ঝিনুকই শুধু নয়, হিরণ আর সুধাও হাসছিল। তারা হাসতেই থাকে।
যুগল বলল, ঝিনুক বইনের লগে দেখা হইয়া গেল। এইবার পরের কথাখান কই ছুটোবাবু–
বিনু জিজ্ঞেস করল, কী কথা?
আমার লগে আইজ আপনেরে আর ঝিনুক বইনেরে মুকুন্দপুরে লইয়া যামু। উদ্দীপ্ত মুখে যুগল বলতে লাগল, আমাগো উইখানের মানুষজন আপনেগো দ্যাখনের লেইগা পথের দিকে তাকাইয়া আছে।
বিনুর মনে পড়ল, আগের বেস্পতিবার তাকে মুকুন্দপুরে নিয়ে যাবার কথা বলেছিল যুগল। কিন্তু সেটা যে আজই, ভাবতে পারে নি। বলল, এত তাড়াহুড়ো কেন? এখন তো আমরা কলকাতায় থাকছিই। অন্য একদিন যাব।
যুগল ব্যগ্রভাবে বলল, অন্য দিন না। আইজই যাইবেন। পাখি মাথার কিরা (দিব্যি) দিয়া কইয়া দিছে, আপনেগো দুইজনেরে লইয়া যাইতে হইব। আপনেরা না গ্যালে আমার ঘেটিতে (ঘাড়ে) মাথাখান থাকব না।
পাখি যুগলের বউ। ওদের বিয়েতে কী ধুমধামই না হয়েছিল! রাজদিয়াবাসীরা, হিন্দুই হোক কি মুসলমান, সবাই তিনদিন হেমনাথের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেয়েছে। সকাল দুপুর বিকেল রাত্রি, চারবেলা করে।
যুগল থামে নি, হেয়া (তা) ছাড়া, আমাগো রাইজদা আর চাইরপাশের গেরামগুলা থিকা কত মানুষ মুকুন্দপুরে গিয়া উঠছে। তাগো নৈরাশ কইরেন না ছুটোবাবু’ একটু ভেবে তক্ষুনি আবার শুরু করে, নিশিকান্ত আচায্যির কথা মনে আছে? তাজপুরে তেনাগো বাড়ি আছিল।
রাজদিয়ার দক্ষিণ দিকে তিনখানা গ্রামের পর তাজপুর। নিশিকান্ত আচার্যকে বেশ কয়েক বার হেমনাথের কাছে যাতায়াত করতে দেখেছে বিনু। যখন আসত তার সঙ্গে সামান্য দু’একটা কথা বলত। ব্যস, এই পর্যন্ত। তার সম্বন্ধে এর বেশি কিছু মনে নেই।
হঠাৎ এত মানুষ থাকতে আলাদা করে নিশিকান্ত আচার্যর কথা কেন তুলল, জিজ্ঞেস করায় যুগল বলে, পাখি আপনেগো দুইজনের খাওনের লেইগা চাউল তরিতরকারি মাছ ডাইল তেনাগো কাছে দিয়া আসছে। ওনারা বামন (ব্রাহ্মণ)। আপনেগো লেইগা রাইন্ধা (বেঁধে) দিব।
পাছে তাদের হাতে না খায় সেজন্য ব্রাহ্মণদের দিয়ে রান্নার ব্যবস্থা করেছে যুগলরা। শুনেই মাথার ভেতরটা তপ্ত হয়ে ওঠে বিনুর। গলার স্বর চড়িয়ে বলে, তোমার কী করে মনে হল, তোমরা বেঁধে দিলে আমরা খাব না?
উচা জাইতের মাইনষে আমাগো ছুয়া খায় না। হেইর লেইগা– বলতে বলতে যুগলের সারা মুখে হাজার বাতি জ্বলে উঠল, খাইবেন আমাগো হাতে ছোটবাবু! সত্যই খাইবেন!
