানের মর্জিমাফিক। বিশেষ করে রিফিউজি স্পেশালগুলোর বেলায়। পুরোটাই দায়সারা ভাব। তার সঙ্গে মিশে আছে উপেক্ষা, বিরক্তি, ঘৃণা। যদিও ঠিক সময়ে ট্রেনটা ছাড়ল, রাস্তায় হানাদারদের উৎপাত, বর্ডারে অবিরল হয়রানি, এসব পোহানোর পর তবে তো শিয়ালদায় পৌঁছবে।
যুগল থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। দেখাদেখি বাকি সবাই। বিনু জিজ্ঞেস করে, কী হল?
যুগলের চোখে মুখে প্রবল উত্তেজনা। সে বলে, ছুটোবাবু, চলেন আমার লগে। পতিতদাদা, আপনেরা এইখানে খাড়ইয়া থাকেন। একেবারে লইডেন (নড়বেন না। মাইনষের ভিড়ে মিশ্যা গ্যালে বিচরাইয়া বাইর করতে পারুম না
বিনু অবাক। জিজ্ঞেস করে, আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?
গোয়ালন্দ থিকা গাড়ি আসছে। দেখি চিনাজানা কারোরে পাই কিনা। বিনুর একটা হাত ধরে। প্রায় টানতে টানতে তাকে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে নিয়ে গেল যুগল। মুকুন্দপুরকে আরেকটা রাজদিয়া বা ভাটির দেশ বানানোর স্বপ্নটা সর্বক্ষণ তাকে অনন্ত উদ্দীপনায় ভরে রাখে।
রিফিউজি স্পেশালের প্রতিটি কামরার ভেতর এবং ছাদ থেকে হুড়হুড় করে মানুষ নেমে আসছে। শীর্ণ। ক্ষুধার্ত। সর্বস্ব খোয়ানো। চারদিকে হইচই, প্রচণ্ড শোরগোল। সরকারি কর্মচারী এবং অফিসারদের ড়ান্ত ব্যস্ততা আর ছোটাছুটি। মাইকে মুহুর্মুহু ঘোষণা। সদ্য আসা শরণার্থীদের শান্ত থাকতে বলা হচ্ছে। সবার থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কেউ যেন অধীর হয়ে না পড়ে। ইত্যাদি ইত্যাদি। বিনুরা যেদিন এসেছিল, অবিকল সেই দৃশ্য। কোথাও এতটুকু হেরফের নেই।
যুগলের সেই একই পদ্ধতি। খানিকটা আগে বাইরের চত্বরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে যেভাবে দেশের লোকজনের খোঁজ করছিল, হুবহু তেমনই কামরায় কামরায় মুখ বাড়িয়ে গলার স্বর উঁচুতে তুলে একনাগাড়ে বলে যাচ্ছিল, রাইজদা রসুইনা দেলভোগ গিরিগুঞ্জ সেরেজদীঘা তালতলি ডাকাইতা পাড়া থিকা কেও আইছেন? আইয়া থাকলে হুমৈর (সাড়া) দ্যান–
