.
আজ বেস্পতিবার।
ক’দিন সারা কলকাতায় অবিরল পাক খাওয়ার পর আজ শরীর একেবারে ছেড়ে দিয়েছে। বাড়ি থেকে কারোরই বেরুতে ইচ্ছা করছে না।
তা ছাড়া, ফি বেস্পতিবার যুগল আসে। যুদ্ধের আমলের মিলিটারি হাসপাতালে পা ড্রেস করিয়ে এ বাড়িতে দুপুরটা কাটিয়ে যায়। অতদূর থেকে এসে হিরণদের কাউকে না পেলে জখম পা নিয়ে এতটা ছোটাছুটিই সার। খুবই কষ্ট হবে যুগলের।
সকালে এক দফা চা হয়ে গেছে। এখন সাড়ে দশটার মতো বাজে। বাইরের ঘরে আরও একবার। চা নিয়ে বসেছে বিনু আর হিরণ।
ভেতরে রান্নার তোড়জোড় চলছে। সেখান থেকে ঝিনুক আর সুধার অস্পষ্ট কথাবার্তা ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে কোনও মজার কথায় দু’জনে হেসে কুটিপাটি হচ্ছে।
বিনু খুব একটা চা খেত না। সকালে এক কাপ, বিকেলে এক কাপ। কিন্তু হিরণদের কাছে এসে সঙ্গগুণে চায়ের মাত্রাটা অনেক বেড়ে গেছে।
জানালার বাইরে পরিষ্কার নীলাকাশ। সকালের দিকে যে কুয়াশা ছিল, এখন তার লেশমাত্র নেই। ঝলমল রোদ ছড়িয়ে আছে চারদিকে, তবে আগের মতো আঁঝ নেই। উত্তরে বাতাস ক্রমশ শীতল হচ্ছে। শীতঋতু যে লম্বা পায়ে এগিয়ে আসছে, টের পাওয়া যায়।
এ ক দিন যেখানে যেখানে ঘোরা হয়েছে, যে কটা সিনেমা দেখা হয়েছে, সে সব নিয়ে লঘু মেজাজে গল্প হচ্ছিল। হঠাৎ হিরণ বলল, কলকাতায় চলে এসেছ। আর কখনও রাজদিয়ায় ফেরার প্রশ্নই নেই। কী করবে, কিছু ঠিক করেছ?
হিরণ কী জানতে চাইছে, বুঝতে না পেরে বিনু বলল, কী করব বলতে?
তুমি তো বি. এ পাস করেছ।
হ্যাঁ।
কিসে অনার্স ছিল?
ইংরেজিতে।
হিরণ জিজ্ঞেস করল, পড়াশোনা কি চালিয়ে যাবে? তা হলে ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ফর্ম টর্ম এনে অ্যাডমিশানের ব্যবস্থা করতে হয়। একটু ভেবে বলল, এ বছরের ক্লাস অবশ্য অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। শুনেছি, উদ্বাস্তু ছাত্রদের ব্যাপারে ইউনিভার্সিটি খুব সিমপ্যাথেটিক। দেরিতে হলেও ভর্তি করে নিতে পারে।
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে বিনু। ছেচল্লিশের দাঙ্গার পর থেকে পূর্ব বাংলার আবহাওয়া বিষবাষ্পে ভরে যাচ্ছিল। সারাক্ষণ উৎকণ্ঠা। সারাক্ষণ মৃত্যুভয়। সবচেয়ে বড় সংকট তখন ঝিনুককে নিয়ে। প্রায় বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল সে। কী করে তাকে সুস্থ, স্বাভাবিক করে তুলবে সেটাই ছিল বিনু। হেমনাথ স্নেহলতা এবং শিবানীর একমাত্র চিন্তা। তারপর তো বিরাট ঝুঁকি নিয়ে প্রবল আতঙ্কের মধ্যে ঝিনুককে নিয়ে এপারে চলে এল বিনু। এর ভেতর অন্য কিছু ভাবার সময় পায় নি সে।
কিন্তু এটা তো ঠিক, সামনে বিপুল ভবিষ্যৎ। একটি যুবকের পক্ষে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা তো সম্ভব নয়। সুধাদের কাছে আসার পর কটা দিন হইচই আর অফুরান আনন্দে যেন আকাশে উড়ছিল বিনু। সেখান থেকে একটানে হিরণ তাকে বাস্তবের কঠিন জমিতে নামিয়ে এনেছে।
বিনু বলল, বাবা ফিরে আসুন। তিনি কী বলেন, শুনি—
হিরণ সায় দেয়, তা তো বটেই। হঠাৎ কী মনে পড়ায় দ্বিধান্বিতভাবে বলে, তবে–
কী?
