নিত্য দাস বলতে লাগল, তৈলক্য স্যানের মুখে শুনলাম, ছুটোবাবু কয়দিন আগে কইলকাতায়। চইলা আইছে। তেনার তিনখানে (তিন জায়গায়) ওঠনের কথা। ভবানীপুরে তেনার বালের কাছে। নাইলে সুনীতি বইন কি সুধা বইনের বাড়ি। তৈলক্য স্যান হ্যামকত্তার কাছ থিকা তিন জাগারই ঠিকানা নিয়া আসছে।
নিত্য দাস আরও জানায়, সে ত্রৈলোক্য সেনের কাছ থেকে এই তিনটি ঠিকানা লিখে নেয়। কাল সে ভবানীপুরে গিয়েছিল। সেখানে কেউ নেই। বাড়ি তালাবন্ধ দেখে ছুটেছিল সুনীতিদের বাড়ি। ওখানেই জানতে পারে, বিনু সুধা আর হিরণের কাছে চলে এসেছে। কাল আর সময় করে উঠতে পারে নি। আজ তাই সকাল হতে না হতেই বিনুদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েছে।
নিত্য দাস থামে না। বিনুর দিকে ফিরে একটানা বলে যায়, রাজেক মাঝির নায়ে (নৌকোয়) তারপাশায় আইসা গোয়ালন্দের ইস্টিমার ধরছেন, এই তরি খবর পাইছেন হ্যামকত্তায়। পথের গতিক জবর খারাপ। খুনীরা চাইর দিকে রাম দাও (রাম দা), সড়কি, বন্দুক লইয়া ঘুরতে আছে। হেইর (তার) মইদ্যে পরান বাঁচাইয়া কইলকাতায় আইতে পারলেন কিনা, তেনি (তিনি) জানেন না। বড় দুচ্চিন্তায় আছেন হ্যামকত্তায়। পৌঁছ সম্বাদ নি তেনারে দিছেন?
বিনু জানে, হেমনাথরা তাদের জন্য পূর্ব বাংলার সুদুর প্রান্তের এক নগণ্য শহরে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। সারাক্ষণ ছটফট করছেন। তাঁকে চিঠি লেখার কথা বেশ কয়েক বার ভেবেছে সে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, ওপারের চিঠি এপারে আসছে না, এপারের চিঠি ওপারে যাচ্ছে না। হেমনাথের সঙ্গে যোগাযোগের কোনও রাস্তাই খোলা নেই।
বিনু বলল, পৌঁছনোর খবর কী করে দেব? চিঠি লিখলে দাদু পাবেন না। সে জানায়, দুই দেশের ডাক বিভাগ এই নিয়ে কোনও কাজই করছে না।
নিত্য দাস বলে, চিন্তা কইরেন না ছুটোবাবু। একখান চিঠি লেইখা আমারে দিয়েন। আমি রাইজদায় হ্যামকত্তার কাছে পাঠাইয়া দিমু। আপনেগো সম্বাদ তেনি পাইয়া যাইবেন।
লোকটা কি ভেলকি জানে! বিনু আর হিরণ কিছুক্ষণ হতবাক নিত্য দাসের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বিনু বলে, পোস্ট অফিস যেখানে কিছু করতে পারছে না, আপনি কী করে চিঠি পাঠাবেন?
নিত্য দাসের সারা মুখ জুড়ে রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে পড়ে। বলে, হেই বন্দবস্ত আছে ছুটোবাবু।
কী বন্দোবস্ত?
বুঝাইয়া কই। আমার হাতে অ্যামন মেলা (অনেক) লোক আছে যারা হপ্তায় একবার বডারের উই পারে যায়। তাগো হাতে চিঠিপত্তর পাঠাই। হেরা (তারা) পাকিস্থানের চিঠি কি দরকারী খবর লইয়া ইণ্ডিয়ায় পৌঁছাইয়া দ্যায়।
বিনু থ হয়ে যায়। দেশভাগের পর যে বহুলোক নিয়মিত সীমান্তের এপারে ওপারে যাতায়াত করছে, তার ধারণা ছিল না। জিজ্ঞেস করে, কী জন্যে পাকিস্তানে যায় এই সব লোকজন?
