কাছেই দাঁড়িয়ে আছে এক সদ্য যুবতী। পতিতপাবনের মেয়ে। ভয়ে আতঙ্কে থরথর কঁপছিল সে। পাশে আধঘোমটা দেওয়া তার মা এবং তিনটে ছেলেমেয়ে। পাঁচ থেকে দশের মধ্যে তাদের বয়স। মা এবং বাচ্চাগুলো একটানা কেঁদে চলেছে।
পতিতপাবন যে লোকটার গলা সাঁড়াশির মতো চেপে ধরেছে তার বয়স চল্লিশের আশেপাশে। পোকায়-কাটা চেহারা। চোখের তলায় কালির পোঁচ। সর্বাঙ্গে লুচ্চামির চিরস্থায়ী ছাপ।
লোকটার জিভ বেরিয়ে এসেছে। চোখ কোটর থেকে ঠিকরে পড়বে যেন। হাতদুটো লতপত করছে। গলা থেকে গোঙানির মতো ক্ষীণ একটু আওয়াজ চুঁইয়ে চুঁইয়ে বেরুচ্ছে।
চারপাশের লোকজন চেঁচামেচি করতে করতে দু’জনকে ছাড়াবার চেষ্টা করছে, ছাইড়া দ্যাও, ছাইড়া দ্যাও। মইরা যাইব যে। মরলে মেলা তাফাল (অনেক ঝাট)।
কিন্তু কে কার কথা শোনে। পতিতপাবনের মাথায় দানো ভর করেছে যেন। তার মোটা মোটা, কড়া-পড়া আঙুলগুলো লোকটার গলায় আরও চেপে বসে যাচ্ছে।
হতচকিত ভাবটা কেটে গেলে লাফ দিয়ে দু’জনের মাঝখানে গিয়ে পড়ল বিনু। পতিতপাবনের হাত ধরে টানতে টানতে শ্বাস-আটকানো গলায় বলল, এ কী করছ পতিত! গলা ছেড়ে দাও। সর্বনাশ হয়ে যাবে–
বিনুকে দেখে সম্বিত ফিরে আসে পতিতপাবনের। সহজে কি লোকটাকে ছাড়তে চায়? অনেক বোঝানোর পর হাতের ফাস আলগা করে। মাথা থেকে প্রচণ্ড ক্রোধটা নামতে শুরু করেছে। দুহাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ে সে। বালকের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।
পতিতপাবনের পাশে বসে তার কাঁধে হাত রেখে উৎকণ্ঠিত বিনু জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে পতিত? এই লোকটার গলা টিপে ধরেছিলে কেন?
চারপাশের জনতা একসঙ্গে গলা মিলিয়ে কিছু বলতে চাইছিল। ফলে কান-ফাটানো শোরগোলই শুধু হচ্ছে। তার একটি বর্ণও বোঝা যাচ্ছে না। ওদিকে যাকে খুন করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই লোকটা পিচ বাঁধানো চত্বরে কেতরে পড়ে আছে। হাত দুটো এলিয়ে রয়েছে। একটা হাঁটু বুকের কাছে দোমড়ানো। ডান পা থেকে চটি ঠিকরে পড়েছে অনেকটা দূরে। গালের কষ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে আসছে। লোকটা পুরোপুরি বেহুঁশ।
হঠাৎ কারা যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সব চেয়ে জরুরি খবরটা জানিয়ে দেয়, লাইন পড়ছে, লাইন পড়ছে। খিচোড়ি দিতে আছে–
অর্থাৎ যে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এধারের উদ্বাস্তুদের দায়িত্ব নিয়েছে তাদের খাদ্য প্রস্তুত। লঙ্গরখানা খুলে দেওয়া হয়েছে।
লহমায় ভিড়টা ফাঁকা হয়ে গেল। যে যার থালাবাটি যোগাড় করে উধ্বশ্বাসে লাইন দিতে ছুটল।