তোমার ছোটদিকে কিছু বলল না। আমি যতদূর জানি, শ্বশুরমশাইর আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ।
বিনু চমকে ওঠে। যে অবনীমোহন যুদ্ধের আমলে দাপটে আসামে গিয়ে কনট্রাক্টরি করেছেন, তিনি যে আর্থিক দিক থেকে দুরবস্থায় পড়েছেন, রাজদিয়ায় থাকতে এমন খবর তাদের কাছে পৌঁছয় নি। ইদানীং না হয় চিঠিপত্র পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু ছমাস আগেও ডাক চলাচলে কোনও গোলমাল ছিল না। সুধারা, সুনীতিরা নিয়মিত চিঠি লিখত। কিন্তু তারাও কেউ ঘুণাক্ষরে কিছু জানায় নি।
হিরণ বলছিল, চিন্তা করো না, তোমার পড়ার ব্যাপারটা আমি দেখব।
বিনুর আত্মসম্মানে বাধছিল। ভগ্নিপতির পয়সায় পড়াশোনা চালাতে তার মন মোটেও সায় দিচ্ছে না। সে বলল, দেখুন হিরণদা, এটা হয় না।
হিরণ বুঝতে পারছিল, বিনুর কোথায় আটকাচ্ছে। সে জোর করল না। শুধু বলল, আর দেরি করলে ইউনিভাসির্টিতে ভর্তি হতে মুশকিল হবে।
বিনু উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর হিরণ বলল, তোমার আপত্তিটা কোথায়, আন্দাজ করতে পারছি। ঠিক আছে, ইচ্ছে যখন নেই, আমার সাহায্য নাই নিলে। আমার অন্য একটা কথা ভেবে দেখতে পার।
হিরণ যে তার সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী, বিনু তা জানে। উৎসুক সুরে জিজ্ঞেস করল, কী কথা?
একটা চাকরি বাকরি করলে। ফাঁকে ফাঁকে পড়ে প্রাইভেট এম.এ’টা দিলে।
এই পরামর্শটা মনে ধরল বিনুর। অবনীমোহন সম্পর্কে যে খবরটা পাওয়া গেল, তাতে তার বোঝা বাড়ানো ঠিক হবে না। ঝিনুক আর সে গিয়ে থাকবে। দুটো মানুষের দায়িত্ব তো কম নয়। তার ওপর পড়াশোনার খরচ। না, রোজগারের একটা ব্যবস্থা তাকে করতেই হবে।
বিনু ব্যগ্রভাবে বলল, আমি তো এখানকার কিছুই চিনি না। চাকরি পেতে হলে কী করতে হবে?
আমাদের ফুড ডিপার্টমেন্টে মাস দুয়েকের ভেতর কিছু লোক নেওয়া হচ্ছে। রিফিউজিদের প্রায়োরিটি দেওয়া হবে। তুমি গ্র্যাজুয়েট, তার ওপর অনার্স। তোমার চাকরি আশা করি হয়ে যাবে। বর্ডার স্লিপটা আছে তো?
আছে।
ইন্টারভিউর সময় ওটা দেখতে চাইবে।
ভেতরে ভেতরে উদীপ্ত হয়ে উঠেছে বিনু। সে হাসল, আমি যে ওপার থেকে এসেছি তার প্রমাণ চাই, এই তো?
হ্যাঁ। হিরণ আস্তে মাথা নাড়ে, ও, আসল ব্যাপারটাই তো বলা হয় নি। তোমার ম্যাট্রিকুলেশন, আই.এ, বি.এ’র সার্টিফিকেট আর ডিগ্রি নিয়ে এসেছ তো?
