গেটের মুখে মাঝারি ভিড়। সুধাই শুধু নয়, তার মতো দূরদর্শী আরও অনেকেই রয়েছে। মঞ্চের কাছাকাছি ভাল জায়গা দখল করার জন্য আগেভাগেই তারা হাজির।
হিরণের বন্ধুটির নাম আদিত্য। তেমন লম্বা না হলেও বেশ সুপুরুষ। ধারাল, সপ্রতিভ চেহারা। ধুতি আর কাজ করা পাঞ্জাবিতে চমৎকার দেখাচ্ছে।
গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ভিড় সামলাচ্ছিল আদিত্য। হিরণদের দেখে হাসিমুখে এগিয়ে এল, একটু আগে এসে ভাল করেছিস। পরে এলে পেছন দিকে বসতে হত।
চোখ সামান্য ছোট করে স্বামীর দিকে তীর হানল সুধা। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। কেন তাড়া দিয়েছিলাম, এবার বুঝতে পারছ?
বোকাটে হাসি ফুটিয়ে ঘাড় চুলকোয় হিরণ। সুধা যে ঢের বেশি বুদ্ধি ধরে তা মেনে নিতেই হয়।
ঝিনুকদের দেখিয়ে আদিত্য জিজ্ঞেস করে, এদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
সুধা আদিত্যর সঙ্গে বিনুদের পরিচয় করিয়ে দেয়। ঝিনুক সম্বন্ধে বলে, ও সম্পর্কে আমার বোন হয়। পাকিস্তান থেকে কদিন হল ওরা এসেছে। বাড়িতে বসে থেকে কী করবে! বাড়তি কার্ডও ছিল। ফাংশানে নিয়ে এলাম। বলেই ভয় হল, আদিত্য যদি পাকিস্তানের পরিস্থিতি জানতে চায়। এবং কথায় কথায় এমন প্রসঙ্গ উঠে পড়ে যাতে ঝিনুক ফের নিজেকে গুটিয়ে নেয়? তার ঝলমলে ভাবটা লহমায় উধাও হয়?
কিন্তু আদিত্য এ সবের ধারকাছ দিয়েও গেল না। এখন তার ভীষণ ব্যস্ততা। বলল, ওদের নিয়ে এসে খুব ভাল করেছেন বৌদি। চলুন, আপনাদের বসিয়ে দিই।
হিরণ বলল, তোর বউ এসেছে?
দুপুর থেকে বাবার জ্বর। ডাক্তারকে কল দিয়ে এসেছি। এদিকে ফাংশান নিয়ে এখানে এমন আটকে গেছি যে বাড়িতে থাকতে পারলাম না। ডাক্তার এলে ওষুধ টোষুধের ব্যবস্থা করে সবিতা পরে আসবে। আমরা যতক্ষণ না ফিরছি, পিসি বাবাকে দেখবে। আশা করি, দু’এক ডোজ ওষুধ পড়লে জ্বরটা নেমে যাবে।
হিরণরা জানে, আদিত্যদের বাড়ি খুব কাছেই। পার্কের ঠিক উলটো দিকে। ওর মা নেই। মাস ছয়েক হল বিয়ে হয়েছে। এখনও ছেলেপুলে হয় নি। বাড়িতে চারজন মানুষ। আদিত্য, সবিতা, আদিত্যর বাবা আর এক বিধবা পিসি। একজন আধ্যবয়সী রান্নার লোকও আছে। আদিত্যদের কাছেই থাকে। বাড়িরই একজন হয়ে গেছে।
আদিত্যর সঙ্গে প্যান্ডেলে চলে এল সুধারা। ভেতরটা চমৎকার সাজানো। মনোরম আলোয় ভরে আছে চারপাশ। একধারে উঁচু মঞ্চে বড় বড় পেতলের ফুলদানিতে অজস্র টাটকা রজনীগন্ধার ঝড়। দুটো মাইকও রয়েছে। পেছনে মস্ত সোনালি ফেস্টুনে বড় বড় নীল হরফে লেখা : তরুণ সঙ্ঘের উদ্যোগে বিচিত্রানুষ্ঠান। দু’পাশে উইংস দিয়ে মঞ্চে যাতায়াতের পথও রয়েছে। সামনের দিকে শ্রোতাদের জন্য চেয়ারের সারি।
থোকায় থোকায় বেশ কিছু লোকজন এধারে ওধারে বসে আছে। আরও অনেকে আসছে।
