বিনু বা ঝিনুক উত্তর দিল না। নীরবে মাথা নাড়ল শুধু।
যেখানে আনন্দের এমন ব্যাপক আয়োজন, সমস্ত পরিবেশ খুশির প্লাবনে ভাসার জন্য উন্মুখ, সেখানে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ হঠাৎ যেন তাল কেটে দিয়েছে।
সবিতা আর কিছু জানতে চাইবে কিনা, কে জানে। হিরণরা ত্রস্ত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের স্মৃতি যতই তারা আড়াল করে রাখতে চাক না, বিষবাষ্পে-ভরা এই ভূখন্ড ঝিনুকের পিছু ছাড়ে না। যেন অনিবার্য নিয়তি।
খুব সরল মনেই কথাগুলো বলেছে সবিতা। তা ছাড়া, সে জানেও না ঝিনুকের জীবন কিভাবে, কতখানি ধ্বংস হয়ে গেছে। আর হিরণ সুধা এবং বিনু তিল তিল করে কিভাবে তাকে বাঁচিয়ে তুলতে চাইছে।
সবিতা ঝিনুককে বলল, পাকিস্তানে আবার ফিরে যাবে নাকি?
সুধা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল, না না, যাবার প্রশ্নই নেই।
সবিতা বলল, যা ভয়ঙ্কর অবস্থা, ওখানে কক্ষনো যাবে না। দেশের কথা একদম ভুলে যাও।
এবারও সুধাই বলল, ওরা চিরকালের মতো ইন্ডিয়ায় চলে এসেছে।
খুব ভাল করেছে।
একটু চুপচাপ।
তারপর একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল সবিতা। সুধাকে জিজ্ঞেস করল, কে তোমার সবচেয়ে ফেভারিট আর্টিস্ট?
পাকিস্তানের প্রসঙ্গ ওঠায় হিরণদের শ্বাস আটকে গিয়েছিল। এবার তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আস্তে আস্তে বুকের ভেতরকার আটকানো বাতাস বার করে দিল।
ফেভারিট এবং আর্টিস্ট, দুটো শব্দেরই মানে ঝিনুকের জানা। কে তার প্রিয় শিল্পী, কখনও তা ভেবে দেখে নি। জানালো, অনেকের গানই তার ভাল লাগে।
সবিতা নিরপেক্ষভাবে জানায়, আমার ভাই সবাই প্রিয়। পঙ্কজ হেমন্ত ধনঞ্জয় শচীনদেব, কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলব! কয়েকজন গায়কের বিখ্যাত কটি গানের নাম করে জিজ্ঞেস করল, এগুলো শুনেছ?
দাঙ্গার সময় সেই যে ঢাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে আনা হয়েছিল, তারপর আর গানবাজনার কথা ভাবে নি ঝিনুক। ভাবার সময়ও নয় সেটা। সারা পৃথিবী তার কাছে শ্বাসরোধী অন্ধকার এক কুঠুরি। ঘরের কোণে নিজেকে লুকিয়ে রাখত সে। অসাড়, ম্রিয়মাণ। চারদিকে যা কিছু সুন্দর, মধুর, স্বপ্নমাখানো, সে সবের সঙ্গে তার যাবতীয় সম্পর্ক ছিঁড়ে গিয়েছিল।
ঝিনুক আস্তে মাথা নাড়ে, না–
সবিতা বলল, আজ ওঁদের দিয়ে এই গানগুলো গাওয়াব।
ঝিনুকের কৌতূহল হচ্ছিল। সে শুনেছে, শিল্পীরা নিজেদের খেয়ালে তাদের পছন্দমতো গানই গেয়ে থাকেন। শ্রোতাদের বেছে দেওয়া গান কি ওঁরা গাইবেন? জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করল না সে।
বাঙালির সময়জ্ঞান বলতে কিছু নেই। দশটায় কিছু করবে বললে গড়াতে গড়াতে বারটায় টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু তরুণ সঙ্রে বিচিত্রানুষ্ঠান কাঁটায় কাঁটায় সাতটাতেই শুরু হল।
গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্যান্ডেলের কোনও চেয়ারই এখন খালি নেই। যারা বসার জায়গা পায় নি, বিশাল মন্ডপের দু’ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাবের দায়িত্বশীল মেম্বাররা মঞ্চের কাছাকাছি থেকে সব দিকে লক্ষ রাখছে। তাদের মধ্যে আদিত্যকেও দেখা গেল।
মঞ্চের একধারে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দরী ঘোষিকা বলছিল, আমাদের প্রথম শিল্পী অনুরাধা শেঠ। তিনি নতুন হলেও যথেষ্ট প্রতিভাময়ী। আশা করি, তার গান আপনাদের ভাল লাগবে।
মঞ্চের ঠিক মধ্যিখানে লাল গালিচা পাতা। শিল্পীদের বসার জন্য। উইংসের ভেতর দিয়ে একটি তরুণী সেখানে এসে বসল। বেশ দেখনদার চেহারা। প্রচুর সেজেছে। খোঁপায় জুইয়ের মালা জড়ানো।
একটি তবলচিও সঙ্গে এসেছে। হারমোনিয়াম নিয়ে অন্য একজন।
মেয়েটি একটি আধুনিক গাইল। সুরেলা কণ্ঠস্বর। প্যান্ডেলের একোণ সেকোণ থেকে কিছু হাততালির শব্দ উঠল।
এরপর গায়ক গায়িকারা ঘোষণা অনুযায়ী মঞ্চে আসতে লাগল। একের পর এক। সবাই প্রায় নতুন। আধ-চেনা দু’চারজন। মাথাপিছু একটি করে গান বাঁধা। কেউ গাইল আধুনিক। কেউ পল্লীগীতি। কেউ রবীন্দ্রসঙ্গীত। কয়েকজনের বেশ রেওয়াজকরা গলা। বেশির ভাগই মাঝারি। তবে একজনও ফেলনা নয়।
আদিত্য বলেছিল, দশটা সাড়ে-দশটার আগে বড় আর্টিস্টরা আসবেন না। কিন্তু অনেক আগেই তারা এসে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে আসর জমে গেল।
নামীদের ভেতর প্রথম মঞ্চে উঠলেন জগন্ময় মিত্র। শুরু করলেন তার সেই বিখ্যাত গানটি। দিয়ে, তুমি আজ কত দূরে, আঁখির আড়ালে চলে গেছ, তবু রয়েছ হৃদয় জুড়ে– লহমায় গোটা প্যান্ডেল জুড়ে বিদ্যুৎপ্রবাহ খেলে গেল।
জগন্ময়ের নামটা ঝিনুকের খুব ভাল করেই জানা। পনের কুড়ি হাত দূরে বসে তিনি গান শোনাচ্ছেন। স্বচক্ষে দেখেও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তার। নিশ্বাস পড়ছে না। চোখের দৃষ্টি স্থির। আচ্ছন্নের মতো মঞ্চের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
বিনুরা ঝিনুককে লক্ষ করছিল। কেউ তাকে কিছু বলল না।
গানটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে প্যান্ডেল হাততালিতে ফেটে পড়ল। চারপাশ থেকে চিৎকার উঠছে। সবার এক দাবি, আরেকটা আরেকটা
নতুনদের জন্য একটা করে গান। বড় আর্টিস্টদের বেলায় সে নিয়ম খাটে না। একখানা গান গেয়ে তাদের রেহাই নেই। শ্রোতাদের আবদারের কি শেষ আছে? পর পর ছ’খানা গাইতে হল জগন্ময়কে।
এর ফাঁকে চিরকুটে খস খস করে একটা গানের দুলাইন লিখে ফেলল সবিতা। আদিত্যকে ডেকে বলল, এই গানটা গাইতে বল–
চিরকুট হাতে হাতে ঘুরে মঞ্চে পৌঁছে গেল। এক পলক সেটা দেখে একটু হাসলেন জগন্ময়। অনুরাগী শ্রোতার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে হারমোনিয়ামে সুরের ঢেউ তুলে গানটা ধরলেন, আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়, তুমি যে বহ্নিশিখা। মরণের ভালে এঁকে দিয়ে যাই জীবনের জয়টিকা–
