যে দুশ্চিন্তাটা ত্বরিত গতিতে বিনুর মাথায় ভর করে তা হল, নিত্য দাস কি ঝিনুকের চরম সর্বনাশের খবরটা জানে? জানাই সম্ভব। কেননা, রায়টের সময় নিত্য দাস রাজদিয়াতেই ছিল। তা ছাড়া, ঝিনুক যে আপাতত এ বাড়িতে আছে, সেটাও কি তার কানে পৌঁছে গেছে?
উদ্বিগ্ন মুখে বিনু জিজ্ঞেস করে, নিত্য দাস কি আগে কখনও এখানে এসেছে?
হিরণ বলল, না। এই প্রথম।
মতলব কী লোকটার? কী চায় সে?
তা কেমন করে বলব?
ঝিনুককে নিয়ে বিনুর উৎকণ্ঠাটা হিরণের মধ্যেও চারিয়ে গিয়েছিল। নিত্য দাস ঝিনুককে দেখলে কী বলতে কী বলে বসবে, কে জানে। মেয়েটা ভয়, আতঙ্ক কাটিয়ে সবে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ৫৫৯ হিরণরা সবাই মিলে তার যে দুঃস্বপ্নের স্মৃতিটাকে মুছে দিতে চাইছে, নিত্য দাসকে দেখে ফের সেটাই যদি তাকে গ্রাস করে ফেলে? তাদের এত চেষ্টা সব ব্যর্থ হয়ে যাবে।
হিরণ পলকে কর্তব্য স্থির করে ফেলে। সুধাকে বলে, তুমি ঝিনুককে নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে যাও। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। সে চায় না, নিত্য দাস ওপরে এসে ঝিনুককে দেখুক।
সুধা লক্ষ করেছিল, ঝিনুকের ঝলমলে ভাবটা উধাও হয়ে গেছে। নিত্য দাসের নাম শোনামাত্র সে ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। অস্থির। শঙ্কাতুর।
ঝিনুকের কাঁধে হাতের বেড় দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেল সুধা। বিনু চুপচাপ বাইরের ঘরে বসে থাকে।
হিরণ ফের উমাকে নিচে পাঠাল। একটু পর নিত্য দাসকে সঙ্গে করে ফিরে এল সে।
বিনু তাকে সতর্ক চোখে দেখছিল। চেহারা প্রায় একই রকম আছে। ছোটখাটো। শক্তপোক্ত। নিরেট। পোশাক আশাক বলতে তেমনই খাটো ধুতি। রাজদিয়ায় থাকতে নিমা (ফতুয়া জাতীয় জামা) পরত। কলকাতায় এসে একটু উন্নতি হয়েছে। নিমার বদলে হাফ-হাতা পাঞ্জাবি। পায়ে শস্তা স্যাণ্ডেল।
আগে যতবার দেখা হয়েছে, বিনয়ে সর্বক্ষণে নুয়ে থাকত নিত্য দাস। মুখে বিগলিত হাসি। লোকটা বাইরের দিকে একটুও বদলায় নি। অবিকল তেমনই হাসি। সেই বিনীত ভঙ্গি।
হাতজোড় করে, ঘাড় ঝুঁকিয়ে নিত্য দাস বিনুকে বলল, কত কাল পর দেখা। কী ভালা যে লাগতে আছে ছুটোবাবু, মুখে কইয়া বুঝাইতে পারুম না। হিরণকে বলল, নমস্কার হিরণভাই আপনেরে দেইখাও বড় আনন্দ–
তাকে থামিয়ে দিয়ে হিরণ বলল, আগে বসুন নিত্যবাবু–
একটা চেয়ারে জড়সড় হয়ে বসল নিত্য দাস। হিরণ বসল বিনুর পাশে। বলল, আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে, ভাবতে পারি নি। আমাদের বাড়ির খোঁজ পেলেন কী করে?
