আমি তো সেদিনই আপনাকে বললাম, তারপশায় আসার সময় দাঙ্গাবাজরা নৌকো থেকে সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। তার ভেতর আমার ডিগ্রিটিগ্রিও ছিল।
হঠাৎ ভীষণ হতাশ হয়ে পড়ে হিরণ। মনে পড়ল, ডিগ্রিগুলো খোয়া যাবার কথা বিনু তাকে জানিয়েছিল। তার খেয়াল ছিল না। বলল, সর্বনাশ। ওগুলো ছাড়া চাকরি হবে কী করে?
সব উৎসাহ নিমেষে বিলীন। পাংশু মুখে বসে থাকে বিনু।
খানিক ভেবে হিরণ বলে, একটা উপায় অবশ্য আছে। রাজদিয়া কলেজের প্রিন্সিপ্যাল যদি লিখে দেন তুমি ওখান থেকে বি. এ পাস করেছ, কাজ হতে পারে। ইস, নিত্য দাস হেমদাদুর চিঠি লিখিয়ে নিয়ে গেল। তখন আমার একেবারেই খেয়াল হয় নি। চিঠিতে এই সমস্যার কথাটা লিখে দিলে হেমদাদু প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে দেখা করে ব্যবস্থা করতে পারতেন। ভীষণ ভুল হয়ে গেছে।
বিনু উত্তর দিল না।
কী যেন চিন্তা করে হিরণ। চকিতে আলোর একটা সংকেত চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে যায়। ইন্টারভিউতে ডাকতে অনেক দেরি। তুমি একটা দরখাস্ত তো করে দাও। তার মধ্যে নিত্য দাস হেমদাদুর জবাব নিয়ে আসবে। তখন তাকে আরেকখানা চিঠি লিখে দেওয়া যাবে। প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করে তিনি যেন সব ব্যবস্থা করেন।
নিচের বাগান থেকে যুগলের গলা ভেসে এল, ছুটোদিদি, ছুটো জামাইবাবু, দরজা খুইলা দ্যান– সেই সঙ্গে কড়া নাড়ার খটখটানি।
হিরণ বলল, যুগল এসে গেছে। উমাকে ডেকে একতলায় পাঠিয়ে দিল সে।
খানিক পরে উমার সঙ্গে দোতলায় উঠে এল যুগল। মেঝেতে ঝুপ করে বসে বিনুকে দেখে খুশিতে সারা মুখ জুড়ে হাসল, আপনের কথাই ভাবতে ভাবতে আসতে আছিলাম ছুটোবাবু।
বিনু লক্ষ করেছে, বসার জন্য সেদিনের মতো কষ্ট করতে হয় নি যুগলকে। ঊরুর ব্যান্ডেজটাও বেশ ছোট। ব্যাথাটাও মনে হচ্ছে, অনেক কমে গেছে।
বিনু বলল, আমরাও তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। ছোটদি আর হিরণদার মুখে শুনেছি, তুমি অন্য বেস্পতিবার দুপুরের আগে আসো না। আজ এত তাড়াতাড়ি যে?
হাসপাতালে আইজ তরাতরি হইয়া গেল। ঘাওখান (ঘাটা) শুকাইয়া আসছে। ডাক্তারে কইছে আর দুই বিষুদবার দেইখা পায়ের পট্টি (ব্যান্ডেজ) খুইলা দিব।
খুব ভাল খবর। তোমাদের মুকুন্দপুরের কী অবস্থা?
একই। জমিনের দখল কি এত সহজে মিলে? জমিদারের লগে কতকাল লইড়া যাইতে হইব, ক্যাঠা জানে। যুগল বলতে লাগল, উই হগল কথা থাউক। আইজ মনে মেলা আশা নিয়া আসছি। একে একে কই। বড়দিদির বাড়ি থিকা ঝিনুক বইনেরে নিয়া আসছেন?
বিনু বলল, হ্যাঁ। নিয়ে আসব যে, সেদিনই তো তোমাকে বলেছি।
যুগল প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, কই হেয় (সে)?
