জগন্ময়ের পর একে একে রবীন মজুমদার, উৎপলা সেন, গৌরীকেদার ভট্টাচার্য, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের নামকরা গানগুলি গাইতে লাগলেন। এঁদের কাছেও চিরকুট পাঠাতে লাগল সবিতা। সে একাই শুধু নয়, শ্রোতাদের ভেতর থেকে আরও অনেকেই। শিল্পীরা কাউকেই নিরাশ করলেন না। পরম উদারতায় সবার অনুরোধ শিরোধার্য করলেন।
দশটা বাজলে আদিত্য এসে বলল, চল, এখন খেয়ে নেবে।
সুধা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, এত তাড়াতাড়ি!
কারণটা বুঝিয়ে দিল আদিত্য। আজ কলকাতায় কম করে পনের কুড়িটা ফাংশান হচ্ছে। বিখ্যাত আর্টিস্টদের বিরাট চাহিদা। এখানে যাঁদের গাওয়া শেষ হয়েছে তারা অন্য ফাংশানে গাইতে ছুটবেন। আর আগে ওঁদের খাইয়ে দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের বাড়ির লোকজন এবং তাদের গেস্টদের যে ক’জনকে পারা যায়, একসঙ্গে বসিয়ে দেওয়া হবে। এইভাবে রাত একটা দেড়টা পর্যন্ত খেপে খেপে খাওয়ার পর্ব চলবে। লোক তো কম নয়।
সুধাদের একেবারেই নড়ার ইচ্ছা নেই। সে বলল, আরও কত ভাল আর্টিস্ট গাইবেন। খেতে গেলে তাদের গান শুনব কী করে?
আদিত্য জানালো, আপাতত গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে না। এখন চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ মিনিট শুধুই বাজনা। একজন মাউথ অর্গান বাজাবেন। একজন বাঁশি। একজন জলতরঙ্গ। একজন স্প্যানিশ গিটারে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর। খেতে খেতে সব শোনা যাবে।
.
খাওয়ার ব্যবস্থা কাছেই। পার্কের পেছন দিকে একটা প্রকান্ড সেকেলে বনেদি বাড়ির মস্ত হল ঘরে। লম্বা লম্বা উঁচু বেঞ্চ আর চেয়ার পাতা রয়েছে সারি সারি।
আদিত্যই শুধু সুধাদের আনে নি, তরুণ সঙ্ঘের অন্য ক’জন মেম্বারও তাদের স্ত্রী ছেলেমেয়ে এবং অতিথিদের নিয়ে এসেছে। একধারে দেওয়ালের ধার ঘেঁষে বার চোদ্দটা চেয়ার ফাঁকা রেখে বাকিগুলোতে সবাইকে বসিয়ে দেওয়া হল।
এরপর আদিত্য এবং তাদের ক্লাবের কয়েকজন হল-ঘরের বিরাট দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতর দিকে চলে গেল। ফিরে এল মিনিট দুয়েক পরেই। সঙ্গে রবীন মজুমদার, উৎপলা সেন, জগন্ময় মিত্র, এমনি অনেকে। খুব সম্ভব বাড়ির অন্দরমহলের কোনও ঘরে তারা বিশ্রাম করছিলেন। ওঁদের সমাদর করে ফাঁকা চেয়ারগুলোতে বসানো হল।
ভোজের এলাহি আয়োজন। লুচি, পোলাও, আলুর দম, ভেটকি মাছের ফ্রাই, মুরগির মাংস, চাটনি এবং নলেন গুড়ের সন্দেশ।
ঝিনুক খাবে কী, উৎপলা সেন, রবীন মজুমদার, জগন্ময় মিত্রদের দিকে তাকিয়েই আছে, তাকিয়েই আছে। পলকহীন। অভিভূত। এতকাল এঁরা ছিলেন দূর আকাশের নক্ষত্র। ধরাছোঁয়ার বাইরে। আজ কিনা সামনাসামনি বসে তাদের গান শুনেছে সে। একই হল-ঘরে একসঙ্গে খেতেও বসেছে। সব যেন অলৌকিক স্বপ্নের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে।
