বিগলিত হাসে নিত্য দাস, উঃ, কত বচ্ছর পর দেখা হইল সুধা বইন। আপনের আর সুনীতি বইনের বিয়ায় হ্যামকত্তার বাড়িত কী আনন্দ যে করছিলাম! হ্যামকত্তায় তিন দিন ধইরা কী আদরযত্ন না করছিল! যদ্দিন বাচুম, মনে থাকব।
সুধা আড়ষ্টভাবে একটু হাসে। তার ভয়, লোকটা হুট করে ঝিনুকের কথা না জিজ্ঞেস করে বসে।
নিত্য দাস অফুরান উদ্যমে ফের শুরু করে, পাট্টিশানের পর ফির দেখা হইব, ভাবি নাই। ভাইগ্য ভালা, তৈলক্য স্যানেরে পরশু শিয়ালদায় পাইয়া গেলাম। নাইলে আপনেগো ঠিকানাই জানতে পারতাম না। আপনেরা হ্যামকত্তার নাতি, নাতিন আর নাতিন জামাই। আমাগো বড় আপনজন। অহনই কইয়া রাখি, মাঝে মইদ্যে আপনেগো বাড়ি আসুম কিলাম–
সুধা কাপ প্লেট আগেই টেবলে সাজিয়ে দিয়েছিল। বলল, আসবেন। আপনারা কথা বলুন। ভেতরে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। যাচ্ছি–
নিত্য দাস ব্যস্তভাবে বলল, হ হ, যান। একদিন আমাগো কসবার বাড়িত্ আপনেগো লইয়া যামু। না কইতে পারবেন না।
আচ্ছা– সুধা চলে গেল।
নিত্য দাস চোখের পলকে মিষ্টিগুলো সাবাড় করে চায়ের কাপ তুলে নেয়। সুড়ক সুড়ক আওয়াজ করে চা খেতে খেতে বলল, ছুটোবাবু, হিরণভাই, এতকাল পর আপনেগো যহন পাইয়াই গ্যাছি, একখান কামের কথা কই। মন দিয়া শোনেন—
লোকটা যে সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চক্কর মেরে শুধুমাত্র প্রাণের টানে দেশের পরিচিত জনদের দেখতে টালিগঞ্জে এসে হাজির হয়নি, তা আগেই আঁচ করা গিয়েছিল। তার আসার পেছনে অভিসন্ধি না থাক, গভীর কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে।
নিত্য দাস সম্বন্ধে বিনুদের ধারণা খুব পরিষ্কার। স্বার্থ ছাড়া একটি পাও সে ফেলবে না। ভেতরে ভেতরে দু’জনে সতর্ক হয়ে যায়।
বিনু জিজ্ঞেস করে, কী কথা?
নিত্য দাস প্রথমে হিরণকে বলল, ববাঝেনই তো পাকিস্থানের যা হাল, হেইখানে আর কুনো কালে ফিরন যাইব না। দ্যাশ জম্মের মতো গ্যাছে। তা রাইজদায় আপনেগো জমিজেরাত, বাড়ি, পুকৈর, নাইকল (নারকেল) সুপারির বাগিচা–এই হগলের কী ব্যবোস্তা করছেন?
লোকটাকে বাজিয়ে নেবার জন্য হিরণ বলল, আমরা আছি কলকাতায়। জমি বাড়ি সব রইল পাকিস্তানে। এখানে বসে কী-ই বা করতে পারি?
চা আধাআধি খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। বাকিটা লম্বা চুমুকে শেষ করে নিত্য দাস বলল, হের (তার) ফিকির আছে হিরণভাই। যদি আপনেগো মত থাকে, এইহানে থাইকাই হগল বন্দবস্ত হইয়া যাইব।
আপনার কথাটা ঠিক বুঝলাম না।
খবর পাইছি রাজাকাররা রাইজদায় হিন্দুগো জমিন জুমিন দখল কইরা লওনের লেইগা উইঠা পইড়া লাগছে। বাপ-দাদার সোম্পত্তি তো আর ভোগ করতে পারবেন না। অহনও সোময় আছে। দ্যাশের বাড়িঘরের বদলে যদিন কইলকাতায় কিছু করতে চান তো আমারে কান
ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছে হিরণ। তবু জিজ্ঞেস করল, আপনি কী করবেন?