নিত্য দাস বলতে লাগল, কত কষ্ট কইরা যে আপনেগো বিচরাইয়া বাইর করছি, তার ঠিক ঠিকানা নাই। তয় (তবে) পরানের টান থাকলে কী না করন যায়। এরপর সে যা বলতে লাগল তা এক ব্যাপক অভিযানের কাহিনী। পাকিস্তানের হালচাল, মানুষের মতিগতি ভাল নয় বুঝে বছরখানেক আগে বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে ইণ্ডিয়ায় চলে আসে। বুদ্ধি করে কিছু টাকাপয়সা আনতে পেরেছিল। না, শিয়ালদা স্টেশনে হাজার হাজার শরণার্থীর ভিড়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে নি। রিফিউজি ক্যাম্পেও ওঠে নি। মাসকয়েক চেতলায় এক ভাড়া বাড়িতে কাটিয়েছে। সেটা অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া টানা ব্যারাক ধরনের বাড়ি। সারি সারি ঘর। গুচ্ছের ভাড়াটে। পরিবেশ দমবন্ধকরা। চল্লিশ পঞ্চাশ জন মানুষের জন্য দুটো মোটে পায়খানা। ঘরের বাইরে পা ফেলার মতো এক ফোঁটা জায়গা নেই। পোকামাকড়ের মতো মানুষ থিক থিক করছে।
নিত্য বলল, আমরা কি অ্যামন জাগায় থাকতে পারি? আমাগো বাড়ির উঠানখানই আছিল আধা কানি। পিছনে আলিসান পুকৈর (পুকুর), ফলফলারির বাগান। হেই সব ফেলাইয়া ফুলাইয়া য্যান নরকে আসলাম। উয়াস আটকাইয়া আসতে লাগল। আমার পরিবারে (স্ত্রী) আর পোলমাইয়ায় (ছেলেমেয়ে) দিনরাইত ঘ্যানঘ্যানায় আর কান্দে, কয় উইখানে থাকব না।
সুতরাং হাত-পা ছড়িয়ে থাকা যায়, মোটামুটি এমন একটা খোলামেলা বাড়ির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতে লাগল নিত্য দাস। ভাড়ায় পেলে ভাল, নইলে কিনেই নেবে।
বালিগঞ্জ ভবানীপুর শ্যামবাজার ঢাকুরিয়ায় জমিবাড়ির দাম আগুন। ভাড়াও মারাত্মক। কিন্তু কসবার দিকটা ফাঁকা ফাঁকা। ওধারে লোকের নজর এখনও তেমন পড়ে নি।
পাকিস্তান থেকে যা টাকাপয়সা নিয়ে এসেছিল, তাই দিয়ে কসবায় তিন কামরার একটা সাবেক কালের আধভাঙা একতলা বাড়ি কিনে সারিয়ে সুরিয়ে নিল নিত্য। জায়গাও বেশ খানিকটা। সাড়ে চার কাঠার মতো।
কলকাতার মতো শহরে মাথা গোঁজার পাকা বন্দোবস্ত হয়েছে। বাড়ি কেনার পর যা বেঁচেছে, বসে খেলে আর ক’দিন? সামনে লম্বা ভবিষ্যৎ। ইণ্ডিয়ায় আসার পর থেকে সে শুনতে পাচ্ছিল, উদ্বাস্তুদের ব্যবসাপত্র করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার জন্য থোক কিছু টাকা গভর্নমেন্ট থেকে দেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া কিসের ব্যবসা, কোথায় ব্যবসা, এসব ঠিকঠাক দেখাতে পারলে ব্যাঙ্ক থেকেও লোন পাওয়া যায়।
মাস দুয়েক আহার নিদ্রা ভুলে, চারদিকে দৌড়ঝাঁপ করে, একে ধরে তাকে ধরে সরকারি টাকা আর ব্যাঙ্ক লোন বার করেছে নিত্য দাস। সেই মূলধন খাঁটিয়ে গড়িয়াহাটে রেডিমেড জামা প্যান্টের ছোটখাটো দোকান খুলে বসেছে। কলকাতা এমন এক শহর যা নিয়েই বসা যাক, খদ্দের ঠিক জুটে যায়। বাতাসে টাকা উড়ছে। কারবার ভালই চলছে নিত্য দাসের।
এক বছরে সব দিক সুচারুভাবে গুছিয়ে নেবার পর তার মনে হল, দেশের মানুষজনের খোঁজখবর নেওয়া দরকার। ফি সপ্তাহে দোকান একদিন বন্ধ থাকে। সেই ছুটির দিনটা তো বটেই, অন্য দিনও কাজের ফাঁকে সময় বার করে সে শিয়ালদা স্টেশনে কিংবা কাছে পিঠের রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে যায়।