একটা মাইকের মুখ এধারে ঘোরানো। তাই মাউথ অর্গান, বাঁশি কি জলতরঙ্গের সুর হেমন্তের বাতাসে ভেসে আসছে।
সুধা আর সবিতা মাঝে মাঝে তাড়া দিচ্ছে, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। একটু পরেই কিন্তু ফের গান শুরু হয়ে যাবে।
ব্যস্তভাবে লুচির একটা কোনা ভেঙে নিয়ে কিংবা একমুঠো পোলাও মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে অন্যমনস্ক হয়ে যায় ঝিনুক। চোখ কিন্তু শিল্পীদের দিকেই স্থির।
খাওয়ার পালা চুকিয়ে ফের প্যাণ্ডেলে ফিরে আসে সুধারা।
যন্ত্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান শেষ হয় গেল। এবার যে শিল্পীটি মঞ্চে এলেন তিনি শচীনদেব বর্মন। শরীর ভাল নেই। দু’খানা গানই শুধু গাইলেন। নিশীথে যাইও ফুল বনে রে ভ্রমরা’ আর প্রেমের সমাধি তীরে নেমে এল শুভ্র মেঘের দল, তাজমহলের মর্মরে গাঁথা কবির অশ্রুজল–
শ্রোতাদের দাবি অফুরান। তারা সহজে ছাড়তে চায় না, আরও শুনতে চায়। হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিলেন শচীনদেব।
সবিতা প্রচুর খবর রাখে। ঝিনুকের কানে মুখ ঠেকিয়ে নিচু গলায় বলল, শচীন কর্তা এখন কলকাতায় থাকেন না। যুদ্ধের সময় বম্বে চলে গিয়েছিলেন। বিরাট বিরাট সব হিন্দি বইয়ের মিউজিক ডিরেক্টর। সারা ইণ্ডিয়ায় ওঁর কত নাম। কত সম্মান। তোমার আদিত্যদাকে ভীষণ ভালবাসেন। ও
আবদার করলে না বলতে পারেন না। শরীর খারাপ নিয়েও তাই বম্বে থেকে আজকের ফাংশানে। গাইতে এসেছেন।
শচীনদেবের পর পঙ্কজ মল্লিক। তাঁরও ভারতজোড়া খ্যাতি। কণ্ঠস্বর গম্ভীর। উদাত্ত। বার খানা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলেন। তের নম্বর গানটা হল ‘ডাক্তার’ ছবির চৈত্রদিনের ঝরাপাতার পথে দিনগুলি মোর কোথায় গেল–
একের পর এক চমক। পঙ্কজের পর এলেন ধনঞ্জয়। তাকেও দশ এগারখানা গাইতে হল। শেষ গানটি হল ‘শহর থেকে দূরে’ ছবির ‘রাধে, ভুল করে তুই চিনলি না তোর প্রেমের শ্যাম রায়, ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়—’
একটানা দুঘন্টা গানের পর কমিক। সেটি পরিবেশন করলেন অজিত চট্টোপাধ্যায়।
কৌতুক-নকশাটি এইরকম। অল ইণ্ডিয়া রেডিও’র পাক্ষিক ম্যাগাজিন ‘বেতার জগৎ’-এ তারিখ, সময় এবং শিল্পীদের নাম সমেত প্রতিদিনের প্রোগ্রামের আগাম তালিকা প্রকাশ করা হয়। ভুল করে একবার ছাপা হল, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবেন শচীনদেব বর্মন আর পঙ্কজ মল্লিক পল্লীগীতি।
দুই শিল্পী মহা ফাঁপরে পড়ে গেলেন। ‘রেডিও’র কর্মকর্তাদের ভুলটা ধরিয়ে হাজার কাকুতি মিনতিতেও ফল হল না। ছাপা যখন হয়ে গেছে, দু’জনকে সেইমতোই গাইতে হবে। তা ছাড়া, শ্রোতাদের এই নিয়ে তুমুল উৎসাহ। মুহুর্মুহু অল ইণ্ডিয়া রেডিও’র দপ্তরে ফোন করে তারা নাকি জানাচ্ছে, শচীনদেবের রবীন্দ্রসঙ্গীত আর পঙ্কজ মল্লিকের পল্লীগীতি শোনার জন্য সবাই উন্মুখ হয়ে আছে।
