অবনীমোহন বললেন, ছেলেদের ওপর খুব রাগ দেখলাম। কারণটা কী?
সে অনেক ব্যাপার। পরে বলব।
আর কেউ নেই ওঁর?
না। স্ত্রীকে ঢের আগেই খেয়ে বসেছে।
অবনীমোহন আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, হেমনাথ তার আগেই বলে উঠলেন, যাই, আড়ত থেকে মাছগুলো নিয়ে আসি। আয় দাদাভাই’ বলেই বিনুকে নিয়ে ডানদিকে নদীর ঢালে নেমে গেলেন।
কথায় কথায় কখন তারা নৌকোঘাটে এসে গিয়েছিলেন, অবনীমোহনের খেয়াল ছিল না। হঠাৎ তার মনে পড়ল, যাবার সময় মাছের জন্য আড়তে পয়সা দিয়ে গিয়েছিলেন হেমনাথ।
নৌকোঘাটটা রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নিচে। নদীর জল জায়গাটা ছুঁয়ে আছে। তার গা ঘেঁষে সারি সারি মাছের আড়ত।
যাবার সময় আড়তগুলোর গায়ে যত জেলেডিঙি বিনুরা দেখে গিয়েছিল, এখন তার দশ গুণ জমা হয়েছে। নদীর দূর দূরান্ত থেকে চিত্রবিচিত্র পাল তুলে আরও অগণিত নৌকো এদিকে ছুটে আসছে। ইলিশ মাছের ভারী আঁশটে গন্ধ এখানে বুঝি বার মাস অনড়। নদীর এলোমেলো দুরন্ত বাতাসও তা উড়িয়ে নিয়ে যেতে পারছে না।
আড়তে যেতেই সেই লোকটাকে দেখতে পেল বিনু। হেমনাথ এর হাতেই মাছের পয়সা দিয়ে গিয়েছিলেন।
লোকটা মাঝবয়সী। থলথলে মাংসল চেহারা, গায়ের রং কালো। সব সময় জলের কাছে থাকার জন্যই বোধহয় চামড়া রুক্ষ, খসখসে। গ্রীষ্ম বর্ষা হাজার নখে তারা গা চিরে চিরে দিয়েছে। পরনে আধময়লা ধুতি ছাড়া আর কিছুই নেই। হাতে চৌকো সোনার তাবিজ, গলায় সরু হার, মোটা মোটা গাঁটওলা আঙুলে পলা আর গোমেদের আংটি।
কোলের কাছে টিনের ক্যাশ-বাক্স আর লাল হিসেবের খাতা নিয়ে একটা তক্তপোশে বসে ছিল লোকটা। বিনুদের দেখেই লাফ দিয়ে নেমে এল। আপ্যায়নের সুরে ব্যস্তভাবে বলল, আসেন– আসেন। বসেন বড়কত্তা–
হেমনাথ বললেন, এখন আর বসব না নকুল। তাড়াতাড়ি মাছ দাও—
হেয়া (তাই) কখনও হয়। আড়তে আপনের পায়ের ধূলা পড়ল, একদণ্ড বইসা না গেলে শান্তি পামু ক্যান? বলতে বলতে নকুলের কী যেন মনে পড়ে গেল। বিনুকে দেখিয়ে বলল, নাতিরেই খালি আনছেন, জামাই আর নাতিনরা কই?
রাস্তার দিকে আঙুল বাড়িয়ে হেমনাথ বললেন, ওখানে।
পথে খাড়া করাইয়া আইছেন! ক্যান, আমার এইহানে বসনের জাগা আছিল না? নকুলকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ দেখাল।
হেমনাথ বোঝাতে চেষ্টা করলেন, অনেক বেলা হয়ে গেছে, তাই আর আনি নি। আনলে আরও দেরি হয়ে যাবে।
এট্টু দেরি হইব বইলা আনবেন না! পেরথম দিন আমার আড়তের দুয়ারে ওনারা আইলেন, দুইটা মিঠাই না খাওয়াইয়া ছাড়তে পারি! আপনের নাতি-নাতিন-জামাইর উপুর আমার জোর নাই? যাই ওনাগো ডাইকা আনি।
নকুল রাস্তার দিকে ছুটতে যাচ্ছিল, তার আগেই খপ করে তার একখানা হাত ধরে ফেললেন হেমনাথ, আজ থাক নকুল। একদিন তোমার বাড়িতে ওদের নিয়ে যাব। তখন যত পার খাইও–
একটু ভেবে নকুল বলল, ঠিক তো?
