কদিন আগে ঢাকা মেল থেকে বিনুরা যখন নামে, শিয়ালদা স্টেশনের চেহারা যেমন ছিল, আজও তার হেরফের নেই। তবে মানুষ আরও বেড়েছে। সীমান্তের ওধার থেকে যারা আসছে তাদের রিলিফ ক্যাম্পগুলোতে দ্রুত পাঠাবার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। আসলে রোজ ঢাকা বরিশাল খুলনা ফরিদপুর, অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের নানা প্রান্ত থেকে রিফিউজি স্পেশালগুলো যত উদ্বাস্তু এনে শিয়ালদায় ঢেলে দিচ্ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তত ত্রাণশিবির খোলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিয়ালদা স্টেশনেই তাদের গাদাগাদি করে থেকে যেতে হচ্ছে। এই ভিড় সরাতে কত কাল লাগবে, কে জানে।
স্টেশনের ভেতরে এবং বাইরে লোক গিজ গিজ করছে। ইটের দশ বার ইঞ্চি উঁচু বাউণ্ডারি ওয়াল তুলে পনের কুড়ি স্কোয়ার ফিটের মধ্যে একেকটা উদ্বাস্তু ফ্যামিলি। ওই জায়গাটুকুর মধ্যে পাঁচ ছ’ কি সাতজনের অস্থায়ী বাসস্থান।
চারপাশের ভিড়ে যেদিকে তাকানো যাক, শুধুই ধুন্ধুমার কাণ্ড তুমুল চিৎকার, হইচই, কদর্য খিস্তিখেউড়, কুৎসিত ঝগড়াঝাটি।
এধারে ওধারে নানা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের ফেস্টুন টাঙানো। তারা আলাদা আলাদা ভাবে তিনশ’ কি চারশ’জন উদ্বাস্তুর খাওয়াবার দায়িত্ব নিয়েছে। চত্বরের নানা এলাকায় কাঠ কি কয়লার উনুনে খিচুড়ি ফুটছিল। বেশ কটা বিশাল সরকারি লঙ্গরখানাও ভোলা হয়েছে। যে লঙ্গরখানাগুলোতে রান্না শেষ, সেখানে সেখানে উদ্বাস্তুদের লম্বা লাইন। সবার হাতে সিলভার কি কাঁসার থালা, বাটি কি সরা। যার যা আছে তাই নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। লাইনে দাঁড়িয়েও কি শান্তি আছে? পাছে খিচুড়ি ফুরিয়ে যায় তাই সবাই চাইছে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে। কিন্তু আগে যে রয়েছে সে জায়গা দেবে কেন? এই নিয়ে ধাক্কাধাক্কি, এমনকি হাতাহাতি পর্যন্ত শুরু হয়ে গেছে।
ভিড় ঠেলে এগুতে এগুতে যুগল চেঁচাতে থাকে, রাইজদা, ইনামগুঞ্জ, গিরিগুঞ্জ, দেলভোগ, তাজপুর, রসুইনা, কমলাঘাট থিকা কেও আইছেন? আইসা থাকলে সুমৈর (সাড়া) দ্যান– একই কথা সে সমানে বলে যেতে থাকে। ছেদহীন। একটানা।
কেউ সাড়া দিচ্ছে না। সবার লক্ষ্য এখন লঙ্গরখানার খিচুড়ি। বিশ্ব সংসারের অন্য কোনও শব্দ তাদের কানে ঢুকছে না।
যুগলের উদ্যমের শেষ নেই। শিয়ালদা স্টেশনের বিশাল এলাকায় চক্কর দিতে দিতে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পরিচিত মানুষজনকে খুঁজে বেড়াতে লাগল সে।
হঠাৎ পতিতপাবনের কথা মনে পড়ে যায় বিনুর। হাঁটা থামিয়ে ব্যস্তভাবে সে বলে, আমাদের রাজদিয়া এলাকার একটা ফ্যামিলি এখানে আছে। যেদিন দেশ থেকে এলাম, ওদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। যদি রিফিউজি ক্যাম্পে না গিয়ে থাকে, তাদের নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।
যুগল জিজ্ঞেস করে, কাগো কথা কন ছুটোবাধু?
