হিরণ বলল, চার পাঁচদিন নয়, আজ যাচ্ছে। কালকের দিনটা থেকে পরশু বিনু চলে আসবে। ওকে আর আটকে রাখবে না। ওর এখানে অনেক কাজ।
যুগল বলল, আইচ্ছা আইচ্ছা, আগে তো ছুটোবাবু যাউক। হের (তার) পর দেখা যাইব।
বিনু লক্ষ করল, মুকুন্দপুরে গিয়ে তার দু’একদিন থেকে আসার ব্যাপারে এতটুকু আপত্তি করে নি ঝিনুক। রাজদিয়ায় রাজেকের নৌকোয় ওঠার পর থেকে এক লহমাও তাকে কাছছাড়া করতে চাইত না সে। কিছুক্ষণের জন্য বিনু কোথাও গেলে কেঁদেকেটে জগৎ সংসার তোলপাড় করে ফেলত। বিনুই তখন তার একমাত্র ভরসা। একমাত্র অবলম্বন। তাকে বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার কথা ভাবতে পারত না মেয়েটা। মনে হত, দিকদিশাহীন, অথৈ সমুদ্রে ভেসে যাবে।
কিন্তু সুধাদের কাছে এসে পায়ের তলায় শক্ত জমির স্পর্শ পেয়েছে ঝিনুক। এখানে সে নিরাপদ। বিঘহীন। সমস্ত দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত। দু’তিন দিন কেন, বিনু যদি পুরো একটি সপ্তাহও মুকুন্দপুরে কাটিয়ে আসে, সে বাধা দেবে না। বিনুকে ছাড়াও দুই ডানায় তাকে ঘিরে রাখার মতো আরও দু’জনকে সে পেয়ে গেছে। সুধা আর হিরণ।
৩.৩১-৩৫ দু’আড়াই বছর কলকাতায়
৩.৩১
দু’আড়াই বছর কলকাতায় এবং তার আশেপাশে থেকে এই বিশাল শহরের রাস্তাঘাট সম্পর্কে যথেষ্ট সড়গড় হয়ে উঠেছে যুগল। কত নম্বর বাস বা ট্রাম কোন কোন রুটে চলে, সব তার মুখস্থ।
এখন ভরদুপুর। বাসে ভিড় ছিল না। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু প্যাসেঞ্জার এধারে ওধারে বসে আছে।
বিনু জানালার ধার ঘেঁষে বসেছিল। যে মনিবের বাড়িতে কামলা খেটেছে, তার নাতির পাশে গা ঠেকিয়ে বসতে ভীষণ কুণ্ঠা হচ্ছিল যুগলের। প্রায় ধমক দিয়ে বসিয়ে দিয়েছে বিনু।
টিকিস ঢিকিস করে বাস চলেছে। সারা গায়ে আলস্য জড়ানো। যেন কোথাও সেটার যাবার তাড়া নেই।
একেকটা স্টপেজ আসে, পাদানিতে দাঁড়িয়ে খসখসে, চেরা গলায় কনডাক্টর চেঁচিয়ে যায়, মুদিয়ালি, কালীঘাট, হাজরা, ভবানীপুর, ধম্মোতলা–খালি গাড়ি, খালি গাড়ি
যতখানি সম্ভব স্পর্শ বাঁচিয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে যুগল।
বিনু জিজ্ঞেস করল, বেশ কিছুদিন তো এখানে কাটালে। কেমন লাগছে?
যুগল বলে, ভালা না ছুটোবাবু। পদ্মা নাই, ম্যাঘনা নাই, ধলেশ্বরী নাই, কালাবদর নাই, আইড়ল খা নাই– এইটা একটা দ্যাশ হইল! রুখাশুখা মাটি। কইলকাতার কিনার দিয়া বড় একখান খাল চইলা গ্যাছে। হেইটার নাম গঙ্গা। এই নিকি নদী! শুইনা আমি আটাস (অবাক)। ইচ্ছা হয়, এই পারের মানুষগুলার ঘেটি ধইরা উইপারে লইয়া গিয়া দেখাই নদী কারে কয়। পদ্ম-ম্যাঘনা দেখলে সুমুন্দির পুতেরা ভিরমি খাইব।
বিনু হাসে।
যুগল থামে নি, জবর জবর নদী না থাকলে কি সুখ হয় ছুটোবাবু?
