অবনীমোহন ওধার থেকে বললেন, এখানকার মানুষজন বড় ভাল।
আবেগময় সুরে হেমনাথ উত্তর দিলেন, সত্যিই ভাল অবনীমোহন–
এরপর ইলিশ মাছ নিয়ে কিছুক্ষণ উচ্ছ্বসিত আলোচনা চলল। আট আনায় পাঁচটা বড় বড় ইলিশ, তার ওপর একটা ফাউ। অবনীমোহন ভাবলেন, এ যেন এক স্বপ্নের দেশ।
.
একসময় স্টিমারঘাট, সারি সারি সেই মিষ্টির দোকান, খোয়া বাঁধানো পথ আর নদীটা পেছনে ফেলে সেই কাঠের পুলটার কাছে এসে পড়ল বিনুরা। ঠিক সেই সময় শোনা গেল, হেম—হেম– পেছন থেকে কে যেন খুব চেঁচিয়ে ডাকাডাকি করছে।
হেম নিশ্চয়ই হেমনাথ। তাঁকে যিনি নাম ধরে ডাকতে পারেন, হয় তিনি বন্ধুস্থানীয়, নতুবা গুরুজন টুরুজন হবেন।
সবাই একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল। আর ঘুরতেই বিনু দেখতে পেল, দূরে পথের বাঁকে কালকের সেই জারাজীর্ণ দুর্বল ঘোড়াটা তার চাইতেও পুরনো ভাঙাচোরা গাড়িটাকে টেনে নিয়ে আসছে। কালকের সেই কোচোয়ানটাকে দেখা যাচ্ছে না, চালকের জায়গায় ধবধবে সাদা একটি মানুষ বসে আছেন।
নিশ্চয়ই লালমোহন, অর্থাৎ ডেভিড লারমোর। তিনি ছাড়া রাজদিয়ায় সাহেব আর কে আছে? কাল এঁর কথা অনেক শুনেছে বিনু। যৌবনের মধ্যদিনে সুদূর আয়ার্ল্যান্ড থেকে পূর্ব বাংলার এই প্রান্তে এসেছিলেন, তারপর কয়েক যুগ কেটে গেছে। তাকে সামনাসামনি দেখবার জন্য বিনুর ছোট্ট হৃৎপিন্ড যেন লাফাতে লাগল।
কিছুক্ষণের ভেতর ফিটনটা কাছে এসে থামল। কোচায়ানের সিট থেকে একরকম লাফ দিয়েই নেমে এলেন লারমোর।
হেমনাথ বললেন, বয়স কত হল হে?
লারমোর হেসে বললেন, তোমার চাইতে গুনে গুনে চার বছরের বড়।
কিন্তু যেভাবে নামলে তাতে তিরিশ বছরের ছোট বলে মনে হচ্ছে। বুড়ো হাড়ে একবার চোট লাগলে দেখতে হবে না। ছ’মাসের জন্যে বিছানা নিতে হবে।
তাচ্ছিল্যভরে লারমোর বললেন, কিচ্ছু হবে না।
দু’চোখে অসীম বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল বিনু। লালমোহনের চুল, ঘন জোড়া ভুরু, গায়ের রং, ঋষিদের মতো লম্বা দাড়ি সব কিছু দুধের মতো সাদা। ভুরুর তলায় স্বচ্ছ জলে আলোর নাচনের মতো দু’টি স্নিগ্ধ চোখ। পিঠ সামনের দিকে একটু নুয়ে পড়েছে। গা-ময় এত কুঞ্চন যাতে চামড়া সোনার জালি জালি মনে হয়। পরনে ধুতি আর কামিজ, পায়ে লাল কাপড়ের জুতো। গলায় কালো কারে রুপোর ক্রশ ঝুলছে।
বড়দিনে কলকাতার সাহেবপাড়ায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রচুর আলো টালো দিয়ে ‘ক্রিসমাস ট্রি’ সাজায়। তার সঙ্গে ধবধবে দাড়িওলা এক বুড়োও থাকে। বিনু বুড়োর নামটা মনে করতে পারল সান্টা ক্লজ। পোশাকটুকু বাদ দিলে লারমোর যেন অবিকল সান্টা ক্লজ।
হেমনাথ বললেন, এস, পরিচয় করিয়ে দিই–