পতিতপাবনদের। আমার সঙ্গে ও রাজদিয়া স্কুলে পড়ত।
আমি হেরে (তাকে) চিনি। চলেন, ওনাগো বিচরাইয়া বাইর করি।
উদ্দীপনায় চোখমুখ জ্বল জ্বল করতে থাকে যুগলের। এই বিপুল জনসমুদ্রের মধ্যে আজ একজন অন্তত চেনা মানুষের খবর পাওয়া গেছে। একজনই বা কম কী।
সেদিন পতিতপাবনের সঙ্গে যখন দেখা হয়, সবে ঢাকা মেল থেকে শিয়ালদায় নেমেছে বিনুরা। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, ক্ষুধার্ত, এবং দিশেহারাও। তখন এই প্রায়-অচেনা শহরে অবনীমোহনের ঠিকানা খুঁজে বার করার জন্য প্রবল উৎকণ্ঠা ছিল। স্টেশন চত্বরের কোন প্রান্তে পতিতপাবনদের সেদিন দেখেছে, ভাবতে চেষ্টা করল বিনু।
এদিকে যুগলের তর সইছিল না। সে তাড়া লাগায়, কী হইল ছুটোবাবু, খাড়ইয়া রইলেন ক্যান?
স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে বিনুর মনে পড়ে যায়। খোলা চত্বরের যেদিকটায় সওয়ারির আশায় ঘোড়ার গাড়িগুলো সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারই কাছাকাছি ছিল ইট দিয়ে ঘেরা পতিতপাবনদের আস্তানা।
বিনু বলল, না না, চল–
ঘোড়ার গাড়ির স্ট্যাণ্ডটার কাছে এসে চমকে উঠল বিনু। শিয়ালদার হট্টগোল এবং ধুন্ধুমার ছাপিয়ে এখানে কী এক তুলকালাম চলছে।
পতিতপাবনদের সঙ্গে সেদিন যেখানে দেখা হয়েছিল সেই জায়গাটা ঘিরে এখন চাপ-বাঁধা ভিড়। বৃত্তাকারে ঠাসাঠাসি করে প্রচুর লোক দাঁড়িয়ে কী যেন দেখছে। বৃত্তের ভেতর গলার শিরা ছিঁড়ে কেউ সমানে চিৎকার করিছল। সেই সঙ্গে তার মুখ থেকে ঢলের মতো বেরিয়ে আসছে কদর্য খিস্তি। বাছা বাছা, নোংরা সব গালাগাল। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরও অনেকে চেঁচাচ্ছে।
ভিড়ের বাইরে থেকে কী হচ্ছে, দেখা না গেলেও সবচেয়ে চড়া গলাটা চেনা গেল। পতিতপাবন।
বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে বিনুর। ধারেকাছে লঙ্গরখানার লাইন নেই যে আগে গিয়ে দাঁড়াবার জন্য মহাযুদ্ধ বেধে যাবে। তা হলে কী হতে পারে? বিনু জানে, পতিতপাবন ভীষণ রগচটা। হঠাৎ সে এমন খেপে উঠেছে কেন?
বিনু ধাক্কা দিতে দিতে ভিড় সরিয়ে তড়িৎগতিতে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
কই যান ছুটোবাবু, কই যান? অবাক যুগল হইচই করতে করতে বিনুর পেছন পেছন চলে আসে।
যে দৃশ্যটি এবার চোখে পড়ল তাতে কয়েক লহমা হতবাক হয়ে থাকে বিনু। পতিতপাবন শরীরের সবটুকু জোর দিয়ে একটা লোকের টুটি টিপে ধরে আছে। প্রচণ্ড রাগে উন্মাদ। সমস্ত রক্ত মাথায় গিয়ে চড়েছে তার। কয়েকদিনের না কামানো মুখ কী হিংস্ৰই না দেখাচ্ছে। রুক্ষ, জটপাকানো চুল উড়ছে হাওয়ায়। চোয়াল শক্ত। চোখ দুটো জ্বলছে। সমানে গজরাচ্ছে সে, খানকির বাচ্চা, পুঙ্গির পুত, তরে আমি আইজ যমের দুয়ার দেখাইয়া ছাড়ুম। ঘরে তর মা নাই, বইন নাই? লুচ্চা, বাইনচোত, তরে শ্যাষ কইরা যদি জেল হয় ফাঁসি হয়, হউক–