ঠিক।
কথা দিলেন কিলাম।
হ্যাঁ–হ্যাঁ, কথার খেলাপ হবে না। তুমি মাছ দাও—
বিনু অবাক হয়ে দেখছিল। আড়তদার এই লোকটাকে তার খুব ভাল লাগছে। তার মধুর ব্যবহার, তার আন্তরিকতা বুঝিয়ে দিচ্ছে দাদুকে কতখানি ভালবাসে সে, কতখানি শ্রদ্ধা করে। শুধু কি এই লোকটাই, হিরণ, মজিদ মিঞা, মজিদের বোনাই হাসেম আলি, রামকেশব-সারা রাজদিয়াই হয়তো হেমনাথের জন্য হৃদয় পেতে রেখেছে। বিনু টের পেল তাদের যে এত খাতির, এত মর্যাদা-সব, সব দাদুর জন্য।
নকুল ডাকল, আহেন, মাছ বাইছা লন (নিন)–
আড়তটার সামনের দিকে রাস্তা, পেছনে নদী। দু’টো দিকই খোলা। নকুলের সঙ্গে যেতে যেতে বিনু লক্ষ করল, পেছন দিকে ইলিশের পাহাড় জমে আছে–পূর্ব বাংলার চকচকে লোভনীয় রুপোলি ফসল।
আড়তের তলায় সারি সারি জেলে ডিঙি। আট দশটা লোক ডিঙিগুলো থেকে মাছ গুনে গুনে ইলিশের পাহাড়টার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। মাছির ভনভনানির মতো শোনা যাচ্ছে, রামে রাম, রামে দুই, রামে তিন–
আরেক দল তোক কাঠের প্যাকিং বাক্সে পরত পরত বরফের তলায় মাছ সাজাচ্ছে। বিনু জানে ওই বাক্সগুলো কলকাতায় চালান যাবে।
একসময় রুপোর পাহাড়টার কাছে এসে পড়ল বিনুরা। একসঙ্গে এত মাছ, এমন ঝকঝকে জীবন্ত জলের ফসল আগে আর কখনও দেখে নি সে।
নকুল বিনুকে বলল, পাঁচখান মাছ বাইছা লও ছোটকত্তা—
বিনু লজ্জা পেয়ে গেল। মাছ তো বাছলই না, দাদুর আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।
হেমনাথ বললেন, পাঁচটা মাছ কেন? তিনটের দাম তো তোমায় দিয়ে গেছি।
নকুল বলল, আইজ জবর মাছ উঠতে আছে বড়কত্তা। দরও ঝপর ঝপর লামতে আছে। অহন ট্যাকায় দশটা বিকাইতে আছে, রাইতের দিকে বিশটা কইরা বেচতে হইব।
হেমনাথ কিছু বললেন না।
নকুল এবার বিনুকে নিয়ে পড়ল, কই, মাছ বাছলা না?
বিনু একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
বিনুর মনোভাব বুঝতে পেরে নিজেই সেরা ছ’টা মাছ বেছে বেঁধে দিল নকুল।
হেমনাথ বললেন, আবার ছ’টা কেন?
হেসে নকুল বলল, ছোটকত্তা পয়লা দিন আমার আড়তে আইল। হের (তার) সোম্মান নাই? এট্টা মাছ তারে খাইতে দিলাম।
মাছ নিয়ে রাস্তায় আসতে সুধা বলল, এত দেরি করলে কেন দাদু?
হেমনাথ বললেন, আর বলিস না ভাই। ওই আড়তদার মানে আমাদের নকুলটা কিছুতেই ছাড়ে। তোদের আড়তে নিয়ে মিষ্টি খাওয়াবার বাই তুলেছিল। কত কষ্টে যে ঠেকিয়েছি! তবে কড়ার করিয়ে নিয়েছে, একদিন ওর বাড়ি তোদের নিয়ে যেতে হবে।