রান্নাঘরে, ছোটদির সঙ্গে কী যেন করছে—
অহনই ডাইকা আনেন। দুই জনেরেই।
বিনু ভেতরে চলে গেল। ঝিনুক কিছুতেই আসবে না। যুগলের কাছে সঙ্কোচের কারণ নেই। প্রাণ গেলেও সে কোনও রকম ক্ষতি করবে না। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে বাইরের ঘরে নিয়ে এল বিনু। সঙ্গে সুধাও এসেছে।
আনন্দে দু’চোখ চিক চিক করতে থাকে যুগলের। বলে, উঃ, কত ডাঙ্গর (বড়) হইয়া গ্যাছ ঝিনুক বইন। বসো, বসো–
ঝিনুকের জন্য সারা বিশ্বব্রহ্মান্ডের যে কোনও পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে বিনু। কিন্তু ঝিনুকের মধ্যে তেমন সাহস নেই। চেনাজানা মানুষের সামনে সে ভীষণ গুটিয়ে যায়। আড়ষ্টের মতো একটা সোফায় নিঃশব্দে বসে পড়ল। নতমুখ। যুগলের দিকে সে তাকাতে পারছিল না।
যুগল পলকহীন ঝিনুককে দেখছিল। বলল, আমারে দেইখা অ্যামন লাজ (লজ্জা) ক্যান? আমি তোমাগো যুগইলা না? হেই ছুটোকালে তোমারে কতখানে লইয়া গ্যাছি, কত কী দেখাইছি, মনে পড়ে?
এক টানে স্মৃতির ঝাপি খুলে ফেলল যুগল। রাজদিয়ায় থাকতে তার কাছে ঝিনুক কত না আবদার করেছে! কত যে তার বায়না! আকাশ-উঁচু গাছের মাথা থেকে তাকে পেড়ে এনে দিতে হয়েছে। পাকা কাউফল। কখনও বিলিতি গাব। কখনও গহীন বেতঝোপের ভেতর থেকে থোকা থোকা বেথুন (বেতফল)। কখনও হলুদ-বর্ণ রোয়াইল, পাকা বরই, ডেউয়া, কামরাঙা। কখনও বা অথৈ জল থেকে তুলে আনতে হয়েছে শাপলা শালুক কি জলপদ্ম। ভাসানের পরদিন হেমনাথের সঙ্গে বাইচ দেখতে ঝিনুক যখন বড় গাঙে যেত, সেই নৌকো বেয়ে নিয়ে যেত কে? যুগল। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় যখন কাঠের পুতুল, জ্যান্ত টিয়াপাখি বা তিলা কদমা চিনির মঠ কিনতে যেত, সঙ্গে থাকত কে? যুগল।
ছোট ছোট কত ঘটনা। টুকরো টুকরো কত আনন্দের স্মৃতি। যুগল যেন লহমায় ঝিনুককে সারি সারি স্বপ্নদৃশ্যের ভেতর টেনে নিয়ে গেল। সরল, অকপট, ম্যারপ্যাঁচহীন এই যুবকটির স্বভাবে কোথায় যেন একটা ঝড়ো হাওয়া আছে। এক ঝাঁপটায় ঝিনুকের সব আড়ষ্টতা উধাও। শক্ত খোলার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে সে। পুরনো দিনের সুখস্মৃতি তাকে যেন শতদিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। যে সব ঘটনা যুগলের মনে পড়ে নি, সেগুলো মনে করিয়ে দেয়। মজার মজার কথায় হেসে। কুটিপাটি হতে থাকে। ঢাকায় তার চরম লাঞ্ছনার খবরটা যুগল জানে কিনা, সে সম্বন্ধে আর খেয়াল। থাকে না ঝিনুকের।
যুগল মাথা ঝাঁকিয়ে কঁকিয়ে বলে, ঝিনুক বইন, অহন কী ভালা যে লাগতে আছে! এই হাসন আছিল কই? এই ব্যস্যে (বয়সে) শোকাঁপা (শোকগ্রস্ত) মাইনষের লাখান মাটিতে চৌখ নামাইয়া বইসা থাকলে আমার মন খারাপ হইয়া যায়।
