চিঠিটা খামের ভেতর পুরে আঠা দিয়ে মুখ আটকে ফের হিরণদের কাছে এসে বসল বিনু। হঠাৎ তার মনে সংশয় দেখা দেয়। বলে, এই চিঠি যদি অন্যের হাতে পড়ে, দাদুর ভীষণ বিপদ হয়ে যাবে। খুব সাবধানে, গোপনে এটা যেন তার হাতে পৌঁছয়। আর হেমনাথও যেন তার মতামত লিখে খামের ভেতর পুরে পত্রবাহককে দেন। তার উত্তরের জন্য বিনু অপেক্ষা করে থাকবে।
জিভ কেটে নিত্য দাস বলল, হামকত্তায় আমার বাপের লাখান। তেনারে কত সোম্মান করি। তেনার ক্ষতি হউক, এইটা আমি চিন্তাও করতে পারি না। একটু থেমে ফের বলে, বিশ্বাসী লোকের হাত দিয়া আপনের পত্তরখান পাঠামু। পরান থাকতে এইটা হেয় (সে) হাতছাড়া করব না।
খামটা নিত্য দাসকে দেয় বিনু। সেটা সযত্নে পকেটে পুরে সে বলে, অনেকখানি সোময় আপনেগো কাছে কাটাইয়া গ্যালাম। বড় ভালা লাগল। হ্যামকত্তার চিঠির জবাব লইয়া দশ পনর দিনর ভিতরে আবার আসুম। আইজ চলি–
নিত্য দাসের সঙ্গে একতলায় নেমে এল বিনু আর হিরণ।
হঠাৎ নিত্য একটু কুণ্ঠিতভাবে বলল, একখান কথা জিগামু ছুটোবাবু?
বিনু বলল, কী?
শুনাশুন কানে আইছে, ঝিনুক বইনে নিকি আপনের লগে পাকিস্থান থিকা চইলা আইছে? এতক্ষণ কত কথাই না বলেছে নিত্য দাস। কাজের কথা, অকাজের কথা। কিন্তু ঝিনুক সম্পর্কে একটি শব্দও মুখে আনে নি। কিন্তু যাবার সময় আচমকা একটা শেল হেনে বসল।
হৃৎস্পন্দন পলকের জন্য থমকে যায় বিনুর। চিরদুঃখী মেয়েটাকে কতভাবেই না আড়াল করে রাখতে চাইছে সে, কিন্তু পারছে কই? ঝিনুকের চলে আসার খবর যখন পেয়েছে, ঢাকায় তার লাঞ্ছনার কথা কি নিত্য দাসের এখনও অজানা?
লোকটার হয়তো খারাপ কোনও অভিসন্ধি নেই। নেহাতই কৌতূহলের বশে ঝিনুকের কথাটা তুলেছে। কিন্তু হঠাৎ মাথার ভেতরটা তপ্ত হয়ে ওঠে বিনুর। পৃথিবীতে কত কত বিষয় তো রয়েছে। সে সব ফেলে ঝিনুককে নিয়ে টানাটানি কেন? রূঢ় গলায় সে বলে, ঝিনুকের কথা জানতে চাইছেন যে? কোনও দরকার আছে?
বিনুর মারমুখী চেহারা দেখে ঘাবড়ে যায় নিত্য দাস। দূরে সরে গিয়ে বলে, না না, অ্যামনেই জিগাইতে আচ্ছিলাম। দ্যাশের মাইয়া। জন্মাইতে দেখছি। আইচ্ছা, যাই
বিনু মনস্থির করে ফেলে। ঝিনুককে কতদিন আর পরিচিত মানুষজনের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে? রাজদিয়া এবং তার চারপাশের গ্রামগুলো উজাড় করে তোক চলে আসছে এপারে। তাদের অনেকেই ঝিনুকের খবর জানে। যারা জানে না, তারাও জেনে ফেলবে। এবং বিশ্বময় চাউর করে দেবে।
আগেও বিনু ভেবেছিল, কিন্তু সাহসে কুলোয় নি। যাই ঘটুক, এবার আর কুঁকড়ে থাকা নয়, সমস্ত কিছুর মুখোমুখি দাঁড়াবে সে। অবশ্য যুগলকে ঝিনুককে নিয়ে আসার খবরটা দিয়েছে। কিন্তু নিত্য দাসের সঙ্গে যুগলের অনেক তফাত।
নিত্য দাস চলে যাচ্ছিল, তাকে ডেকে বিনু বলল, শুনুন, ঝিনুক আমার সঙ্গে এসেছে। এ বাড়িতেই আছে।
.