পতিতপাবন ঘাড় গুঁজে একইভাবে বসে আছে। অনেক বলার পর সে মুখ তোলে। চোখ দুটো টকটকে লাল। যেন জমাট রক্তপিণ্ড। সেই চোখ থেকে জল ঝরেই চলেছে। কান্নাজড়নো গলায়, পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে, সে তার সদ্য যুবতী মেয়েটাকে দেখিয়ে বলে, এই মাইয়াটার সোম্মান বাঁচানের লেইগা পাকিস্থান ছাইড়া ইণ্ডিয়ায় আইলাম। কিন্তু এইখানেও শকুনের পাল অরে ছিড়া খাওনের লেইগা জিভ্যা মেইলা রইছে। উই যে শুওরের ছাও ক্যাতরাইয়া (কেতরে) পইড়া রইছে– আঙুল বাড়িয়ে সেই লোকটাকে দেখিয়ে দিল সে। তারপর একটানা সে যা বলে যায় তা এইরকম।
কদিন ধরে লোকটার নজর এসে পড়েছে পতিতপাবনের মেয়ে শান্তির ওপর। দূরে দাঁড়িয়ে সে চোখের ইশারা করে। আড়ালে পেলে ফিস ফিস করে বলে, তার সঙ্গে গেলে রানীর হালে থাকতে পারবে। টাকাপয়সা গয়না আরাম, কোনও কিছুর অভাব থাকবে না।
লোকটা যখন যা বলেছে, তক্ষুনি শান্তি বাবাকে জানিয়ে দিয়েছে। পতিতপাবন তক্কে তক্কে ছিল। আজ লোকটা শান্তিকে যখন পকেট থেকে একগোছা নোট বার করে দেখাচ্ছে, সে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
পতিতপাবন বলতে লাগল, দ্যাশ থিকা একখান ঘষা পাহা লইয়া এইপারে আসতে পারি নাই। কয় শ’ট্যাকা, ইট্ট সোনারূপা লুকাইয়া চুরাইয়া আননের ব্যবস্তা করছিলাম। পাকিস্থানের পুলিশ বডারে বেবাক কাইড়া নিছে। হাত এক্কেরে খালি। দুই ব্যালা (বেলা) এইখানে খিচোড়ি দ্যায়। হের পর যদিন খিদা পায় কিছু যে কিন্যা খামু, উপায় নাই। এক কাপড়ে পলাইয়া আইছি। পিন্ধনের (পরনের শাড়ি উড়ি কিন্যা দিতে পারি না। এই দিকে শয়তানের ছাওরা বস্যের মাইয়াগো (যুবতীদের) ফুসলানের লেইগা চাইর দিকে ঘুরতে আছে। কয়দিন আমি তাগো ঠেকাইয়া রাখতে পারুম? একদিন ণা একদিন অরা শান্তিরে ঠিক তুইলা লইয়া যাইব।
পতিতপাবন আরও জানায়, তারা মাত্র কয়েকদিন হল এখানে এসেছে। এর মধ্যেই ক’টি যুবতী মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না। হাওয়ায় হাওয়ায় একটা খবর ভেসে বেড়াচ্ছে। যারা মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করে তাদের আড়কাঠিরা আণ্ডিল আণ্ডিল টাকা নিয়ে এখানে অষ্টপ্রহর ঘোরাঘুরি করছে। সুযোগ পেলেই একটা দুটো করে মেয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
পতিতপাবন থামে না, ডরে আমার বুক থরথরাইয়া কাপে। রাইতে ঘুমাইতে পারি না। কিন্তুক কয়দিন শান্তিরে আমি পরি (পাহারা) দিয়া রাখুম? শিয়ালদার ইস্টিশানে থাকলে মইরাই যামু বিনুভাই– সে একেবারে ভেঙে পড়ে। ভয়ে, আতঙ্কে, তীব্র হতাশায়।
যুগল এতক্ষণ নীরবে শুনে যাচ্ছিল। এবার বলল, পতিতদাদা, আপনেরে এইখানে থাকতে হইব। আমাগো লগে চলেন।
বিহ্বলের মতো পতিতপাবন জিজ্ঞেস করে, কুনখানে যামু তোগো লগে?
