অগত্যা নিরুপায় শচীনদেব পঙ্কজের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিম নিতে ছুটলেন। পঙ্কজ যতই শেখান, তিনি কিছুতেই কায়দা করতে পারছেন না। পল্লীগীতির সুরে বার বার গেয়ে উঠছেন রবি ঠাকুরের গান। ওদিকে পঙ্কজও দৌড়চ্ছেন শচীনদেবের বাড়ি। গলদঘর্ম হয়ে শিখছেন পল্লীগীতি। তার হালও তথৈবচ। ভারী, ভরাট গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে তিনি গাইছেন ভাটিয়ালি। ভুল ধরিয়ে দিয়েও কেউ কাউকে শোধরাতে পারছেন না।
দুই নাজেহাল শিল্পী পরস্পরের কাছে কিভাবে তালিম নিচ্ছেন, সুরের গোলমাল করে কিভাবে তালগোল পাকিয়ে ফেলছেন, হুবহু নকল করে গেয়ে গেয়ে শোনালেন অজিত চট্টোপাধ্যায়। সঙ্গে নানা মজাদার অঙ্গভঙ্গি।
সারা প্যাণ্ডেলে ঝড় বয়ে গেল। দশ মিনিট ধরে হাসির আতসবাজি ফাটতে লাগল। অবিরল।
বিনু লক্ষ করল, পেটে হাত চেপে সমানে হেসে চলেছে ঝিনুক। হেসেই চলেছে। মুখ লাল হয়ে উঠেছে তার। চেয়ারে বসে থাকতে পারছিল না। ঠিকরে নিচে পড়ে যাবে যেন। কোনও রকমে নিজেকে সামলে সামলে রাখছে।
কত কাল বাদে ঝিনুককে এমন প্রাণ খুলে হাসতে দেখলে বিনু? এমন স্বচ্ছ? এমন নির্মল? হাসিটা যেন সহস্র ধারায় ছড়িয়ে পড়ছে। ঝিনুককে যত দেখছে তত ভাল লাগছে তার।
কমিকের পর আবার গান। একে একে মঞ্চে আসতে লাগলেন সুপ্রভা সরকার, সত্য চৌধুরি, অখিলবন্ধু ঘোষ, পান্নালাল ভট্টাচার্য, দিলীপ সরকার, শ্যামল মিত্র। সবার শেষে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি আরও কয়েকটা ফাংশানে গেয়ে এসেছেন। তাই এখানে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেছে। আধুনিক এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত মিলিয়ে তাকে গাইতে হল মোট পনের খানা। শেষ গান, কোনও এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোন, রূপকথা নয় সে নয়। জীবনের মধু মাসের কুসুম ছিঁড়ে–
হেমন্তের গানের পর ফাংশান যখন শেষ হল, ভোর হতে বেশি দেরি নেই। এবার বাড়ি ফেরার পালা। আদিত্য আর সবিতা হিরণদের সঙ্গে রাস্তা পর্যন্ত চলে এল।
সবিতা ঝিনুককে জিজ্ঞেস করল, কেমন লাগল ফাংশান?
ঝিনুকের চোখেমুখে ঘোর লেগে আছে। বিহ্বলের মতো বলল, কী ভাল যে লেগেছে, বলে বোঝাতে পারব না।
তোমার সঙ্গে সেভাবে তো কথাই হল না। একদিন অনেক গল্প করব।
কতটুকু সময় আর সবিতাকে দেখেছে। কিন্তু এর মধ্যে তাকে খুব পছন্দ হয়েছে ঝিনুকের। আস্তে মাথা নাড়ল সে। অর্থাৎ সবিতার সঙ্গে গল্প করার ইচ্ছা তারও।
সবিতা সুধাকে বলল, কবে বিনু আর ঝিনুককে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসছ?