মঞ্চের সামনের প্রথমটা বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সারিতে হিরণদের বসিয়ে আদিত্য বলল, তোদের পাশের একটা চেয়ারে কাউকে বসতে দিবি না। বলবি লোক আছে। সবিতা এলে বসবে।
হিরণ বলল, ঠিক আছে।
আর শোন, প্রচুর আর্টিস্ট আসবেন। ফাংশান শেষ হতে হতে পোর হয়ে যাবে। রাত্তিরে তোরা এখানেই খাবি।
সে কী! মেলোমশায়ের জ্বর। এর ভেতর ওসব ঝামেলা করতে গেলি কেন? আমরা ভোর অব্দি থাকব না। সাড়ে দশটা, এগারটায় ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাব।
আদিত্য বলল, অত তাড়াতাড়ি চলে যাবি মানে! বড় বড় আর্টিস্টরা আসবেন দশটার পর থেকে। তাদের গান না শুনে কে তোদের যেতে দিচ্ছে?
সুধাও বেঁকে বসল, ঠিক বলেছেন আদিত্যদা। ফাংশান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঝিনুক, বিনু আর আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়ছি না। যার ইচ্ছে সে ফিরে যেতে পারে।
এরপর ফেরার কথা মুখে আনা বৃথা। হাত উলটে নিরুপায় একটা ভঙ্গি করল হিরণ।
আদিত্য মজার সুরে টিপ্পনি কাটে, ক্ষমতা থাকলে চলে যাস। একটু থেমে জানায়, নিজেদের বাড়িতে তারা রান্নাবান্নার ঝাট করে নি। রাতে ঢালাও ভূরিভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছে ক্লাবের তরফে। শিল্পীদের তো আপ্যায়ন করা হবেই, সপরিবারে অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তারা এবং তাদের গেস্টরাও খাবে। অতএব হিরণদের সঙ্কোচের কারণ নেই।
চকিতে গেটের দিকটা এক পলক দেখে নিয়ে আদিত্য চঞ্চল হয়ে ওঠে, তোরা বোস। গেটে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। যাই। সে চলে গেল।
এমন সুসজ্জিত মন্ডপে এত মানুষ গান শুনতে আসছে, রাজদিয়ায় থাকলে তা ভাবাই যেত না। দ্রুত ফাঁকা চেয়ারগুলো ভরে যাচ্ছে। চারপাশে টুকরো টুকরো কথা। হাসির শব্দ। গোটা প্যান্ডেল জুড়ে অদ্ভুত এক গুঞ্জন। অবাক দৃষ্টিতে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখছিল ঝিনুক। কী ভাল যে তার লাগছে!
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। সবিতা এল।
সুধা জিজ্ঞেস করে, মেলোমশাই এখন কেমন আছেন?
সবিতা বলল, কার্তিকের হিম লেগে জ্বর। ডাক্তার দেখে গেছেন। বললেন, চিন্তার কিছু নেই। এক দাগ মিক্সচার খাইয়ে এসেছি।
সুধা ঝিনুক আর বিনুর সঙ্গে সবিতার আলাপ করিয়ে দিল।
শ্যামবর্ণ, কিন্তু ভারি মিষ্টি চেহারা সবিতার। মুখে প্রতিমার আদল। স্বভাবটা মধুর। তার কথাবার্তা এবং হাসিতে এমন এক আপন করা ভাব আছে যা মুহূর্তে ঝিনুক আর বিনুকে জয় করে নিল। পাকিস্তান থেকে এসেছে শুনে প্রথমটা শিউরে উঠল সবিতা, উঃ, ওখানে যা চলছে, খবরের কাগজে পড়তে পড়তে ভয়ে দম আটকে যায়। তোমরা যে চলে আসতে পেরেছ, সেটা ভগবানের অসীম কৃপা। বোঝা যায়, সে ঈশ্বরবিশ্বাসী।
