তা তো ঠিকই।
তাড়া দেবার সুরে নিত্য দাস এবার বলে, দেরি কইরেন না হিরণ ভাই। রাজাকার একবার আপনেগো জমিনে বইসা গ্যালে আর উঠান যাইব না কিলাম। আমার হাতে মেলা গাহেক (অনেক খদ্দের) আছে। আপনেরা রাজি হইলে পনর বিশ দিনের মইদ্যে সব কাম হইয়া যাইব। খানিক চিন্তা করে ফের বলল, আমার পাওনাগন্ডার লেইগা ভাইবেন না। আপনেরা আমার নিজের জন। অন্যেরা যা দ্যায়, আপনেগো কাছ থিকা হের (তার) অনেক কম নিমু। ধরেন আদ্ধেক। পাকা কথা দিলাম।
হিরণ দ্রুত ভেবে নিল, শওকত আলির সঙ্গে যদি কোনও কারণে কাজটা শেষ পর্যন্ত না হয়, নিত্য দাসকে হাতে রাখা ভাল। বলল, দাদু আর জেঠিমা তো কলকাতায় নেই। ওঁদের জিজ্ঞেস না করে কিছু করা যাবে না। ওঁরা ফিরে আসুন, দেখি কী বলেন–
ওনারা কবে ফেরবেন?
কুড়ি বাইশ দিন পর।
দেরি হইয়া যাইব হিরণভাই। মেলা (অনেক) মুসলমান পাকিস্থানে যাওনের লেইগা ছটফট করতে আছে। আইজ পারলে আইজই চইলা যায়। কাইলের লেইগা বইসা থাকব না। এই দিকে আমার লাখান (মত) আরও অনেকে এচ্চেঞ্জে’র কারবারে লাইমা (নেমে) পড়ছে। যত দেরি হইব, আমার গাহেকরা তাগো কাছে চাইলা যাইব। তহন আর কিছু করনের থাকব না, এক কাম করেন
কী?
যত তরাতরি পারেন, দাদু আর জেঠিমারে কইলকাতায় লইয়া আসনের চ্যাষ্টা করেন-
দেখি—
নিত্য দাস এবার বিনু সম্পর্কে মনোযোগী হয়ে ওঠে। তার দিকে ঘুরে বলে, একখান মোন্দ সম্বাদ আছে ছুটোবাবু। আমার যে লোকেরা বডারের উইপারে যায়, শুনাশুন তাগো কানে আইছে, হামকত্তার নিকি বড় বিপদ–
বুকের ধকধকানি পলকে শতগুণ বেড়ে যায় বিনুর। এস্ত হয়ে সে জিজ্ঞেস করে, কিসের বিপদ?
পাকিস্থান গরমেন (গভর্নমেন্ট) হিন্দুগো বড় বড় সোম্পত্তি জোর কইরা কাইড়া নিব। হামকার জমিজেরাতের দিকেও নিকি তাগো নজর পড়ছে।
বিনুও কার কাছে যেন এই একই কথা শুনেছে। পাকিস্তান সরকারের অভিসন্ধিশত্রুসম্পত্তি ঘোষণা করে হিন্দুদের প্রপার্টি দখল। হিরণ বলেছিল কি? নাকি দেশ থেকে আসার সময় স্টিমার কিংবা কলকাতাগামী ট্রেনে অন্য কেউ?
এই সেদিন দেশ থেকে এপারে এসেছে বিনু। পার্টিশানের পর থেকেই রাজদিয়া এবং চারপাশের গ্রামগুলোতে ভাঙন ধরেছিল। ভিটেমাটি ফেলে কাতারে কাতারে মানুষ চলে যাচ্ছিল আসামে, ত্রিপুরায়, তবে বেশির ভাগই এপার বাংলায়।
বিনু দেখে এসেছে, আবহাওয়া খুবই উত্তপ্ত। চারদিকে প্রবল উত্তেজনা। ভয়। আতঙ্ক। কিন্তু হেমনাথের গায়ে এতটুকু আঁচড় পড়ে নি। কেউ তাকে হুমকি দেয়নি, দেশ ছেড়ে চলে যান। সরকার থেকে তার বিষয় সম্পত্তি গ্রাস করার চক্রান্ত ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যায় নি।
মাত্র এই কদিনে হঠাৎ অবস্থার কি এমনই অবনছি ঘটে গেছে? রাজদিয়াকে ঘিরে তিরিশ চল্লিশ মাইলের মধ্যে হেমনাথ সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষ। তারও কি তা হলে এবার নিস্তার নেই?