সুধা মুহূর্তে সতর্ক হল। সবিতাদের বাড়ি যখন ইচ্ছে যাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু আদিত্যর পিসির ভীষণ নাক-গলাননা স্বভাব। জাগতিক সমস্ত ব্যাপারেই অনন্ত কৌতূহল। নতুন কাউকে দেখলে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তার পেটের ভেতর থেকে যতক্ষণ না সব খবর টেনে বার করছে, শান্তি নেই। মহিলা লেখাপড়া শিখে ওকলতি করলে জেরায় জেরায় সাক্ষীদের জেরবার করে দিতে পারতেন। কথার মারপ্যাঁচে ঢাকার প্রসঙ্গ চলে আসবে কিনা, কে জানে।
সুধা নির্দিষ্টভাবে কোনও তারিখের কথা বলল না। ভাসা ভাসা ভাবে জানালো, সবে তো ওরা এসেছে। কদিন যাক। পরে নিয়ে যাব।
মিনিট পাঁচেক দাঁড়াতেই একটা ফাঁকা ট্যাক্সি পেয়ে উঠে পড়ল হিরণরা। ফাংশান চলার সময় প্রতিটি লহমায় ছিল চমক। তীব্র উত্তেজনা। ঘুমের কথা কারোর খেয়াল ছিল না। কষে বাঁধা তারের মতো টান টান স্নায়ুগুলো এখন আলগা হয়ে আসছে। ঘুমে জড়িয়ে যাচ্ছে চোখ।
বাড়ি ফিরে ঝটিতি পোশাক পালটে হাত পায়ে জল দিয়ে সবাই শুয়ে পড়ল।
.
৩.২৯
প্রায় সারারাত জাগার কারণে পরদিন ঘুম ভাঙতে ঢের বেলা হয়ে গেল। এর মধ্যে আকাশের গা বেয়ে সুর্য অনেকখানি ওপরে উঠে এসেছে। যদিও ঋতুটা হেমন্ত, বেলা চড়লে রোদ এখনও বেশ কড়া হয়ে ওঠে।
বাথরুমের কাজ চুকিয়ে চা খেতে খেতে কালকের ফাংশানের সবিস্তার আলোচনা চলছিল। জগন্ময় হেমন্ত উৎপলা পঙ্কজ শচীনদেব– ঘুরে ফিরে এই সব নাম উঠে আসছে। প্যাণ্ডেলে ওঁদের দেখার পর থেকে ঝিনুক এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েছিল যে তার রেশ এখনও কাটে নি। সে শুধু বলছে, ছোটদি, তোমাদের জন্যে এই শিল্পীদের দেখতে পেলাম। আবার কোথাও ফাংশান হলে আমাকে নিয়ে যেতে হবে কিন্তু—
সুধা বলল, নিশ্চয়ই।
আজ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, মিউজিয়াম এবং সময় পেলে দক্ষিণেশ্বরে বেড়াতে যাবার কথা ছিল। কিন্তু ঘুমের অনেকটাই দু’চোখ জুড়ে লেগে আছে। ক্লান্তি এখনও পুরোপুরি কাটে নি।
ঠিক হল, আজ আর এক পা-ও বাড়ি থেকে বেরুনো নয়। আপাতত ঝিনুকরা তো এখানেই আছে। অন্য একদিন তাদের ভিক্টোরিয়া, যাদুঘরটর দেখিয়ে আনবে। দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর আরেক প্রস্থ না ঘুমোতে পারলে শরীর ঝরঝরে লাগবে না।
হঠাৎ একতলায় কড়া নাড়ার শব্দ। কেউ একজন ডাকাডাকি করছে, হিরণভাই আছেন নিকি? অ হিরণভাই–
গলাটা অপরিচিত। কিন্তু ডাকটার মধ্যে একটা অন্তরঙ্গ সুর আছে। কথায় পদ্মাপাড়ের টান। লোকটা নিশ্চয়ই হিরণকে চেনে।
হিরণ উমাকে ডেকে বলল, দেখ তো, কে এসেছে—
উমা বলল, লোকটাকে কি ওপরে নিয়ে আসব?
কী ভেবে হিরণ বলল, না। আগে নামটা জেনে এস–
উমা তর তর করে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেল। পরক্ষণে ফিরে এসে বলল, রাজদিয়ার নিত্য দাস এসেছে।
সবাই চকিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বিনু আর ঝিনুক। রাজদিয়া থেকে সাত মাইল উজানে সুজনগঞ্জের হাট। সেখানে মস্ত দোকান ছিল নিত্য দাসের। নদীর ধার ঘেঁষে ছোটখাটো একটা আড়তও। রাজদিয়ার বাজারেও ছিল তার আরেকটা দোকান। চাল ডাল তেল নুন আর নানাবিধ মশলাপাতির খুচরো এবং পাইকারি কারবার করত।
