রাজদিয়া এবং তার চারপাশের গিরিগঞ্জ হাবিবপুর আমতলি তাজহাটি মাইনকার চর কমলাঘাট, এমনি পঁচিশ ত্রিশটা গ্রাম উজাড় করে মানুষ চলে আসছে এপারে। প্রতিদিন। বিরতিহীন।
কতকাল ওদের পাশাপাশি বাস করেছে নিত্য দাসেরা। পুরুষানুক্রমে। এই ছিন্নমূল মানুষগুলোর মধ্যে হাজারে একজনও সঙ্গে এক কুচি সোনা বা বিশ পঞ্চাশটা টাকা সঙ্গে আনতে পারে নি। নিত্য দাসের একান্ত ইচ্ছা, ওদের পাশে দাঁড়ান। সাধ্যে কুলোলে সাহায্য করা। কী করলে, কোন উপায়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, তার সন্ধান দেওয়া। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও এই মানুষগুলো তার আপনজনই তো।
রাজদিয়ায় থাকতে নিত্য দাসকে তেমন পছন্দ করত না বিনু। ভীষণ ধূর্ত। ধড়িবাজ। বাইরে বিনয়ের মুখোশ সাঁটা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সারাক্ষণ নানা ফন্দি আঁটছে।
বিনুব মনে আছে, সেই যুদ্ধের সময় এস. ডি. ও’র বাংলোয় দিনরাত ধরনা দিয়ে, তাকে ঘুষ খাইয়ে, পারমিট বার করে কনট্রোলের দোকান খুলেছিল নিত্য দাস। চাল, চিনি, কেরোসিন তেল, কাপড় তখন খোলা বাজারে মেলে না। কনট্রোলের দরে সামান্য কিছু লোকজনকে বিলি করে, বাকিটা দশ গুণ দামে কালোবাজারে বেচে দিত। শুধু তাই না, আমেরিকান টমিতে টমিতে যখন রাজদিয়া ছেয়ে গেল, চারদিকে রাতারাতি মিলিটারি ব্যারাক উঠছে, সরকারি লাইসেন্স নিয়ে একটা মদের দোকানও দিয়েছিল। হেমনাথ বাড়িতে ডাকিয়ে এনে কতবার নিষেধ করেছেন, কিন্তু তাঁর কথা নিত্য দাসের এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে যেত। সেই লোক সীমান্তের এপারে এসে মহানুভব হয়ে উঠেছে, ভাবা যায় না।
ভোঁতা, খসখসে গলায় একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে নিত্য দাস। ক্লান্তি বোধ করছিল বিনু। কান মাথা ঝিমঝিম। কিভাবে তাকে থামানো যায়, কে জানে।
হিরণ হঠাৎ বলে ওঠে, আমাদের ঠিকানা কী করে পেলেন তা কিন্তু এখনও বলেন নি।
নিত্য দাস হেসে হেসে বলে, এইবার হেইটা কমু। য্যামন মাঝে মইদ্যে যাই, ত্যামন পরশু সন্ধ্যাবেলা শিয়ালদায় গেছিলাম। দেখি, ঢাকা মেইল থিকা রিফুজিগো লগে তৈলক্য স্যানরা (ত্রৈলোক্য সেনরা) লাইমা আসল। ওনারা দ্যাশ ছাইড়া বরাবরের লেইগা চইলা আসছে। একটু নেমে বলল, হগলে যহন ভিটামাটি ফেলাইয়া আসতে আছে, ওনারা কুন ভরসায় দ্যাশের মাটিতে থাকব?