৩.৩০
যুদ্ধের আমলে ডিফেন্সের প্রচার বিভাগে চাকরি নিয়ে এসেছিল হিরণ। মিত্রশক্তি তখন সিঙ্গাপুরে মালয়ে বর্মায় জাপানিদের হাতে কচুকাটা হচ্ছে। যারা বেঁচে আছে তারা বর্মা বর্ডার পেরিয়ে প্রাণভয়ে পালাচ্ছে কলকাতার দিকে। যে ব্রিটিশ সিংহ একদা সারা দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াত, তোজোর ঝটিকা বাহিনী তার নাক কান এবং লেজ হেঁটে দিচ্ছে। কিন্তু যাদের রাজত্বে সূর্যাস্ত হয় না তাদের এই চরম হেনস্থার খবর রটে গেলে, গালে চুনকালি লেগে যাবে। কাজেই মুখরক্ষার জন্য পালটা প্রচার দরকার। যখন অ্যালায়েড ফোর্স ল্যাজ গুটিয়ে পঞ্চাশ মাইল পিছিয়ে এসেছে তখন জানানো হচ্ছে, মিত্রবাহিনী আশি মাইল এগিয়ে গেছে। যখন বিশটা ট্যাঙ্ক আর তিরিশটা বোমারু বিমান ধ্বংস। হয়েছে, তারস্বরে উলটোটাই প্রচার করা হচ্ছে। কখনও কখনও অবশ্য বলা হচ্ছে, ‘সাকসেসফুল রিট্রিট’ অর্থাৎ মিত্রশক্তি সাফল্যের সঙ্গে পশ্চাদপসরণ করেছে।
প্রচার দপ্তর থেকে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে বোঝাই এই জাতীয় প্রেসনোট তৈরি করতে হত হিরণকে। সেগুলো ছাপার জন্য পাঠানো হত খবরের কাগজের অফিসে।
যুদ্ধের পর প্রচার দপ্তরের কাজ নেই। ইংরেজ তখন পালাই পালাই করছে। জার্মান বোমায় লন্ডনের অর্ধেক মাটিতে মিশে গেছে। আর্থিক দিক থেকে একেবারে হাড়ির হাল। এই অবস্থায় কয়েক হাজার মাইল দূরে অন্য গোলার্ধে কলোনি আগলে রাখা অসম্ভব।
প্রচার দপ্তর গুটিয়ে ফেলা হল। যুদ্ধের দু’আড়াই বছরের মাথায় রেশনিং চালু হয়ে গিয়েছিল। প্রচার দপ্তর থেকে ফুড কনট্রোলে পাঠানো হল হিরণকে। এখন সেই ডিপার্টমেন্টেরই সে অফিসার।
জ্বরের জন্য কদিন অফিসে যেতে পারেনি হিরণ। বিনুরা আসার পর আরও দিন কয়েক ছুটি নিয়েছিল।
এখনও প্রচুর মেডিক্যাল আর আর্নড লিভ জমা হয়ে আছে। হিরণ ছুটিটা আরেক সপ্তাহ বাড়িয়ে নিল।
নিত্য দাস সেই যে এসেছিল, তারপর কটা দিন বিনু আর ঝিনুককে নিয়ে সারা কলকাতায় চরকির মতো ঘুরে বেড়াল হিরণ আর সুধা। গঙ্গার ধার। ইডেন গার্ডেন। হাওড়া ব্রিজ। বোটানিক্যাল গার্ডেন। দক্ষিণেশ্বর। কালীঘাট। মার্বেল প্যালেস। মনুমেন্ট। দু’দিন নাইট শো’য়ে সিনেমাও দেখল। ‘দেবী চৌধুরানী’ আর ‘কবি’।
যার জন্য এত ছোটাছুটি সেই ঝিনুকের দিনগুলো যেন ঘোরের মধ্যে কেটে যাচ্ছে। কলকাতার চারদিকে কত যে ইন্দ্রজাল! ঝিনুকের মনে হয়, কোনও স্বপ্নদৃশ্যে সে ডানা মেলে ভাসছে। সুধাদের কাছে এসে বড় ভাল লাগছে তার।