সন্ত্রস্ত বিনু জিজ্ঞেস করে, গভর্নমেন্ট থেকে দাদুর বাড়ি টাড়িগুলো শত্রু সম্পত্তি বলা হচ্ছে?
অহনও হয় নাই। কিন্তু হইতে কতক্ষণ? বিপদ ঘটনের আগে কাম সাইরা ফেলাইতে হইব।
আপনি কী করতে বলেন?
নিত্য দাস জানায়, তার হাতে একজন মস্ত বড় খদ্দের আছে। শাজাহান সাহেব। হুগলি জেলায় তার একশ’ বিঘের ওপর জমিজমা। হাওড়া শহরে বিরাট দুমহল বাড়ি। পুরনো আমলের একখানা মোটর গাড়িও আছে। ধান ওঠে বছরে দুশ মণেরও বেশি। তা ছাড়া তিল, তিসি, সর্ষে। কিছু আখ আর ডালও। তিরিশ চল্লিশটা গরুর গাড়ি। মোটামুটি মাঝারি ধরনের জমিদারই বলা যায়।
শাজাহান সাহেব পাকিস্তানে চলে যাবেন। তিনি চাইছেন প্রচুর জমিজমা সমেত বাড়ি। যেমনটি এ বাংলায় আছে, সীমান্তের ওপারে প্রায় তেমনই চাইছেন। ঢাকা শহরে চাষের খেত কোথায় পাওয়া যাবে? তিনি ঢাকার চল্লিশ পঞ্চাশ মাইলের মধ্যে কোনও মফস্বল শহরে বাড়ি এবং তার কাছাকাছি। জমির খোঁজ করছেন। হেমনাথরা চাইলে একমাসের ভেতর এক্সচেঞ্জ হয়ে যাবে।
নিত্য দাস বলল, আমন সুযুগ হারান উচিত হইব না ছুটোবাবু। আপনে হ্যামকত্তারে শাজাহান সাহেবের কথা জানাইয়া এচ্চেঞ্জের ব্যাপারে চিঠি ল্যাখেন।
বিনু যখন এপারে চলে আসে, হেমনাথ তখনও তার সিদ্ধান্তে অবিচল। কোনও কারণেই দেশ ছাড়বেন না। এর মধ্যে যদি খবর পেয়ে থাকেন, পাকিস্তান সরকার শত্রুসম্পত্তির আইন জারি করতে চলেছে, তার মত পালটাতেও পারে। অযাচিত যে সুযোগ নিত্য, দাস নিয়ে এসেছে, হেলায় সেটা নষ্ট করা ঠিক হবে না।
হিরণ নীরবে শুনে যাচ্ছিল। এবার সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ, লিখেই দাও। উঠে গিয়ে ভেতরের ঘর থেকে কাগজ, কলম, সাদা বড় খাম আর আঠার শিশি এনে দিল।
বসার ঘরের একধারে চেয়ার টেবল রয়েছে। সেখানে গিয়ে চিঠিটা লিখেই ফেলল বিনু। রাজদিয়া থেকে এপারে আসার সময় ঝিনুককে নিয়ে প্রতি মুহর্তে কী নিদারুণ সংকটের মুখে পড়তে হয়েছে, তার অনুপুঙ্খ বিবরণ তো দিয়েছেই। আরও জানিয়েছে, কলকাতায় পৌঁছে অবনীমোহনকে না পেয়ে সুনীতিদের বাড়ি গিয়েছিল। সেখান থেকে আপাতত সুধাদের কাছে এসে আছে। হেমনাথ কষ্ট পাবেন, তাই হেমনলিনীর নির্দয় আচরণের কথা জানায় নি।
চিঠির শেষ দিকে এক্সচেঞ্জের ওপর জোর দিয়ে বিনু লিখেছে, দেশের যা হাল, অবিলম্বে খুব সাবধানে সম্পত্তির দলিলগুলো নিয়ে ক দিনের জন্য যদি হেমনাথ কলকাতায় আসতে পারেন, খুব ভাল হয়। বিনিময়ের ব্যবস্থা এখানেই হয়ে যাবে। আপাতত তিনি একাই আসুন। স্নেহলতারা রাজদিয়ায় থেকে যাবেন। হেমনাথের আসার খরবটা ঘুণাক্ষরেও যেন কেউ টের না পায়। কাজ চুকে যাবার পর স্নেহলতাদের দেশ থেকে নিয়ে আসা হবে।