পরিষ্কার করে ভাঙল না নিত্য দাস। বলল, নানান কামে যাইতে হয়। লাখ লাখ মানুষ অহনও তো উই ধারে পইড় আছে। ধরেন, এক বংশের দশ জন আসতে পারছে। পাঁচজন পারে নাই। হেরা ভালা আছে না মোন্দ আছে, নিকি খুন হইয়া গ্যাছে, কেউ না গ্যালে তাগো খবর আনব ক্যাঠা?
বিনু তাকিয়েই থাকে।
নিত্য দাস থামে নি, অবশ্য এইর মইদ্যে একখান কথা আছে ছুটোবাবু।
কী কথা?
যে লোকগুলা যায় তাগো কিছু টাকাপয়সা দিতে হয়। পাকিস্থানের অবস্থা হগলই জানেন। নিজের চৌখে দেইখা আসছেন। হেইখানে পরানের ঝুঁকি লইয়া যাইতে হয় তো৷
হিরণ জিজ্ঞেস করে, আপনার লোকজনেরা কি শুধু রাজদিয়া তার তার চারপাশের গ্রামগুলোতেই যায়?
নিত্য দাস বলল, তা ক্যান? ফরিদপুর নুয়াখালি বরিশাল সিলট–কুনখানে না যায়? আপনে যেইখানের খবর জানতে চাইবেন, ঠিক আইনা দিব।
বলে কি লোকটা? হিরণ জানে, খুব বেশি লেখাপড়া করে নি নিত্য দাস। অল্প বয়সে রাজদিয়ার ইউনিয়ন বোর্ডের স্কুলে দু’চার বছর যাতায়াত করেছিল। কিন্তু খুবই তুখোড়। ক্ষুরধার বুদ্ধি। সামান্য বিদ্যের পুঁজি নিয়ে দেশভাগের আগে কী না করেছে সে? সুনামগঞ্জের হাটে আর রাজদিয়ার বাজারে দোকান, আড়ত। যুদ্ধের আমলে কনট্রোল শপ, মদের দোকান। পার্টিশানের পর কত মানুষ– দেশে যাদের বিশ পঞ্চাশ কানি ধানজমি ছিল, ছিল পাঁচ সাতটা দীঘির মতো পুকুর, মস্ত বাড়ি, ফলের বাগান–শিয়ালদা স্টেশনে কি রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে তারা ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভেবেছে এটাই নিয়তি। নিত্য দাস কিন্তু আকণ্ঠ হতাশায় ডুবে ভাগ্যের কাছে নিজেকে সঁপে দেয় নি। এপারে এসে সুচারুভাবে আখের গুছিয়ে নিয়েছে। দেশ থেকে কোনও কূট কৌশলে টাকা এনেছিল। সরকারের কাছ থেকে অনুদান বার করেছে, ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়েছে। ব্যবসা ফেঁদেছে। বাড়ি কিনেছে। শুধু তাই না, পাকিস্তানের সঙ্গে সুচতুর, গোপন যোগাযোগের একটা ব্যবস্থাও করে ফেলেছে। যার লোক এই মারাত্মক সময়ে সুদূর বরিশাল নোয়াখালি সিলেট পর্যন্ত চলে যায়, সে যে কতখানি ধুরন্ধর, মোটামুটি আন্দাজ করা যেতে পারে। শুধু এপারের লোক দিয়ে এসব হয় না। নিশ্চয়ই পাকিস্তানের লোকজনও এর সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে যোগাসাজশ না থাকলে এ ধরনের দুঃসাহসিক কাজ অসম্ভব। কলকাতায় বসে কিভাবে একটা প্রায়-অশিক্ষিত লোক পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মেলাল, কে জানে।
সুধা প্লেটে মিষ্টি আর চা নিয়ে এল। চা সবার জন্য। মিষ্টি নিত্য দাসের। রাজদিয়ার চেনাজানা মানুষ বাড়িতে এসেছে। তাকে আপ্যায়ন না করলে নিন্দা হয়।