বিনুর স্নায়ুতে তীব্র ঝাঁকুনি লাগে। এতক্ষণে সে রীতিমতো উৎসুক হয়ে ওঠে।
বহুকাল আগে প্রথম মহাযুদ্ধের ঠিক পরে পরে ঢাকা জেলার নগণ্য শহর রাজদিয়া ছেড়ে রেঙ্গুনে পাড়ি দিয়েছিলেন ত্রৈলোক্য সেন। সঙ্গে স্ত্রী এবং একটি ছেলে। সেখানে ব্যবসা ট্যবসা করে অঢেল পয়সা করেন। সংসারও বড় হতে থাকে। রেঙ্গুনে আরও দুটি ছেলে হয়েছে তার। তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে নিজের কারবারে বসিয়েছেন। তাদের বিয়ে দিয়েছেন। তিন ছেলে, তিন পুত্রবধু, নাতিনাতনী নিয়ে তাঁর জমজমাট সংসার। রেঙ্গুন থেকে দেশে ফেরার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। বর্মা তখন তাঁদের নতুন স্বদেশ। রাজদিয়ার স্মৃতি ধূসর হতে হতে প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি পূর্ব রণাঙ্গনে যখন তোজোর ঝটিকা বাহিনী দুরন্ত গতিতে ধেয়ে আসছে, দিবারাত্রি মেশিন গান আর কামানের কানফাটানো গর্জন, আকাশ ঢেকে দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে বোমারু বিমানের অবিরল হানাদারি, অ্যান্টি-এয়ারক্রাফটের পালটা আক্রমণ, ক্রমাগত পিছু হটে হটে মিত্রবাহিনীর পিঠ যখন দেওয়ালে প্রায় ঠেকে গেছে, সেই সময় রেঙ্গুন পেগু মান্দালয়, অর্থাৎ গোটা বর্মা মুল্লুক থেকে পালানোর হিড়িক পড়ে যায়।
সারা জীবন বিপুল পরিশ্রমে, তিল তিল করে ত্রৈলোক্য সেন যা যা করেছিলেন–টাকাপয়সা, বিষয়আশয়, বিশাল বাড়ি, অফুরান ঐশ্বর্য–সব ফেলে, প্রায় খালি হাতে চলে আসতে হয়েছিল তাঁদের।
গোটা রাজদিয়া জুড়ে তখন সে কী তুমুল চাঞ্চল্য! প্রথম মহাযুদ্ধের শুরুতে যে ত্রৈলোক্য সেন দেশ ছেড়েছিলেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি বর্মা মুল্লুক থেকে তাঁর ফিরে আসাটাই এক চমকপ্রদ ঘটনা। রাজদিয়ার মানুষ এক দুঃসাহসী যুবককে চলে যেতে দেখেছে। যিনি ফিরলেন তিনি এক সর্বস্বান্ত বৃদ্ধ। তার ওপর দুর্গম পাহাড় এবং জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দিনের পর দিন পায়ে হেঁটে, বমী দস্যুদের নজর এড়িয়ে নিদারুণ আতঙ্কে কয়েক শমাইল পাড়ি দেবার পর ভারতবর্ষের নিরাপদ ভূখন্ডে যখন তাঁরা পা রাখলেন, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই। মৃতপ্রায়। বুকের খাঁচায় প্রাণটা কোনও রকমে ধুকধুক করছে।
ত্রৈলোক্য সেনের মুখে এই বর্ণনা শুনতে শুনতে রাজদিয়াবাসীদের রক্তে শিহরন জাগত। তখন ত্রৈলোক্যদের চারপাশে চাপ-বাঁধা ভিড়। একই বিবরণ শতবার শুনেও তৃপ্তি নেই।
ত্রৈলোক্য সেনের বড় নাতি শ্যামল রাজদিয়া হাইস্কুলে বিনুদের ক্লাসে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের শেষাশেষি অক্ষশক্তির হার যখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে, ত্রৈলোক্যর তিন ছেলে তাদের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের নিয়ে কলকাতায় চলে এসেছিল। রাজদিয়ায় পড়ে থেকে কী হবে? যুদ্ধে যা ধ্বংস হয়ে গেছে, নতুন করে ফের তা গড়ে তুলতে হবে। কলকাতা ছাড়া গতি নেই।
বাড়ির সবাই চলে এলেও ত্রৈলোক্য সেন এবং তার স্ত্রী রাজেশ্বরী কিন্তু আসেন নি। বহুকাল বাদে বর্মা মুলুক থেকে রাজদিয়ায় ফিরে এসে দেশের মায়ায় জড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও থাকা সম্ভব হল না। লক্ষ লক্ষ উৎখাত মানুষের মতো জন্মভূমি থেকে শিকড় তুলে তাদেরও চলে আসতে হয়েছে। আর কখনও তাদের দেশে ফেরা হবে না।