খাব, খাব, খাব। আমি তোমাদের হেমকর্তার নাতি। তিনি সবার বাড়িতে খেতেন। জাতপাত মানতেন না। আমিও মানি না। কিন্তু আজ আমাদের মুকুন্দপুরে না গেলেই ভাল হয়।
যুগল সব আপত্তি খারিজ করে দিল। তার মধ্যে এমন এক ব্যগ্রতা, সারল্য আর আন্তরিকতা রয়েছে যে শেষ পর্যন্ত বিনুকে রাজি হতেই হল। যুগলের বিশ্বাস, তার এই ছোটবাবুটির ওপর সে জোর খাটাতেই পারে। যাকে একদিন পূর্ব বাংলার খালে বিলে নদীতে এবং নানা ভূখণ্ডে ঘুরিয়ে। ঘুরিয়ে ফুল ফল এবং নানা ধরনের বৃক্ষলতা চিনিয়েছে, দিয়েছে জলতলের অপার রহস্যের সন্ধান তার ওপর যুগলের দাবি অফুরান।
তবে ঝিনুককে কোনও মতেই রাজি করানো গেল না। যুগলের কাছে তার যাবতীয় আড়ষ্টতা আর সঙ্কোচ কেটে গিয়েছিল। কিন্তু সে জেনে গেছে, মুকুন্দপুরে রাজদিয়া এবং তার চারপাশের অনেকে জমি দখল করে বসেছে। এরা সবাই তার চেনা। এই লোকগুলো কি আর ঢাকার সেই ঘটনার খবর পায় নি? তাকে দেখলে ওরা কী করে বা বলে বসবে, কে জানে। পরিচিত মানুষজনের কাছে সে আদৌ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।
যুগল বলল, আমার আশাখান আধাআধি পূরণ হইল। তয় (তবে) ঝিনুক বইন, একদিন না একদিন আমি তোমারে মুকুন্দপুরে লইয়া যামুই।
ঝিনুক হাসল, উত্তর দিল না।
যুগল সুধাকে বলল, এটু তরাতরি বাইর হমু ছুটোদিদি। আপনের রান্ধন (রান্নার) কত দূর?
সুধা বলল, হয়ে এসেছে। কেন?
যা হইছে হেই দিয়া দ্যান। মুকুন্দপুর কাছে পিঠে না। যাইতে সোময় লাগে। হেয়া (তা) ছাড়া পথে একখান কাম সারতে হইব।
খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে কাপড়ের ঝোলায় বাড়তি দু’একটা জামাকাপড় এবং টুকিটাকি জিনিস ভরে যুগলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল বিনু।
হিরণ বলল, তোমাদের ছোটবাবুকে বেশি দিন আটকে রেখো না কিন্তু।
যুগল সবেগে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, না না, বড় জোর চাইর পাঁচদিন। হের (তার) পর আমি নিজে লগে কইরা দিয়া যামু।
হিরণের মাথায় পর পর নানা চিন্তা উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে। চাকরির ব্যাপারে বিনুর দরখাস্ত লেখা হয় নি। সেটা তাড়াতাড়ি লিখে জমা দেওয়া দরকার। অবনীমোহনের ফেরার সময় হয়ে এসেছে। বিনুকে সঙ্গে করে ভবানীপুরে গিয়ে একবার তার খোঁজ নিয়ে আসতে হবে। তাছাড়া, এ ক’দিন সারা কলকাতায় প্রচুর ঘোরাঘুরি করা হয়েছে। অঢেল আনন্দ। প্রচণ্ড হই হই। এবার তাকে দিয়ে একটা কাজ করিয়ে নিতে হবে। দেশের বাড়ির সঙ্গে শওকত আলিদের এক্সচেঞ্জ করার ব্যাপারে সুধার এখনও প্রবল আপত্তি। সে একেবারে ঘাড় বাঁকিয়ে রেখেছে। যে পরিবেশে, যে আবহাওয়ায় সুধা বড় হয়ে উঠেছে, তার মধ্যে কোনও রকম সংস্কার থাকার কথা নয়। কিন্তু কার ভেতর কী। যে থেকে যায়! হিরণের ইচ্ছা, বিনুকে দিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এক্সচেঞ্জের ব্যাপারে সুধাকে রাজি করাবে। সেটা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই ভাল।