লারমোর বললেন, তোমার আর কষ্ট করতে হবে না, ওটা আমিই পারব। বলে অবনীমোহনের দিকে ফিরলেন, তুমি নিশ্চয়ই আমাদের জামাই। সুধা-সুনীতি-বিনুকে বললেন, আর তোমরা অবশ্যই দাদাভাই দিদিভাই। তোমাদের নাম তো জানি না। নামগুলো বল–
অবনীমোহনের হঠাৎ কী হয়ে গেল, ঋষির মতো দেখতে এই বয়স্ক বিদেশি মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। দেখাদেখি সুধা-সুনীতি-বিনুও প্রণাম করল। তারপর একে একে সবাই নিজের নিজের নাম বলল।
সবাইকে আশীর্বাদ করে লারমোর অবনীমোহনের উদ্দেশে বললেন, কাল স্টিমারঘাটে তোমাদের আনতে যেতে পারি নি। বিশেষ দরকারে হাটে গিয়েছিলাম–
অবনীমোহন বললেন, মামাবাবু সে কথা বলেছেন।
কাল হাট থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। আজ সকালে উঠেই চলে আসব ভেবেছিলাম। তখনও কতকগুলো ঝঞ্জাট এসে জুটল। সব মিটিয়ে বেরুতে বেরুতে দুপুর হয়ে গেল। ভাল কথা, রমু কোথায়? তাকে তো দেখছি না।
হেমনাথ বললেন, সে বাড়িতে আছে।
লারমোর শুধোলেন, তোমরা গিয়েছিলে কোথায়?
রাজদিয়া শহরটা ওদের একটু ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলাম।
লারমোর এবার অবনীমোহনকে সাক্ষী মানলেন, শোন তোমার মামাশ্বশুরের কথা। আমি গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমেছি বলে তো খুব উপদেশ ঝাড়া হল। আর উনি যে বুড়ো হাড়ে মাইল মাইল হেঁটে এলেন, তার বেলা?
সবাই হাসতে লাগল। লারমোর আর হেমনাথের ভেতর বন্ধুত্বটা যে কতখানি নির্মল, স্বচ্ছ আর প্রীতিপূর্ণ তা যেন অনায়াসে টের পাওয়া যাচ্ছে।
বিব্রত মুখে হেমনাথ বললেন, লাফানো আর হাঁটা–কিসে আর কিসে! সে যাক গে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর একটা কথাও নয়।
লারমোর কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই হেমনাথের হাতে ইলিশ মাছগুলো দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে সারা মুখে হাসির ছটা ঝলমলিয়ে উঠল। উচ্ছ্বসিত খুশির গলায় তিনি বললেন, নজর পড়েছে তা হলে–
ঢের আগেই পড়া উচিত ছিল। পেটিগুলো সর্ষে দিয়ে ভাতে দিলে যা হয় না–একেবারে হেভেন। চোখ বুজে বুঝিবা স্বর্গসুখটা কল্পনা করতে লাগলেন লারমোর।
ভুরু কুঁচকে হেমনাথ বললেন, এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে বোধহয় পেটিগুলো ভাতে দেওয়া যাবে। সেজন্যে বাড়ি যাওয়া দরকার।
লারমোর ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, সবাই গাড়িতে ওঠ। বলে নিজেই ফিটনের দরজা খুলে দিলেন।
অবনীমোহন হেমনাথ সুধা আর সুনীতি উঠতেই দেখা গেল, গাড়িতে আর জায়গা নেই। লারমোর বললেন, বিনুদাদা কোচোয়ানের সিটে আমার পাশে বসে যাবে।
পাশাপাশি যেতে যেতে বার বার মুখ তুলে লারমোরকে দেখতে লাগল বিনু। চোখাচোখি হলে অবশ্য মুখটা সরিয়ে নিচ্ছে।