নিত্য দাস সবিস্তার ব্যাখ্যা করল। এপার থেকে বহু মুসলমান পাকিস্তানে চলে যাচ্ছে। তাদের বাড়িটাড়ির সঙ্গে ওপার থেকে আসা হিন্দুদের সম্পত্তি তারা বদলাবদলি করে নিচ্ছে। কোনও রকম হাঙ্গামা নেই। পাকিস্তানেও যেতে হবে না। এখানেই হস্তান্তরটা নির্বিঘ্নে চুকিয়ে দেবে নিত্য দাস। ওপারের বিষয় আশয়ের বিনিময়ে এপারের বিষয় আশয়।
হিরণরা আন্দাজ করে নিল, এই যে নিত্য দাস দেশের মানুষের খোঁজে শিয়ালদা স্টেশনে বা রিফিউজি ক্যাম্পে ক্যাম্পে হানা দিচ্ছে, কিংবা তাদের বাড়িতেও ছুটে এসেছে তার উদ্দেশ্য একটাই। সম্পত্তি বিনিময় করানো। লোকটাকে যত দেখছে, তার গতিবিধির কথা যত শুনছে, বিস্ময়ে ততই হতবাক হয়ে যাচ্ছে হিরণ আর বিনু।
নিত্য দাস বলল, এয়ারে (একে) এংরাজিতে কয় এচ্চেঞ্জ (এক্সচেঞ্জ)। মেলা মাইনষের সম্পত্তি এচ্চেঞ্জের বন্দবস্ত আমি কইরা দিছি।
এর মধ্যেই যে তাদের বাড়ি এবং জমিজমা এক্সচেঞ্জের ব্যাপারে এই অঞ্চলের শওকত আলির সঙ্গে কথাবার্তা মোটামুটি পাকা করে ফেলেছে সেটা আর ভাঙল না হিরণ। জিজ্ঞেস করল, এই যে আপনি এত কষ্ট করে, নিজের দোকান ফেলে, এত লোকের কাছে যাচ্ছেন, এক্সচেঞ্জের বন্দোবস্ত করে দিচ্ছেন, এতে আপনার কী লাভ?
বোঝেনই তো হিরণ ভাই– নিত্য দাস সামান্য বিব্রত হয়। কাঁচুমাচু মুখে বলে, আমি হইলাম ব্যবসায়ী মানুষ। দুই চাইর পহা পাওনের আশা না থাকলে এই বস্যে (বয়সে) অমন খাটাখাঁটি করুম ক্যান? যাগো সম্পত্তি এচ্চেঞ্জ’ করি হেরা দুই পক্ষই আমারে কিছু কিছু দ্যায়।
অর্থাৎ লোকটা বড় ধরনের দালাল। ইণ্ডিয়া এবং পাকিস্তান, দুই দেশেই বিরাট করে জাল বিছিয়েছে। নিপুণভাবে। এপারে ওপারে বিনিময় করিয়ে টাকা লুটছে। পার্টিশান কত মানুষকে শেষ করে দিয়েছে, আবার নিত্য দাসের মতো লোকেদের সামনে টাকা করার কী সুবর্ণ সুযোগই না এনে দিয়েছে!
হিরণ জিজ্ঞেস করে, কিরকম টাকা পয়সা নিয়ে থাকেন?
ধরাবান্ধা কিছু নাই। হগলই বাড়ি জমিনের মাপ বুইঝা। সোম্পত্তি বড় হইলে বেশি টাকা, ছোট হইলে কম টাকা। বলে একটু থেমে ফের শুরু করে নিত্য দাস, আসল কথাখান তো জিগাই নাই।
কী?
দ্যাশের বাড়ির দলিলগুলা কি মনে কইরা আনছেন, না রাইজদায় ফেলাইয়া আসছেন?
দাদু আর জেঠিমা নিয়ে এসেছে।
জবর বুদ্ধির কাম করছে। এক্ষেঞ্জে’র সোময় দলিল, দাখিলা, পরচা কি খাজনার রসিদ দরকার। এট্টা কিছু সরকারি কাগজ না দেখাইলে গাহেকে (খদ্দের) বুঝব ক্যামনে রাইজদার উই সম্পত্তি সত্য সত্যই আপনেগো কিনা।