বিনু জানে, বিশাল বিশাল খাল, বিল, নদী ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না যুগল। পূর্ব বাংলার শতদিকে ছড়িয়ে পড়া শত জলধারা তার রক্তের ভেতর মিশে আছে। আজন্ম।
যুগলের অভিযোগের তালিকা অফুরন্ত। সে একনাগাড়ে বলে যায়, হের (তার) পর মাছের কথাই ধরেন। ভাগনা টাটকিনি সুবর্ণ খউরকা (সুবর্ণ খড়কে), খলা বইচা কাঁচকি বজুরি ট্যাংরা, ভাল জাতের চাইপলা (চাপিলা), বড় বড় বাইন। এইখানের মাইনষে বাপের জন্মে এই হগল মাছের নামও শোনে নাই। চৌখেও দ্যাখে নাই। থাকনের মইদ্যে রুইত, মিরগ্যাল (মৃগেল), কাতলা, ইচা (চিংড়ি), ভ্যাকট (ভেটকি), পাইশ্যা (পার্শে), আর লোনা জলের মাছ।
বিনু হাসতে থাকে।
যুগল বলে যায়, নানা কিসিমের মাছ থাকব, জবর জবর নদী থাকব, হাওর থাকব। তয় না একখান দ্যাশ!
বোঝা যায়, দেশভাগের পর সীমান্তের এপারে এসে যুগলের আক্ষেপের শেষ নেই।
ধর্মতলায় পৌঁছে গেল বিরা। সেখানে নেমে অন্য একটা বাস ধরে শিয়ালদায় তাকে নিয়ে এল যুগল। এখান থেকে ট্রেনে আগরপাড়া যেতে হবে। তারপর পায়ে হেঁটে কিংবা সাইকেল রিকশায় মুকুন্দপুর।
শিয়ালদায় পৌঁছতেই যুগলের সেই কথাটা মনে পড়ে গেল বিনুর। জিজ্ঞেস করল, তখন বললে, রাস্তায় তোমার কী কাজ আছে। ভুলে গেছ নাকি?
যুগল বলে, ভুলি নাই। কামটা আমার এই শিয়ালদার ইস্টিশনে। কী কাজ সেটা বিস্তারিত বুঝিয়ে দিল। আগে প্রায় রোজই মুকুন্দপুর থেকে শিয়ালদায় টহল দিয়ে যেত। পায়ে চোট খাওয়ার পর এখন সপ্তাহে একদিনই আসতে পারে। ফি বেস্পতিবার হাসপাতালে পা ড্রেস করাতে তাকে ছুটতে হয় বহু দূরে লেকের ধারে। সকালের দিকে ভীষণ তাড়াহুড়ো থাকে। সাড়ে ন’টার ভেতর ণা পৌঁছলে ডাক্তারের দেখা পাওয়া যাবে না। মুকুন্দপুর থেকে এতটা ছোটাছুটিই সার। তবে পা ড্রেস করিয়ে ফেরার সময় তার হাতে অঢেল সময়। তখন সে আতিপাতি করে শিয়ালদা সাউথ আর মেনের সব প্ল্যাটফর্ম এবং বাইরের চত্বরে অগুনতি উদ্বাস্তুর ভিড়ে রাজদিয়া এলাকার এবং তার শ্বশুরবাড়ি ভাটির দেশের চেনাজানা মানুষজন খুঁজে বেড়ায়। তাদের কাউকে পেলে মুকুন্দপুরে টেনে নিয়ে যায়।
যুগল বলল, চিনাজানা আত্মজন একলগে থাকলে মনের বল বাড়ে। আমার পরানে একখান সাধ আছে ছুটোবাবু।
বিনু উৎসুক চোখে তাকায়, কী সাধ?
যুগল বলে, মুকুন্দপুররে একখান রাইজদা কি ভাটির দ্যাশ বানামু। ততখানি বাহারের হইব। তভু যতখানি পারন যায়।
অভিভূতের মতো তাকিয়েই থাকে বিনু। অক্ষরপরিচয়হীন এই যুবক কী আশ্চর্য রকমের স্বপ্নদর্শী। পূর্ব বাংলার এক রমণীয় ভূখণ্ডকে সে সীমান্তের এপারে নতুন করে নির্মাণ করতে চায়।
